আবহমানের সঞ্চয় থেকে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন আশা ভোঁসলে, এবং তাঁকে ঘিরেই জন্ম নিয়েছিল আবহমানের নব-পর্যায়। তিনি ভারতীয় ‘স্ক্রিন’ আর ‘বেসিক’ গান-ইতিহাসের এক রং-রঙিন বাসন্তী পাতা। আশা, বা তাঁর কিংবদন্তি দিদি লতা মঙ্গেশকর তাঁদের বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকরের তুঙ্গ প্রতিভার জাদুদণ্ডটিরই উত্তরাধিকার বহন করে গিয়েছেন।
আর্থিক মাপকাঠি নয়, গুজরাতি মা সেবন্তী এবং মরাঠি-কোঙ্কণি বাবা দীননাথের সংসার সুরতরঙ্গ আর নাট্যচর্চার সম্পদেই ধনী ছিল। দীননাথ ছিলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের নামকরা পেশকার এবং মরাঠি থিয়েটার ও গানজগতের নাক্ষত্রিক ব্যক্তিত্ব। কিন্তু বাবার সেই প্রতিভা-প্রাখর্যের ছায়া খুব অল্প দিনই পেয়েছিলেন তাঁর সন্তানেরা। ১৯৪২ সালে দীননাথ যখন প্রয়াত হন, তখন তাঁর সন্তান লতা, মিনা, আশা, উষা, হৃদয়নাথেরা নাবালক। পরিবারের হাল ধরেছিলেন নাবালকেরাই। গান-অভিনয়কে পেশা করে তোলেন লতা। পরে একই পথে মিনা, আশারা। ১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ দেশীয় রাজ্য সাংলির গোয়ারে (এখন মহারাষ্ট্রে) জন্মগ্রহণ করা আশা দশ বছর বয়সে প্রথম প্লে-ব্যাক করেন ১৯৪৩ সালে মাঝা বল নামক মরাঠি চলচ্চিত্রে। বাবার মৃত্যুর পরে তাঁদের পরিবার থাকতে শুরু করেছিল বম্বেতে। হিন্দি ছবিতে আশার সুযোগ পাওয়া প্রথম প্লে-ব্যাকের পাঁচ বছর পরে, ১৯৪৮ সালে। ছবির নাম চুনরিয়া, গান: ‘শাওন আয়া’। তবে অন্ধ কি দুনিয়া নামের একটি ছবি মুক্তি পায় চুনরিয়া-র আগেই, সেখানেও গান ছিল আশার। তবে, এই দুই গানের কোনওটিই একক নয় আশার। প্রথম একক গানের সুযোগ পরের বছর, ১৯৪৯ সালে, রাত কি রানি ছবিতে।
আশার শুরুর দিকের বহু গানেই গীতা দত্তের অনুরণন পাওয়া যেত। বিষয়টি ক্রমে সমস্যার হয়ে উঠেছিল আশার জন্য। তত দিনে দিদি লতা গানের জগতে দেশজয় করেছেন। পাশাপাশি, চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে তখন দাপুটে রাজত্ব শামসদ বেগমের। এঁদের মাঝখানে থেকে কাজ করতে গিয়ে আপন অভিজ্ঞান তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছিল আশার। এবং আশা তা সম্ভব করলেনও। যদিও সে লড়াই অকল্পনীয়ই ছিল। কারণ, তখনও এবং পরেও দীর্ঘ দিন আশা মূলত পেতেন ছবির পার্শ্বচরিত্রের গান, ভ্যাম্পের গানের কাজ। নায়িকার কণ্ঠ হিসাবে তখনও তাঁকে ভাবা হয়নি।
সে কঠিন কাজ সুসম্ভব হল আর এক জাদুকরের হাত ধরে। ওঙ্কারপ্রসাদ ‘ও পি’ নায়ার। ও পি-র মনে হল, আশার কণ্ঠই সেই আকর, যেখানে তাঁর সুর-ভাবনার নিরীক্ষা এবং সম্পাদনা সাবলীল ভাবে হতে পারে। ১৯৫২ সালে আশার জীবন বইল নতুন খাতে। সঙ্গদিল আশাকে অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছিল। সাজ্জাদ হুসেনের সুরে আশা সে ছবির গানে সবার নজরে আসেন। একই সালে ছম ছমা ছম ছবিতে আশা গাইলেন ও পি নায়ারের সুরে। নায়ার-আশা নবযুগের সূচনা। আশাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। একে একে বিমল রায়, রাজ কপূর, বি আর চোপড়ার মতো নামী চলচ্চিত্রকারের ছবিতে কাজ করার সুযোগ।
প্রায় এক দশক ধরে নায়ার-আশা জুটি মুগ্ধ করে রেখেছিল সময়কে। ও পি নায়ারের যুগান্তকারী শৈলী ছিল গানে ‘হর্স-বিট’ বা অশ্বচালের ব্যবহার। ঘোড়ায় টানা টাঙাগাড়ি যেমন ধ্বনিসঞ্চার করে গতিপথে, তার মাধুর্যকে অবিস্মরণীয় মেধায় নিজের কাজে তুলে এনেছিলেন নায়ার। এবং সে কাজে সুরকারের ভাবনা অনায়াস-সম্ভব করে তুলেছিলেন আশা। ১৯৫৫ সালের বাপ রে বাপ ছবিতে ‘পিয়া পিয়া পিয়া মেরা জিয়া পুকারে’ বা ১৯৫৮ সালের হাওড়া ব্রিজ ছবিতে ‘এ কেয়া কর ডালা তুনে’ কিংবা ১৯৬৬ সালের শাওন কি ঘটা ছবিতে ‘জ়রা হলে হলে চলো’— আশা-নায়ারের অশ্বগতি উপমহাদেশকে মায়াবন্দি করেছিল।
পরে আরও বহু নামী সুরকার-গীতিকারদের সঙ্গে আশার কাজ মাইলফলক হয়ে রয়েছে। তবে ও পি নায়ারের পরে যাঁর নাম আশার সঙ্গীত-মানচিত্রের সঙ্গে সব চেয়ে বেশি সম্পৃক্ত, তিনি রাহুল দেব বর্মণ। আশা যে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, তা ও পি নায়ার, শচীন দেব বর্মণের মতোই বুঝেছিলেন আর ডি। হিন্দি ছবির গানে তিনি নবযুগ আনতে চলেছেন তখন। বদলে যাচ্ছে প্রিলুড-ইন্টারলুডের চেনা ভাবনা। ভারতীয় সুর হাত ধরছে পশ্চিমের এবং বাবার উত্তরাধিকার বহন করে রাহুলের সুরে মিশছে লোকসঙ্গীতের ফল্গুধারা। এই ইতিহাস নিখুঁত ভাবে অনূদিত হচ্ছে আশার কণ্ঠে। ১৯৬৬ সালে তিসরি মঞ্জিল-এর ‘ও হাসিনা জ়ুলফোওয়ালি’ নতুন আশার জন্ম দিল। ক্যাবারে-পপ-ডিস্কোর আবহে কখন মিশে যাচ্ছে উপমহাদেশের মার্গগানের বীজ, ঠাওর হচ্ছে না কারও। শুধু অবিনশ্বর রূপ ধারণ করছে গান। ১৯৭১ সালে হরে রাম হরে কৃষ্ণ ছবির ‘দম মারো দম’ যেমন। শোনা যায়, হরে-কৃষ্ণ ধ্বনির সঙ্গে হিপি-সংস্কৃতির ‘দম মারো’ অনুষঙ্গের কারণে ছবি থেকে গানটিকে বাদ দিতে চেয়েছিলেন পরিচালক-অভিনেতা দেব আনন্দ। যদিও তা করা হয়নি এবং বাকি ইতিহাস। সম-ইতিহাস ১৯৭৩ সালের ইয়াদোঁ কি বরাত ছবির ‘চুরালিয়া হ্যায় তুমনে’র উচ্ছলতা। আবার, ১৯৮৭ সালে ইজ়াজ়ত-এ রাহুলের সুরে আশার কণ্ঠে ‘মেরা কুছ সামান’ গানে বিরহ-বিষণ্ণতার তাজমহল বিরচনা।
খৈয়াম, শচীন দেব বর্মণ, রবি, শঙ্কর-জয়কিষন, বাপ্পি লাহিড়ী, অনু মালিক কিংবা এ আর রহমান— প্রত্যেকের সঙ্গেই আশার ভিন্ন ভিন্ন গান-স্থাপত্য রয়েছে। কিন্তু আশার কণ্ঠের মায়াসভ্যতাকে আলাদা মখমলে ধারণ করেছিলেন সুরকার জয়দেব। যার মধ্যে ১৯৬১ সালের হাম দোনো আগলভাঙা কাজ। মহম্মদ রফির সঙ্গে ‘আভি না যাও ছোড় কর’— পদাবলির মতো সে গান, সেই সুর আর গায়কি হৃদয়ে মধুর আস্তর রেখে যায়।
বাংলা-সহ ভারতীয় নানা ভাষার ছবিতে গান পেয়েছেন আশা। তার মধ্যে গজল, ভজন, লোকগান যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে রবীন্দ্রনাথের গান, নজরুলের গান। বাংলা ছবি এবং ‘বেসিক’ গানের ক্ষেত্রেও রাহুল-আশা জুটি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থেকেছে। বাংলা গানে নানা সুরকারের সঙ্গে আশা ভোঁসলের কাজ বাঙালি সংস্কৃতিরই অঙ্গ হয়ে রয়েছে কয়েক দশক ধরে। ‘গুঞ্জনে দোলে যে ভ্রমর’ বা ‘ময়না বলো তুমি কৃষ্ণ-রাধে’ আজও অমোঘ বাঙালিয়ানা।
গানের জীবনই বেছেছেন, বেঁচেছেন আশা। কিন্তু চলার পথ সহজ ছিল না। ষোলো বছর বয়সে গণপতরাও ভোঁসলের সঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করা এবং পরিবার থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া। দাম্পত্য সুখের না-হওয়ায় পরে বিচ্ছেদ। দ্বিতীয় বিয়ে রাহুল দেব বর্মণকে। এ সবের পাশাপাশি ও পি নায়ারের সঙ্গে দীর্ঘ সখ্য-সম্পর্কের পর্ব। জীবনের এই ওঠাপড়ায় বাদ থাকেনি প্রতিযোগিতার বারুদ-সংযোগও। কিন্তু সেই সব কিছুর ঊর্ধ্বে আশা ছিলেন আশাই। দক্ষ রন্ধনশিল্পী আশা তাঁর গানজীবনকেও অগুনতি নিরীক্ষার উপচারে স্বাদু-সুগন্ধি করে রেখে গিয়েছেন জীবনভর।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে