মতুয়া সদস্য। ফাইল চিত্র।
তাপস সাহা নেই। আবার আছেনও।
তেহট্টের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের বর্ণময় উপস্থিতি ছিল তাপসের— মান-অভিমানে, রাগে-বিরাগে। কখনও নির্দল হয়ে দাঁড়িয়ে দলের প্রার্থী তথা নদিয়া জেলা তৃণমূল সভাপতিকে হারিয়ে দিয়েছেন। আবার দলে ফিরে তৃণমূলের জন্য় সেই আসন পুনরুদ্ধার করেছেন। গত বছর তাঁর আকস্মিক মৃত্য়ুর পরে বহু দিন বাদে তাপসকে ছাড়াই ভোটে যাচ্ছে তেহট্ট।
এ বারের ভোটটা যে কারও জন্যই খুব একটা সহজ নয়, তা সকলেই বুঝছে। একে তো হিন্দু-মুসলমানের মিশ্র এলাকা, তার উপর এসআইআরের খাঁড়া— নানা হিসেব গুলিয়ে দিয়েছে। কাঠালিয়ার পেঁয়াজ চাষের জমিতে বিশ্রামের ফাঁকে বিড়িতে টান দিয়ে ভোট নিয়ে কথা চালাচালি করছিলেন কয়েক জন। যা বোঝা গেল— আসতলনগর, হরিপুর, বেতাই, মোবারকপুর কলোনি, ছিটকার মতো গ্রামগুলিতে পদ্মফুলের ছড়াছড়ি। কিন্তু নারায়ণপুর ১ ও ২ পঞ্চায়েত এলাকায় জোড়াফুলের বাগান বেশ ঘন। তবে তাতে কোপ দেওয়ার তালে আছে কাস্তেও।
২০২১ সালে গত বিধানসভা ভোটে তাপস সাহা প্রায় সাত জার বিজেপির আশু পালকে হারিয়েছিলেন। পরাজিত করেন। ২০২৩ সালে পঞ্চায়েত ভোটে ক্ষমতাসীন দলের গা-জোয়ারি সত্ত্বেও এই কেন্দ্রের ১১টি পঞ্চায়েতের মধ্যে নারায়ণপুর ১ ও ২ ও দিঘলকান্দি তৃণমূল পায়। বাকি বিরোধীদের দখলে। রঘুনাথপুর ও পাথরঘাটা ১ পঞ্চায়েত সিপিএমের, বাকি ছ’টি বিজেপির। পঞ্চায়েত সমিতিতে বিরোধীরা টক্কর দিলেও এক নির্দল সদস্যকে ভাঙিয়ে তা দখল করে তৃণমূল। পরের বছর, ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে আবার তৃণমূলের চেয়ে আট হাজারের বেশি ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপি।
হরিপুর কলোনির সামনে মাচায় নানা বয়সের মানুষের খোশগল্পের মধ্যেই হরিপদ মণ্ডল বললেন, “এ বার মনে হচ্ছে, গেরুয়া খানিকটা এগিয়ে।” পাশ থেকে এক জন বলে ওঠেন, “অত সহজ নয়। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।” বেতাই বাসস্ট্যান্ডে চায়ের দোকানের আড্ডায় এক যুবক আবার বলেন, “তৃণমূলের দিলীপ পোদ্দার কিন্তু খুব ঘাম ঝরাচ্ছেন। আর গোটা এলাকা তাঁর পরিবারের মতো পরিচিত।”
এক সময়ে তেহট্টে তৃণমূলের রাজনীতিতে তাপস সাহা, সঞ্জয় দত্ত এবং দিলীপ পোদ্দার ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’ ছিলেন। সঞ্জয় রাজনীতি থেকে কার্যত স্বেচ্ছা-অবসর নিয়েছেন। ব্যাটন এখন দিলীপের হাতে। তবে চোরা স্রোতও আছে। প্রবল তাপস-বিরোধী বলে পরিচিত জেলা পরিষদ সদস্য টিনা ভৌমিক এ বার কী ভূমিকা নেন, তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে অনেকেরই। তাঁকে এখনও তেমন সক্রি হতে দেখেনি কেউই।
নাজিরপুরের মৃগী গ্রামের নাসির মণ্ডলের কথার সুর অন্য— “এক ফুল বলুন বা দুই ফুল, ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতিকে ভিত্তি করা দুই দলকেই তাড়াতে হবে। কংগ্রেস বা সিপিএমের আমলে তো ধর্ম নিয়ে এই বাড়াবাড়ি আমরা দেখিনি!” ছিটকা গ্রামের সঞ্চিতা বিশ্বাস আবার তুলছেন এসআইআরে নাম বাদ যাওয়ার প্রসঙ্গ। তিন পর্যায়ে প্রায় সাড়ে আট হাজার নাম বাদ গিয়েছে এই কেন্দ্রে। সঞ্চিতার বক্তব্য, “মতুয়া সম্প্রদায়ের অনেকের নাম বাদ পড়ায় গেরুয়া শিবির একটু চাপে পড়ে গিয়েছিল। তবে বেশ কিছু নাম আবার তালিকায় ফিরে এসেছে।” শ্যামনগরের কৌশিক মালাকারের ধারণা, প্রথম দিকে বিজেপি প্রচারে খানিক এগিয়ে থাকলেও এখন সমানে-সমানে লড়াই হচ্ছে।
প্রার্থীরা কী বলছেন?
কৌতুক মেশানো হেঁয়ালিতে তৃণমূলের দিলীপ পোদ্দার বলেন, “নারায়ণপুর ১ ও ২ গ্রাম পঞ্চায়েত সাধারণত ২০-২২ হাজার ভোটে লিড দেয়। নারায়ণই আমার ভরসা!” সংখ্যালঘু-প্রধান ওই এলাকা এক সময়ে ‘বামদুর্গ’ বলে পরিচিত ছিল। সেখানে প্রচারে গিয়ে সিপিএম প্রার্থী সুবোধ বিশ্বাস দাবি করেন, “তৃণমূলকে বিশ্বাস করে মানুষ আমাদের সরিয়েছিল। এখন সংখ্যালঘুরা বুঝে গিয়েছেন, তৃণমূল মানে দুর্নীতির পাহাড়।” এই কেন্দ্রে কংগ্রেস অনেক দিনই হীনবল। বিজেপি প্রার্থী সুব্রত কবিরাজের দাবি, “মতুয়াদের অনেকের নাম কাটা গিয়েছিল, তবে বেশির ভাগই ঠিক হয়ে গিয়েছে। যেখানেই যাচ্ছি, সকলেই বলছে পরিবর্তন।”
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে