রাজ্য বেছে বেছে এসআইআর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত
Election Commission of India

বঙ্গজয়ের নয়া চাল

অসমের বর্তমান বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী অবৈধ মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের ‘মিঁয়া’ আখ্যা দিয়ে একটি ভয়ের পরিমণ্ডল নির্মাণ করছেন।

প্যাট্রিশিয়া মুখিম

শেষ আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:১০
Share:

অধিকারপ্রত্যাশী: শুনানিকেন্দ্রে উদ্বিগ্ন অপেক্ষা, কৃষ্ণনগর, ৭ ফেব্রুয়ারি। ছবি: পিটিআই।

রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের পথে পশ্চিমবঙ্গ। বিজেপির এই রাজ্য জেতার বাসনা উদগ্র, কারণ ২০১১ থেকে এই বাংলা তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্গ, টানা তিন বার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ও-দিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল কংগ্রেস জোর গলায় বলে আসছেন যে, তাঁরা বিজেপিকে রাজ্যে এতটুকু জমি দিতে নারাজ। গেরুয়া শিবির ও তাদের বিভাজনমূলক মুসলিম-বিরোধী রাজনীতি যে তাঁর কত অপছন্দ, তা নিয়ে কখনও রাখঢাক করেননি মমতা। বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-কে হাতিয়ার করে তৃণমূলের ভোটার বলে পরিচিত মুসলিম ভোটারদের ভোটার তালিকা থেকে ছেঁকে বাদ দেওয়া নিশ্চিত করছে।

ভোট অসমেও। অসমের বর্তমান বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী অবৈধ মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের ‘মিঁয়া’ আখ্যা দিয়ে একটি ভয়ের পরিমণ্ডল নির্মাণ করছেন। সেখানে এই বিভ্রম ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তালিকা থেকে নাম না-বাদ দিলে এই ‘মিঁয়া’রা অসম দখল করে নেবে। জাতীয় নাগরিকপঞ্জি প্রণয়নের পরেও নানা কারণে যাঁদের বৈধ নথি নেই, এমন শয়ে শয়ে মানুষ মাথার উপর ছাদ ও নাগরিকত্ব হারিয়েছেন এবং শরণার্থী শিবিরে দিন কাটাচ্ছেন।

স্বভাবতই, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর অস্থিরতা তৈরি করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘নিয়মিত’ প্রশাসনিক কার্যকলাপ বলে বর্ণনা করা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু যে রকম তাড়াহুড়ো করে, প্রখর কৌশলে এই কাজ করিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তাতে ভারতের নির্বাচন কমিশনের দফতরের উপর আস্থাই নষ্ট হতে বসেছে। অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন নরেন্দ্র মোদী সরকারের বশংবদে পরিণত হয়েছে, অস্বাভাবিক তৎপরতা ও চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মুসলমানদের একটি লক্ষণীয় অংশ তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থক। আসন্ন নির্বাচনে তাঁদের ভোটদান থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে এসআইআর-কে হাতিয়ার করে তোলা হচ্ছে। অভিযোগ, নির্বাচনী দাঁড়িপাল্লা নিজেদের আনুকূল্যে আনতে বিজেপি এমন একটি রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যেখানে জনমতের ভিত্তিতে তারা জিততে ব্যর্থ, বারংবার।

সন্দেহ নেই, ভোটার তালিকা ঝাড়াইবাছাইয়ের প্রয়োজন আছে। কিন্তু, একই কৌশলাবলম্বনে বিজেপির বিহার জয়ের পরই যে ভাবে এই রাজ্যে প্রক্রিয়াটি ব্যবহারের কৌশল নেওয়া হল, সেটা অবশ্যই লক্ষণীয়। এই প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের মধ্যে মেরুকরণ বেড়েছে। ‘হিন্দু খতরে মেঁ হ্যায়’ বলে আবেগে উস্কানি দেওয়া চলছে।

এখনও পর্যন্ত গোটা দেশের মধ্যে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গই বিজেপির অগ্রগতিকে একরোখা ভাবে প্রতিহত করে রেখেছে। বিপুল সম্পদ, কেন্দ্রের ক্ষমতা, আগ্রাসী প্রচার— এত সব সত্ত্বেও তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার ফেলে দিতে পারেনি বিজেপি। নির্বাচনী পাটিগণিত, সামাজিক জোট এবং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, এই সবই বিজেপির সাফল্য আটকে দিয়েছে।

ধাক্কা খাওয়ার পর, দেখা যাচ্ছে ভোটারদের জয়ের বদলে ভোটার তালিকাটিকেই ঢেলে সাজাতে চাইছে বিজেপি। ধর্মীয় উত্তাপ ছড়ানোর এই অন্যায্য তাসটিকে যদি ভোটাররা প্রত্যাখ্যান না করেন, তবে, সম্ভবত এসআইআর-ই হয়ে উঠতে পারে সেই অস্ত্র, যার জোরে বিজেপি শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ জয় করতে পারে।

বিশেষ নিবিড় সংশোধনের জন্য ভোটারদের তাঁদের যোগ্যতাকে নতুন করে প্রমাণিত করতে হয়, প্রায়শই তার জন্য নথিপত্র লাগে। বহু ভারতীয়ের কাছেই তা সুশৃঙ্খল প্রাতিষ্ঠানিক আকারে নেই। পরিযায়ী শ্রমিকরা যাঁদের অন্য জেলা, রাজ্যে যাওয়া-আসা করতে হয়; বস্তিতে ও যথাযথ কাগজপত্র ছাড়াই অস্থায়ী ছাদ বানিয়ে কোনও রকমে মাথা গুঁজতে বাধ্য হয় শহরের যে দরিদ্র শ্রেণি; মুসলমান ও ভাষাগত সংখ্যালঘু মানুষ, যাঁদের সন্দেহের চোখে দেখার ইতিহাস বহু পুরনো; মহিলা, যাঁদের পদবি ও ঠিকানা বিয়ের পর বদলায়; এবং প্রথম বারের ভোটাররা, যাঁরা নির্বাচনী পদ্ধতিতে অনভিজ্ঞ— এঁরা সকলেই এই প্রক্রিয়ায় বিপন্ন।

নথিপ্রমাণ ছাড়াই বাংলাভাষী মুসলিমদের ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে উঁচুতে স্বর চড়িয়েছেন তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র ও সাগরিকা ঘোষ। এ প্রশ্নও বিরোধীরা উঠিয়েছেন যে, যদি সত্যিই অভিযোগ অনুযায়ী লাখে লাখে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী ভারতে ঢুকে থাকেন তবে তার দায় তো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের, তারাই তা হলে সীমান্ত রক্ষায় ধারাবাহিক ভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

একটা কথা স্পষ্ট। বিজেপি তাদের কট্টর ইসলাম-বিদ্বেষী প্রচার নিয়ে অতিসক্রিয়। গোটা দেশেই তার আঁচ পড়েছে, তবে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে বিষয়টি অন্য স্তরে চলে গিয়েছে— সঙ্ঘ পরিবারের অন্ধ ভক্তরা মুসলমানদের শিক্ষা দিতে হিংসার আশ্রয় নিয়েছেন। যাবতীয় অন্যায় ও হিংসাত্মক কীর্তির পরেও তাঁরা অব্যাহতি পেয়ে চলেছেন, যা বুঝিয়ে দেয় মুসলমান-বিরোধিতার পিছনে কত বিরাট রাষ্ট্রীয় সমর্থন, প্রকাশ্যে ও আড়ালে।

১৯৮৩ সালে অসমের নেলি-তে এক পরিকল্পিত হামলায় ২০০০-এরও বেশি মুসলিমকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হত্যা করা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে সেই নেলি হত্যাকাণ্ডের স্মৃতিকে উপেক্ষা করা অসম্ভব। আগেই বলা হয়েছে যে এসআইআর, এনআরসি উপর্যুপরি হওয়ায় অসমে ইতিমধ্যেই গণ ভোটাধিকারহানি, প্রশাসনিক হয়রানি তৈরি হয়েছে, দীর্ঘ সময় গ্রেফতার থাকার আতঙ্ক বেড়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মুসলিম ও গরিব মানুষ। পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে, উভয় ক্ষেত্রেই নাগরিকত্ব প্রমাণের দায় সোজাসুজি নাগরিকেরই ঘাড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব উপেক্ষা করে। এই ভয়ঙ্কর ক্লান্তিকর বিপন্নতার জটিল আবর্তে যাঁরা পড়েছেন, তাঁরাই অনুভব করেছেন এই ক্রমাগত যাচাইয়ের কাজ, আর ক্রমাগত কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণিভুক্ত নাগরিককে সন্দেহের বৃত্তে রাখা কতখানি যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে। মুসলমানদের যেন প্রায় হুমকি দেওয়া হচ্ছে, এই যন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতে গেলে বিজেপিকেই ভোট দিতে হবে।

তা না হলে, শুধুমাত্র ভোটমুখী রাজ্যেই বা এসআইআর হবে কেন? কেবল ভোটের দিকে আগুয়ান রাজ্যগুলিকে নিশানা না-করে সারা দেশ জুড়েই তো এসআইআর হওয়ার কথা এবং যে যে ক্ষেত্রে আবেদন ও সংশোধন প্রয়োজন সেখানে তার জন্য পর্যাপ্ত সময়ও দেওয়ার কথা। আসলে এসআইআর-এর উদ্দেশ্য একটিই: অ-বিজেপি ভোটারদের যথাসম্ভব সরিয়ে ফেলা। বিজেপি জানে, মুসলিমরা কম ভোট দিতে এলেই তাদের সুবিধা।

উচ্চগ্রামের রাজনীতি এবং পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে ‘অবৈধ ভোটার’, ‘অনুপ্রবেশকারী’, জনসংখ্যায় আক্রমণ ইত্যাদি বয়ানের ধুয়ো তুলে রাখার জন্য বিজেপি সুপরিচিত। এসআইআর-কে এই সব কাল্পনিক আশঙ্কার প্রতিকার হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, এক বার নির্বাচনে অংশগ্রহণকে নিরাপত্তার সমস্যা হিসাবে দেখিয়ে দিলে এই ‘বর্জন’ সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়, এমনকি জনপ্রিয়ও হয়ে ওঠে। তখন যাঁরা এসআইআর নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাঁদের দেশবিরোধী বলে দাগিয়ে দেওয়া যায়।

কিন্তু যে-ভাবে এ কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে, তাতে আজ এসআইআর-কে কি আদৌ কোনও গণতন্ত্রের যন্ত্রমাত্র বলা যায়? এর ফলে কি দেশ এমন এক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে গেল না, যেখানে শাসক দলের পক্ষে ভোটার তালিকা থেকে সহজেই নিজের অপছন্দের বিপুল সংখ্যক নাগরিককে বাদ দিয়ে দেওয়া যায়? দিল্লিতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, শুধু ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার জন্যই তারা আবারও এই রাস্তা ব্যবহার করতে পারবে। জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলির উপর অতিরিক্ত কর্তৃত্ব ফলিয়ে যখন শাসক দল এ ধরনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলিকে নিজেদের ক্ষমতার ঢাল-তরোয়াল হিসাবে ব্যবহার করে, তখন নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা আনুষ্ঠানিক ভাবে আইনসম্মত থাকলেও তার স্বচ্ছতা আর থাকে না।

পশ্চিমবঙ্গ কর্তৃত্ববাদী রাজনীতিকে প্রতিরোধ করেছে। এসআইআর মামলায় সওয়াল করার জন্য আদালতে অবতীর্ণ হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং। একচ্ছত্রবাদী শাসনব্যবস্থা যে ক্রমবর্ধমান, এবং তা যে বাংলায় প্রভুত্ব বিস্তার করতে চাইছে, সে বিষয়ে তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।

গণতন্ত্র যদি এই ভাবে কাগজপত্রেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, গণতন্ত্রের উদ্দেশ্য যদি হয় কেবল শাসকের দলীয় স্বার্থপূরণ, তবে ক্রমে এ-দেশে যাঁদের কাছে কাগজপত্র নেই তাঁরা হারিয়ে যাবেন, তাঁদের কণ্ঠও হারিয়ে যাবে। সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই— বিশেষ নিবিড় সংশোধন বিষয়ে বিজেপির এই অনড়তার মূল হেতু এটাই।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন