Right Wing Politics

‘দক্ষিণপন্থা’ বলতে কী বুঝব

কিন্তু ‘দক্ষিণপন্থা’ বলতে কিছু বছর আগেও যে রাজনৈতিক ও দার্শনিক অবস্থানকে বোঝাত, আজকের ‘দক্ষিণপন্থী রাজনীতি’র সঙ্গে তার ফারাক বহু যোজন।

স্বর্ণদীপ হোমরায়

শেষ আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩৫
Share:

এই মুহূর্তে গোটা দুনিয়াতেই ‘দক্ষিণপন্থী’ রাজনীতির আধিপত্য। এই বাস্তবতাকে আজ প্রায়শই গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর ভাঙনের লক্ষণ হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে। দক্ষিণপন্থী সরকারের উত্থান মানেই উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ক্ষয়, প্রতিষ্ঠানগুলির দুর্বলতা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক কর্তৃত্বের স্বাভাবিকীকরণ— এটাই যেন এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক আধিপত্যের ইতিহাস কিন্তু নতুন নয়। এবং, এই রাজনৈতিক ধারা সহজাত ভাবেই গণতন্ত্রবিরোধী— এই দাবিটিও যুক্তির কঠোর পরীক্ষার দাবি রাখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপে, বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে আমেরিকা ও ব্রিটেনে, অথবা উন্নয়নশীল বিশ্বের কিছু দেশেও দক্ষিণপন্থী শাসনকালে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, নিয়মভিত্তিক শাসন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উপর সংযম বজায় ছিল। বহু ক্ষেত্রেই এই পর্বগুলিতে গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো আরও সুদৃঢ় হয়েছে।

কিন্তু ‘দক্ষিণপন্থা’ বলতে কিছু বছর আগেও যে রাজনৈতিক ও দার্শনিক অবস্থানকে বোঝাত, আজকের ‘দক্ষিণপন্থী রাজনীতি’র সঙ্গে তার ফারাক বহু যোজন। এক সময়ের রক্ষণশীল রাজনীতি প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য ও সাংবিধানিক সংযমের প্রশ্নে সতর্ক ছিল। আজ তার বড় অংশই চলছে তত্ত্বহীন ও আত্মসংশয়হীন ভাবে— দায়ভার নেওয়ার প্রয়োজনও যেন ফুরিয়ে গিয়েছে। দক্ষিণপন্থী নেতৃত্ব নিজেদের জাতির অস্মিতার চৌকিদার হিসাবে তুলে ধরলেও, তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক কোনও অবস্থান নেই; সেই সঙ্গে অনুপস্থিত দক্ষিণপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও। বিশেষত তৃতীয় বিশ্বে ‘দক্ষিণপন্থী বুদ্ধিজীবী’ কথাটাই ক্রমে সোনার পাথরবাটি হয়ে উঠছে।

ভারত ও পশ্চিমবঙ্গে গত এক দশকের অভিজ্ঞতা এই বৌদ্ধিক শূন্যতাকে আরও স্পষ্ট করে। ক্ষমতাসীন দলগুলির মধ্যে পার্থক্য থাকলেও, রাজনৈতিক অবস্থানগত ভাবে তারা সকলেই দক্ষিণ দিকে ঝুঁকে। তবু কোন প্রশ্নে দলের নীতিগত অবস্থান কী— তা বহু ক্ষেত্রেই অস্পষ্ট। এই বৌদ্ধিক শূন্যতা কেবল তাত্ত্বিক অভিযোগ নয়; তার বহু প্রত্যক্ষ উদাহরণ রয়েছে। নোট বাতিল হোক বা জমি অধিগ্রহণ, চিনের সঙ্গে বিদেশনীতি অথবা স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ— প্রায় সব ক্ষেত্রেই একই ধারা দেখা গেছে। নেতারা সিদ্ধান্ত নেন, পরে অবস্থান বদলান— কখনও আবার নিজেদের ঘোষিত নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত পথেও হাঁটেন। কিন্তু এই পরিবর্তনের কোনও ক্ষেত্রেই নীতি বা যুক্তির ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন তাঁরা বোধ করেন না। বিশ্বমঞ্চেও একই ছবি— কোনও রাষ্ট্রপ্রধান হঠাৎ অন্য দেশের ভূখণ্ড নিয়ে কথা বলেন, অথচ তার পিছনে কোনও সুসংহত মতাদর্শগত যুক্তিকাঠামো থাকে না। যা থাকে, তা হল পরিস্থিতিগত সুবিধাবাদ। তাই আজকের দক্ষিণপন্থী রাজনীতির বৃহত্তম পরিচয় কোনও বিকল্প মতাদর্শ নয় মতাদর্শের প্রয়োজনকেই অপ্রাসঙ্গিক করে তোলা।

ইউরোপ ও আমেরিকার অভিজ্ঞতা এখানে শিক্ষণীয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দক্ষিণপন্থী বুদ্ধিজীবীরা একটি সুস্পষ্ট বৌদ্ধিক ধারা গড়ে তুলেছিলেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে সংযত করা। যুক্তি, প্রক্রিয়া ও প্রতিষ্ঠান— এই তিনটি ছিল তাঁদের নোঙর। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অতিপ্রয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয় বা ব্যক্তিগত ক্ষমতালোভের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলাই ছিল তাঁদের দায়িত্ব। ভারতেও নেহরু যুগে সমাজতান্ত্রিক ভাবনা যখন প্রভাবশালী, তখন চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী, বি আর শেনয় বা মিনু মাসানিরা কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার বিপরীতে মুক্ত অর্থনীতির তাত্ত্বিক বিকল্প তুলে ধরেছিলেন। সমাজবাদের মোড়কে রাষ্ট্রীয় ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাত্ত্বিক অবস্থান তৈরি করে স্বতন্ত্র পার্টি। অত পুরনো উদাহরণ খোঁজারও প্রয়োজন নেই— ডোনাল্ড ট্রাম্প বা নরেন্দ্র মোদী যখন প্রথম ক্ষমতায় আসেন, তখনও রিপাবলিকান পার্টি বা বিজেপির ভিতরেই অনেকে তাঁদের মতাদর্শগত ভিন্নমত প্রকাশ করেছিলেন। সেই নোঙর এখন উৎপাটিত। দক্ষিণপন্থার ভিতরে মতাদর্শগত প্রশ্ন করার লোক কমে যাওয়ায় গুরুতর অভিযোগ উঠলেও নেতারা দায় নিতে অস্বীকার করেন। পরে চাপ বাড়লে অবস্থান বদলায় বা দায় অন্যের ঘাড়ে ঠেলে দেওয়া হয়, কিন্তু ধারাবাহিক আত্মসমালোচনার পরিকাঠামো আর থাকে না ।

এই বৌদ্ধিক অবক্ষয়ের একটি বড় কারণ সেই সব সামাজিক প্রতিষ্ঠানের দ্রুত রূপান্তর, যাদের উপর ভর করে এক সময় রক্ষণশীল চিন্তা গড়ে উঠেছিল— ধর্ম, পরিবার, পেশাদারি সংগঠন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নৈতিক কর্তৃত্ব কমেছে, পারিবারিক কাঠামো বদলেছে, ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গা দখল করেছে সমাজমাধ্যম। সামাজিক পরিবর্তনের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষিণপন্থা তার নীতিগত ভাষা নতুন করে নির্মাণ করতে পারেনি। সেই শূন্যস্থান দখল করেছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক কর্তৃত্ব। চক্রাকারে, এর ফলস্বরূপ আত্মসংশোধনের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণপন্থী নেতারা তাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অকুতোভয় হস্তক্ষেপ করেন; নিজেদের দায় অস্বীকার করতে নস্যাৎ করেন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নেতিবাচক রিপোর্টকে, বা যে কোনও সমালোচনাকেই উড়িয়ে দেন বিরোধীদের চক্রান্তের তকমা দিয়ে।

প্রশ্ন উঠতে পারে যে এই গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ে বামপন্থীদের ভূমিকা কী? বামপন্থী রাজনীতির নির্বাচনী সাফল্যে কি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রত্যাবর্তন ঘটবে? চরম বামপন্থী নিরঙ্কুশ শাসনব্যবস্থা যে কী রকম, সে কথা নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বামপন্থী রাজনীতির ভিত্তি হল প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা ও ক্ষমতার পরিকাঠামোর মৌলিক সমালোচনা। আদর্শ অবস্থায় বামপন্থী রাজনীতি দক্ষিণপন্থী রাজনীতিকে স্থিতিশীল রাখার ভূমিকা পালন করে। আজকের দুনিয়ায় এই ভূমিকাগুলোও ঘেঁটে গিয়েছে। প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পথ ছেড়ে দক্ষিণপন্থী রাজনীতি যখন ক্রমশ ঢুকে পড়েছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিসরে, তখন গঠনমূলক সমালোচনার পথ ত্যাগ করে বামপন্থী রাজনীতি দেখনদারিসর্বস্ব নৈতিক উচ্চ অবস্থান বেছে নিয়েছে। বামপন্থী রাজনীতির ক্ষয় অবশ্যই গণতন্ত্রের জন্য সমস্যা। দুর্বল বামপন্থা বিরোধিতাকে সীমিত করে, কিন্তু বৌদ্ধিক ভাবে শূন্য দক্ষিণপন্থা শাসনব্যবস্থার সংযম এবং আত্মসংশোধনের প্রক্রিয়াকে ভিতর থেকে ফাঁপা করে দেয়। তাই চিরায়ত দক্ষিণপন্থী মূল্যবোধের বিলুপ্তি গণতন্ত্রের গভীরতর সঙ্কট।

পশ্চিমবঙ্গের বৌদ্ধিক উন্মেষ চিরকালই প্রতিষ্ঠান-বিরোধী। স্বাধীনতা-উত্তর বঙ্গীয় রাজনীতি সমাজ সংস্কারী মানসিকতা নিয়েই চলে এসেছে। সমাজতান্ত্রিক কংগ্রেসি আমলে রাজ্যে রক্ষণশীল বুদ্ধিবৃত্তিক বিকল্প গড়ে ওঠেনি। ফলে বাংলায় দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক চেতনাও কখনও দানা বাঁধেনি। যে সময়ে রক্ষণশীল অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক চিন্তা জাতীয় স্তরে স্পষ্ট হচ্ছিল, রাজ্য রাজনীতি ইতিমধ্যেই বামপন্থী নৈতিক-প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দিকে ঝুঁকে পড়েছে। নিরঙ্কুশ বাম শাসনে সর্বত্র তৈরি হয়েছিল সাংস্কৃতিক আধিপত্য। কর্মসংস্থানের অভাবে রাজ্য থেকে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বেরিয়ে যাওয়ার দরুন বাজার-মুখী অর্থনীতি, বা পরিকাঠামো গঠন নিয়ে সরব হওয়ার সমালোচনামূলক ভরের অভাব রয়ে গেছে।

এর ফলে ২০১১-য় রাজনৈতিক পালা বদলালেও তার কোনও আদর্শগত ভিত্তি ছিল না। সামাজিক ও বৌদ্ধিক পরিকাঠামো তৈরি ছিল না অ-বাম শাসকগোষ্ঠীকে সংযত করার জন্য। শুধুমাত্র বাম-বিরোধিতাই যে কোনও আদর্শগত অবস্থান নয়, সেটা বিগত দেড়-দশকে সুস্পষ্ট। কিন্তু দক্ষিণপন্থী প্রশ্ন করার পরিণত পরিসর তৈরি না-হাওয়ায় বুদ্ধিজীবী বা সাংস্কৃতিক মহল— যার প্রথাগত ভূমিকা শাসকের সামনে আয়না তুলে ধরার— আজ শাসকের সামনে নতজানু।

এ রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও কি প্রকৃতপক্ষে চিন্তার জগতে কোনও পরিবর্তন আসবে? একটা পরিণত গণতন্ত্রে নির্বাচিত নেতা/নেত্রীর ভূমিকা সীমিত। নেদারল্যান্ডস-বেলজিয়ামের মতো দেশ এক বছরের বেশি সময় কোনও সরকার ছাড়াই দিব্যি কাটিয়ে দেয়। অন্য দিকে, সর্বগ্রাসী শাসনের চিনেও রাস্তাঘাটে প্রেসিডেন্টের এত ছবি বা হোর্ডিং দেখা যায় না, যা আমাদের দেশে সর্বত্র বিরাজমান। বিপরীত মেরুর এই দুই শাসনব্যবস্থাতেই জোর দেওয়া হয় বৌদ্ধিক ও রাজনৈতিক পরিকাঠামোয়— নেতার ব্যক্তিত্বের উপরে নয়। সেই দিকে না এগিয়ে শুধু এক নেত্রীর বদলে অন্য নেতা বাছলে সে পরিবর্তন বাহ্যিকই থেকে যেতে পারে। আসন্ন নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, শাসকের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার ভাষা নতুন ভাবে তৈরি না হলে গণতান্ত্রিক ঘাটতি সহজে পূরণ হবে না।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন