বিজ্ঞাপনেও এখন খোঁজ চলছে ধর্মের রাজনীতি

একটি দেশে পাশাপাশি যেখানে শত-শত বছর ধরে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বাস, সেখানে আলাদা করে সম্প্রীতির বার্তা দেওয়ার মধ্যে বীরত্বের কিছু নেই। লিখছেন আবু তাহেরএকটি দেশে পাশাপাশি যেখানে শত-শত বছর ধরে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বাস, সেখানে আলাদা করে সম্প্রীতির বার্তা দেওয়ার মধ্যে বীরত্বের কিছু নেই। লিখছেন আবু তাহের

Advertisement
শেষ আপডেট: ০১ এপ্রিল ২০১৯ ০২:১৬
Share:

প্রতীকী ছবি।

কিছু দিন আগের ঘটনা। কিন্তু তার রেশ এখনও চলছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে। সামনের লোকসভা নির্বাচনে বিভাজন সৃষ্টি করতে তাই সাম্প্রতিক বিষয়গুলিকে লক্ষ করে চলছে নির্বাচনী প্রচার। সে দিকে খেয়াল রাখতে তাই প্রয়োজন ঘটনার ঠিক বিশ্লেষণ এবং নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি। কোনও ভাবেই রাজ্যে যেন ধর্মীয় বিষয় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সে ব্যাপারে প্রতিটি নাগরিককে সদা সর্বদা সজাগ থাকতে হবে। রাজনৈতিক প্রচারের একটা বড় অংশ সব সময়ে ধর্মীয় বিষয় এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে কেন্দ্র করেই ঘটে থাকে। সে দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আমাদের নিত্যদিনের দৈনন্দিন সমস্যাগুলোর সুরাহার পথ বের করার আশ্বাসই হোক নির্বাচনী লক্ষ্য। কী ভাবে কিছু কিছু রাজনৈতিক দল ধর্মীয় মেরুকরণের মাধ্যমে প্রচারে নামছে, তা ব্যাখ্যা করা জরুরি।

Advertisement

কিছু দিন আগেই এক কাপড় ধোয়ায় সাবান সংস্থার একটি বিজ্ঞাপন এসেছিল। এর আগেও এই সংস্থার বিজ্ঞাপনী চমকে অভিভূত হননি এমন বেরসিক মানুষ ভূ-ভারতে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কিন্তু যখনই একটি বিজ্ঞাপন বা বার্তায় ধর্মীয় আচরণের সামান্য আভাস পাওয়া যায়, তখনই ধর্মের নামে অধর্ম করতে নেমে যায় কিছু ধর্মান্ধ ভক্তের দল। ভক্তের দল বলতে কোনও বাধা নেই, কারণ যাঁরা এই বিজ্ঞাপনটির বিরোধীতা করেছেন তাঁদের বেশির ভাগই হয় আরএসএসের মদতপুষ্ট দলের ক্যাডার কিংবা বিজেপি দলের সমর্থক। আরও কিছু ধর্মান্ধ মানুষ, কিছু দাঙ্গাবাজরা এর তুমুল বিরোধিতা করে ওই কাপড় কাচা পাউডারের কোম্পানিকে বয়কট করতে বলেছে।

কিন্তু এক জন সাধারণ নাগরিক যার মস্তিষ্কে সামান্য যুক্তি আর বুদ্ধি বলে বস্তু আছে সেই জানে একটা বিজ্ঞাপন যা কোনও ভাবেই সাম্প্রদায়িকতাকে উসকানি দেয় না, তাকে হঠাৎ করে বয়কটের প্রশ্ন ভয়ানক ভাবে গর্হিত কাজ। এবং সর্বোপরি অপ্রাসঙ্গিক, অবান্তর। এ বার আসা যাক যাকে নিয়ে এত কথা, সেই শীত পেরিয়ে গিয়ে বাসন্তি রঙের উজ্জ্বল বিজ্ঞাপনটির কথায়। বিজ্ঞাপনের শুরুতেই কিছু বাচ্চা ছেলেমেয়ে মিলে বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে নীচে একটি বাচ্চা মেয়েকে রং ছুঁড়ে গায়ে মাখাচ্ছে। বিজ্ঞাপনের কোথাও কিন্তু উল্লেখ নেই সেই পবিত্র শিশুগুলির ধর্ম। তারা হতে পারে হিন্দু বা মুসলিম। কিন্তু যেহেতু তারা বসন্ত উৎসবে রং নিয়ে খেলছে তাই ধর্মের পান্ডারা বাচ্চাগুলোর ধর্ম খুঁজে বের করেছে। এখন ওই রাস্তা দিয়েই একটি বাচ্চা ছেলে যাচ্ছে, যার গায়ে সাদা ধবধবে পাজামা-পাঞ্জাবি। সে হেঁটে যাচ্ছে মসজিদের দিকে। মাথায় ফেজ টুপি রয়েছে। নামাজের সময়, তাই মসজিদমুখী। এখন যদি ধরে নেওয়া যায়, উপর থেকে যে ছেলেমেয়েগুলো রং ছুড়ে গায়ে দিচ্ছিল তারা ওর গায়েও রং মাখিয়ে দিল। যা বাচ্চাটিকে ভিজিয়ে দেবে। যদি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি বাদ দিই, তা হলেও দাঁড়ায় একটি বাচ্চা ছেলে যার শরীর রঙে ভিজে রয়েছে, ভিজে কাপড়ে নামাজ পড়ার পর যতক্ষণে সে বাড়ি ফিরে পোশাক পাল্টাবে, তার ততক্ষণে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। শরীর খারাপ হতে পারে তার। শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণ নয়, শারীরিক কারণেও তো বাচ্চাটিকে ওই মুহূর্তে রং মাখানো উচিত নয় বলে মনে করে থাকতে পারে তার ছোট্ট মেয়ে বন্ধুটি। সেখানে দেশের এত বড় বড় লোকগুলোর মাথায় কী ভাবে ঢুকল না যে এখানে ভারতের চিরাচরিত একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে মাত্র। যেখানে হিন্দু-মুসলিম পাশাপাশি বাস করতে করতে কখনও আলাদা করে মনে করার প্রয়োজন পড়ে না যে এক জন হিন্দুর সঙ্গে এক রকম ব্যবহার করতে হবে আর আরেক জন মুসলিমের সঙ্গে অন্য রকম। একটি দেশে পাশাপাশি যেখানে শত-শত বছর ধরে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বাস, সেখানে আলাদা করে সম্প্রীতির বার্তা দেওয়ার মধ্যে বীরত্বের কিছু নেই।

Advertisement

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, আজকে কিছু রাজনৈতিক দলের কাজকর্মের জন্য সর্বদা এমন সতর্ক ভাবে চলতে হচ্ছে, যেন মনে হচ্ছে আমার সামান্য ভুলও অন্য ধর্মের মানুষটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন না। সর্বদা এই ত্রাস মনের মধ্যে সৃষ্টি করে ভোটের রাজনীতিতে একাধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে দলগুলি। ভারতে ধর্মীয় মেরুকরণের মাধ্যমে যে দলের জাতীয় রাজনীতিতে অভ্যুত্থান, তাদের অত্যাচারের বাড়বাড়ন্তের মাসুল দিতে হচ্ছে হিন্দু-মুসলিম উভয়কেই। বিজেপি সরকারের শাসনের অন্তিম লগ্নে এসে হিসেব কষতে শুরু করলে একটি হিসেবও যে মিলবে না তা আজ দেশের একজন শিশুও বলে দিতে পারে।


ফিরে আসেনি অচ্ছে দিন, ধোপে টেকেনি নোটবন্দির গল্প। বরং কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ভারতীয় জওয়ানদের উপর পাকিস্তানি জঙ্গিদের আক্রমণ বিজেপি সরকারের অপদার্থতাকে আরও বেশি প্রকট করে তোলে। নোটবন্দির নামে বিজয় মাল্য তৈরি হয়েছে, নীরব মোদী দেশীয় কোষাগার থেকে টাকা লুট করে বিদেশের মাটিতে আরাম আয়েশে দিন গুজরান করেছে। আর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করা চাষি ভাইটি দিনের শেষে শূন্য ভাঁড়ারে হাত পেতে আছে সরকারি সাহায্যের দিকে। কৃষি ঋণে জর্জরিত হয়ে কত চাষি ভাই যে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন, সে দিকে আমাদের দেশের নেতাদের কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। তাঁরা তখন বিদেশের দামি হোটেলে বসে করমর্দনে ব্যস্ত।

এটাই যদি হয় এক জন রাষ্ট্রনায়কের নীতি, তা হলে দেশের উন্নয়নের জন্য মূল কাজের লক্ষ্য থেকে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে ঘুরিয়ে দেওয়াই তো হবে তাঁর দলের সাঙ্গোপাঙ্গদের কাজ। আর ধর্মকে কেন্দ্র করে যদি এই হাতিয়ারে শান দেওয়া যায়, তা হলে তো এক শ্রেণির ধর্মান্ধ জনগণ লুফে নেবে। চেটেপুটে খাবে এমন রাজনৈতিক প্রকৌশল।

তাই লোকসভা নির্বাচনের আগে বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে ধর্মীয় মেরুকরণের সুতীব্র চেষ্টায় বিভেদকামীরা সর্বদাই জাগ্রত প্রহরীর মতো তাকিয়ে আছে। তাই সাবান কোম্পানির একটি বিজ্ঞাপনকে ঘিরে এমন তুমুল উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা। এর পিছনে রয়েছে রাজনীতি; যেখানে হিন্দু-মুসলিম বিভেদ সৃষ্টি করে ভোট ভাগাভাগির রাজনীতি করা সহজ হবে।

এমন সুন্দর একটা বিজ্ঞাপন, দেখলেও মন ভরে যায়। প্রাণটা জুড়িয়ে যায়। সেটা ধর্মীয় আচার আচরণের একটি দিক দেখানোর চেষ্টায় নয়, বরং এখানে আরও বেশি স্পষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে আমাদের হৃদয়ের কথা। যাকে আমাদেরই সাবান দিয়ে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করার কথা। যেখানে কোনও নোংরা চিন্তাভাবনা থাকবে না। থাকবে না প্রতিবেশী ভাইয়ের প্রতি কোনও রকম হিংসা বা বিদ্বেষ। গলায় জড়াজড়ি করে বাঁচব আমরা সকলে। সেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রদর্শনের আলাদা কোনও উদ্দেশ্য নেই। যা চিরন্তন, যা শাশ্বত— তাকে আলাদা করে ফুটিয়ে তোলার মধ্যে কোনও মাহাত্ম্য নেই। বরং সেই দায়িত্ব যদি আমরা পালন করতে না পারি, সেটাই আমাদের কলঙ্কিত করতে পারে। আর সেই কলঙ্কের বোঝা যারা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে, নিজ দায়িত্বে তাদের সাবধান করে দেওয়ার সময় এসেছে—‘‘কাণ্ডারি বলো ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র/ হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?’’ এই ভাবে দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে সমস্ত শক্তি দিয়ে রুখে দাঁড়াতে হবে। সন্ত্রাসীদের যেমন কোনও ধর্ম হয় না, তেমনই দাঙ্গাবাজদেরও কোনও ধর্ম হয় না। বরং যে ধর্মের নামে তারা এই রাজনীতি করে, সেই ধর্মকেও তারা কলঙ্কিত করে।

কল্যাণী মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement