সম্পাদক সমীপেষু: মুহূর্তের ভুলে

রাহুল গাঁধী

 লোকসভায় সরকারের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাবের আলোচনায় রাহুল গাঁধী যে ভাষণ দিয়েছেন, তা খুবই প্রশংসনীয়। ভাষণ শেষ হওয়ার পর রাহুল হঠাৎ মোদীর কাছে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরায় মনে হয়েছিল, রাহুল সৌজন্যের রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে পেরেছেন, যা আজকের দিনে বিরল। কিন্তু নিজের আসনে ফিরে গিয়ে তিনি যে ভাবে এক চোখ টিপলেন, তাতে যেন বোঝাতে চাইলেন, ‘‘কী দিলাম!’’ যে সৌজন্য দেখিয়ে উনি অনেকের প্রশংসার পাত্র হয়ে উঠেছিলেন, মুহূর্তের ভুলে সেটা ধূলিসাৎ হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী এই সুযোগের পুরো সদ্ব্যবহার করলেন। দেড় ঘণ্টার ভাষণে রাহুল-সহ পুরো কংগ্রেস এবং বিরোধীদের দুরমুশ করলেন। আর এই অবস্থাটা তৈরি করে দিলেন একমাত্র রাহুল গাঁধী। আগামী লোকসভার নির্বাচনে বিরোধীরা জোট বেঁধে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করার যে আবহাওয়া তৈরি করছিলেন, রাহুল গাঁধীর শিশুসুলভ আচরণ তাতে জল ঢেলে দিল।

সমীর বরণ সাহা

কলকাতা-৮১

সুর ছিল

 প্রবুদ্ধ বাগচীর ‘অমিত বঙ্কিম কথা’ (৫-৭) শীর্ষক চিঠি প্রসঙ্গে কিছু কথা। ১২ লাইনের বন্দে মাতরম্ কবিতাটি ১২৮৭ বঙ্গাব্দের চৈত্রমাসের বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রথম প্রকাশ পায়। বঙ্গদর্শনের এই সংখ্যা থেকেই ১৭৭০ সালের সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’ ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ পেতে থাকে। উপন্যাসের প্রয়োজনেই ১২ লাইনের কবিতাটিকে পরবর্তীতে ২৮ লাইনের একটি রণসঙ্গীতে পরিণত করে তোলা হল। ১৮৮১ সালে যখন উপন্যাসটি প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায়, ২৮ লাইনের রণসঙ্গীতের প্রথম ১২ লাইন উদ্ধৃতি-চিহ্ন দিয়ে পৃথক করে দেখানো হয়। কিন্তু পরবর্তী সংস্করণে সেই পার্থক্য রক্ষা করা হয়নি। জগদীশ ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, ‘‘আমরা বলেছি, ‘বন্দে মাতরম্’ সঙ্গীতটি আনন্দমঠের অঙ্গীভূত হয়েছে। ‘অঙ্গীভূত’ বলার অর্থ ও তাৎপর্য হল, ‘বন্দে মাতরম্’ সঙ্গীতরূপে একটি স্বতন্ত্র সৃষ্টি।’’

সমগ্র রচনাটিতেই কিন্তু সুর দিয়ে গাওয়া হয়েছিল। সরলা দেবী চৌধুরানী তাঁর ‘জীবনের ঝরাপাতা’য় লিখেছেন— ‘‘বন্দেমাতরমের প্রথম দুটি পদে
সুর দিয়েছিলেন তিনি (রবীন্দ্রনাথ) নিজে। তখন সেই দুটি পদই গাওয়া হত। একদিন আমার উপর ভার দিলেন— ‘বাকী কথাগুলিতে তুই সুর বসা’। তাই ‘ত্রিংশকোটি কণ্ঠ নিনাদ করালে’ থেকে শেষ পর্যন্ত কথায় প্রথমাংশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে আমি সুর দিলাম। সমস্ত গানটা তখন থেকে চালু হল।’’

বন্দে মাতরম্ সম্পর্কিত কোনও কমিটিতে রবীন্দ্রনাথ নেতৃত্ব দেননি। তবে কমিটিকে রবীন্দ্রনাথের পরামর্শ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসবার কথা বলা হয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথ পৌত্তলিকতা মেনে নিতে পারেননি বলেই বন্দে মাতরম্-এর সংযোজিত অংশকে সমর্থন জানাতে পারেননি। আর মহম্মদ আলি জিন্না তাঁর রাজনৈতিক স্বার্থেই সমগ্র গানটিরই বিরোধিতা করেছিলেন। পাশাপাশি বসালে আমাদের মুখে কটুস্বাদ এসে যায় না কি? ক্ষমতার বিস্তারে ইতিহাসের বিকৃতি সর্বদাই হয়ে এসেছে। দেশের বেশির ভাগ মানুষের অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে প্রচারের দৌলতে বিকৃত ইতিহাসই স্থায়ী হয়ে উঠবে, আশ্চর্য কী? অমিত শাহ পড়ে-পাওয়া সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছেন।

রণধীরকুমার দে

কলকাতা-৩৩

 

অর্ধসত্য

 ২৮-১২-১৯৩৭ তারিখে বুদ্ধদেব বসুকে একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘‘তর্কটা হচ্ছে এ নিয়ে যে, ভারতবর্ষে ন্যাশনাল গান এমন কোনো গান হওয়া উচিত যাতে একা হিন্দু নয় কিন্তু মুসলমান খ্রীষ্টান— এমন কি ব্রাহ্মও— শ্রদ্ধার সঙ্গে ভক্তির সঙ্গে যোগ দিতে পারে। তুমি কি বলতে চাও, ‘ত্বং হি দুর্গা’ ‘কমলা কমলদল বিহারিণী, বাণী বিদ্যাদায়িনী’ ইত্যাদি হিন্দু দেবীনামধারিনীদের স্তব, যাদের ‘প্রতিমা পুজি মন্দিরে মন্দিরে’, সার্বজনিক গানে মুসলমানদের গলাধঃকরণ করাতেই হবে। হিন্দুর পক্ষে ওকালতি হচ্ছে এগুলি আইডিয়া মাত্র। কিন্তু যাদের ধর্মে প্রতিমা পুজা নিষিদ্ধ তাদের কাছে আইডিয়ার দোহাই দেবার কোনো অর্থই নেই।’’ উত্তরে বুদ্ধদেব বসু লিখছেন, ‘‘বন্দে মাতরং বাক্যটি ভারতের এক দিন জাতীয় কর্মে প্রেরণা জুগিয়ে এসেছে। স্বদেশকে মা বলে কল্পনা করার অভ্যেস পৃথিবীর সমস্ত জাতির মধ্যেই দেখা যায়। সমস্ত রচনাটির মধ্যে বন্দে মাতরং বাক্যটিই মূল্যবান।’’ আবার কংগ্রেসের ‘‘কাঁটাছাঁটা ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়ার হুকুম’’ সত্ত্বেও, সরলা দেবীর উক্তি: ‘‘হালফ্যাশনের ছাঁটা কুন্তলেও ‘বন্দে মাতরম্’ তার তেজ ও দীপ্তিরসে ঢল ঢল করছে।’’ তাই বলি, ইতিহাসের অর্ধসত্য পরিবেশন কিন্তু ইতিহাস বিকৃত করারই নামান্তর।

সুদীপ দাস

কলকাতা-৭০

 

জরুরি তথ্য

পীযূষ রায়ের চিঠি (‘বন্দে মাতরম’, ২৩-৬) প্রসঙ্গে কিছু কথা। ১৯৩৭-এ কংগ্রেস সিদ্ধান্ত নেয় ‘বন্দে মাতরম্’ গানের প্রথম দু’টি স্তবক জাতীয় সভা সমিতিতে গাওয়া হবে; তবে যদি উদ্যোক্তারা মনে করেন, তা হলে অন্য গানও গাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে জাতীয় সঙ্গীতের একটি প্রামাণ্য সঙ্কলনগ্রন্থ রচনার জন্য কংগ্রেস একটি সাব-কমিটি গঠন করে, যার সদস্য ছিলেন সুভাষচন্দ্র, মৌলানা আজ়াদ, নরেন্দ্র দেব এবং জওহরলাল নিজে। বন্দে মাতরম্ নির্বাচনের বিষয়ে এই সাব-কমিটির কোনও কাজ ছিল না।

বন্দে মাতরম্-এ সুর দেওয়ার কাজটি রবীন্দ্রনাথের আগে দু’জন করেছেন— ক্ষেত্রনাথ মুখোপাধ্যায় এবং যদুভট্ট। রবীন্দ্রনাথের সুরটিই বেশি জনপ্রিয় হয়, বঙ্কিমচন্দ্রও এই সুরে গানটি রবীন্দ্রকণ্ঠে শুনেছিলেন এবং প্রসন্ন হয়েছিলেন। লক্ষণীয়, দেশভক্তির এই গানটির রাগ ‘দেশ’। তবে রবীন্দ্রনাথ মাত্র দু’টি স্তবকেরই সুর দিয়েছিলেন।

পীযূষবাবু ১৯০০ সালে প্রকাশিত সরলা দেবীর ‘শতগান’-এর দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেছেন, এই বইয়ে শুধু রবীন্দ্রনাথের সুর দেওয়া অংশটুকুই আছে। কিন্তু ‘শতগান’-এর তৃতীয় সংস্করণ ১৯২৩-এ যখন প্রকাশিত হয়, তখন সম্পূর্ণ বন্দে মাতরম্-এরই সুর পাওয়া যায়। সরলা দেবী তাঁর আত্মজীবনীতে উষ্মা প্রকাশ করেছেন, ‘‘আজ কংগ্রেস ‘High Command’ থেকে কাটাছাঁটা ‘বন্দেমাতরম’ গাওয়ার হুকুম বেরিয়েছে।’’

গানটির প্রথম দু’টি স্তবক সভাসমিতিতে গাওয়া হবে— কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির এই সিদ্ধান্তের মুসাবিদা করেছিলেন নেহরু স্বয়ং। গানটির প্রতি মুসলিম সমাজের বিরূপতা কংগ্রেসকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল।
অবশ্য গানের এই দু’টি স্তবককেই গ্রহণ করার বিষয়ে রবীন্দ্রনাথও সহমত ছিলেন।

গৌতম কুমার মণ্ডল

সুইসা, পুরুলিয়া

 

নস্টালজিক

 ‘বন্দে মাতরম্’-এর প্রেক্ষিতে ‘হিন্দুত্ববাদী’ ও ‘অসাম্প্রদায়িক’, উভয় পক্ষেরই নস্টালজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। ১৮৭৫ থেকে ১৯৩৭— এই সময়ে তো আর নেহরু, নেতাজি, রবীন্দ্রনাথ বা অন্য কেউ জানতেন না যে আগামী দিনে ভারত ধর্মের ভিত্তিতে দ্বিখণ্ডিত হতে যাচ্ছে! পরে সেই ঘটনা ঘটে, যার পর আজ ৭০ বছর অতিক্রান্ত। আজ রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে, ধর্ম ও সম্প্রদায়গত প্রশ্নে কেন আমরা এই মনীষীদের বক্তব্যকে আমাদের পছন্দমতো ব্যাখ্যা করে নিজেদের অক্ষমতাকে ঢাকার চেষ্টা করছি? সে দিনের প্রেক্ষিতে তাঁরা একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আজকের পরিস্থিিততে সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে। ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি, কিন্তু ইতিহাসকে ব্যবহার বাঞ্ছনীয় নয়।

মধুসূদন সাহা

কলকাতা-৫২

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট,  কলকাতা-৭০০০০১।

ই-মেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ই-মেলে পাঠানো হলেও।