শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে আমরা বায়ুদূষণ নিয়ে যতটা সরব, বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে ঘটে চলা ‘মেঘ দূষণ’ বা ‘ক্লাউড পলিউশন’ নিয়ে ততটাই উদাসীন। অথচ সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ডেটা বিশ্লেষণ বলছে, এই অদৃশ্য দূষণ আমাদের বৈশ্বিক জলবায়ুকে এক ভয়ানক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সহজ কথায়, কলকারখানা, যানবাহন এবং জীবাশ্ম জ্বালানি দহনের ফলে নির্গত সূক্ষ্ম ক্ষতিকারক এবং রাসায়নিক কণা অতিরিক্ত মাত্রায় মেঘের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। গবেষকরা মেঘের জলকণায় ক্ষতিকারক প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক-এর উপস্থিতিও প্রমাণ করেছেন। এটিই মেঘ দূষণের কারণ।
মেঘ কেবল বৃষ্টির উৎস নয়, এটি পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের একটি প্রাকৃতিক ঢাল। কিন্তু দূষণ এই ঢালটিকে বিষাক্ত ও ত্রুটিপূর্ণ করে তুলছে। মেঘ সূর্যের আলোকে মহাকাশে প্রতিফলিত করে পৃথিবীকে ঠান্ডা রাখে। কিন্তু নাসার জলবায়ু মডেল এবং সাম্প্রতিক আইপিসিসি রিপোর্ট অনুযায়ী, ব্ল্যাক কার্বন ও সালফেট যুক্ত দূষিত মেঘ উল্টে সূর্যের তাপ শোষণ করে নিচ্ছে। তা ছাড়া মেঘে থাকা সালফার ডাইঅক্সাইড ও নাইট্রোজেন অক্সাইড বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিশে অ্যাসিড বৃষ্টি ঘটায়। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের একাংশের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিশ্ব জুড়ে বনাঞ্চল এবং জলাশয়ের অম্লত্ব আশঙ্কাজনক ভাবে কমছে, যা মাটির উর্বরতা, জলজ জীববৈচিত্রের উপর আঘাত হানছে।
মেঘ কোনও নির্দিষ্ট দেশের সীমানা মানে না। তাই এক দেশের দূষণ অন্য দেশের আকাশে মেঘ হয়ে জলবায়ু বিপর্যয় ঘটাতে পারে। এই সঙ্কট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে মেঘ ও বায়ুমণ্ডল সংক্রান্ত গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে কার্বন নির্গমন হ্রাস এবং ক্ষতিকারক এয়রোসল নিয়ন্ত্রণ চুক্তি কঠোর ভাবে বাস্তবায়িত করতে হবে। গ্রিনহাউস গ্যাসের পাশাপাশি এই মেঘ দূষণের ভয়াবহতা যদি আমরা এখনই রুখতে না পারি, তবে অদূর ভবিষ্যতে প্রকৃতির এই আশীর্বাদই আমাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে।
অর্ক গোস্বামী, দুর্গাপুর, পশ্চিম বর্ধমান
গরমের দিন
সুবর্ণ বসুর ‘গরমকাল সরগরম!’ (পত্রিকা, ১৬-৫) পড়ে আমার ছোটবেলার গ্রীষ্মযাপনের দিনগুলির কথা মনে পড়ে গেল। আজ থেকে পাঁচ দশক আগে অনেকগুলো পুকুর নারকেলবীথি, আম জাম কাঁঠালবন ঘেরা সে গ্রামের শীতল পরিবেশে গরম ততটা অনুভূত হত না। তবে এক-এক দিন বিকেলটা যেন গুম হয়ে থাকত, তার পর আসত দুরন্ত কালবৈশাখী ঝড়, কখনও শিলাবৃষ্টিও হত। আসল মজা ছিল গরমের ছুটির সময়। সকাল সন্ধেয় নির্দিষ্ট পড়া ছাড়া সারাটা দিন ছিল দস্যিপনার অবাধ স্বাধীনতা। ভাইবোন, পাড়ার অন্য ছোট ছেলেমেয়ে মিলিয়ে আমাদের বাড়ির পিছন দিকের পুকুর, আমকাঁঠাল বন, বেতবাগান পেরিয়ে একটা জলপাই গাছের নীচে কাঁচা আম ঘষা ঝিনুক দিয়ে ছাড়িয়ে নুন দিয়ে খাওয়া হত। বাড়িতে ভাঁড়ার ঘরে মাটির ‘ঠিলে’তে রাখা পাকা তেঁতুল, গুড়ও চুরি করে এনে মেখে খাওয়ার মজা ছিল। আর ছিল সামনের বড় পুকুরে ঘণ্টাখানেক ঝাঁপানোর আনন্দ।
আমরা, ভাইবোনেরা কোন ছোটবেলা থেকেই বাঁধানো পুকুরের জলে ডোবা সিঁড়ি ধরে পা দাপাতে দাপাতে ভাল সাঁতার শিখে গিয়েছিলাম। তার পর তো বড় পুকুর এ পার ও পার, ডুবসাঁতার— এই সব অবলীলায় করতাম। পুকুরের পাশের এঁটেল মাটি দিয়ে পুতুল গড়ে, কাঠের জ্বালের উনুনে লাল করে পুড়িয়ে মা যে লাল নীল হলদে কাপড়ের রাজা রানি পুতুল তৈরি করে দিতেন, তা দিয়ে সারা দুপুর খেলা চলত। কখনও সাদা ধুলো-ওড়া গ্রামের মাটির রাস্তা দিয়ে নীল চ্যাপ্টা মতো আইসক্রিমের বাক্স নিয়ে এক জন সামনের আমগাছ তলায় বসতেন। খেলা ফেলে আমরা ছোট ছেলেমেয়েরা তাঁর চার পাশে ভিড় করতাম। ডালা খুললে বরফের সাদা ধোঁয়ার নীচে থাকত সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত সাদা, হলদে, গোলাপি রঙের সার দেওয়া আইসক্রিম। ছুটে মায়ের কাছ থেকে দশ পয়সা এনে একটা আইসক্রিম কিনতাম। সেই আইসক্রিম আস্তে আস্তে খেতাম যাতে তাড়াতাড়ি না শেষ হয়ে যায়। ঠাকুরমার কাচের বয়ামে নানা রকম আচার কাসুন্দি আমচুর জলপাই তেল আমতেল থাকত। গরমকালের সকালে পান্তা ভাতের সঙ্গে আমের আচার বা তেঁতুল কাসুন্দি গুড় দিয়ে মেখে খেয়ে শরীর মন চাঙ্গা হত।
গরমকালে সন্ধের পরে দোতলার ‘পথকুঠুরি’র দরজা খুলে সামনের ছাদে মাদুর আর হ্যারিকেন নিয়ে বাবার তত্ত্বাবধানে ‘ছুটির পড়া’ তৈরি করতে হত। তার পর ঠান্ডা হাওয়ায় মাদুরে শুয়ে পড়তাম। ঘন অন্ধকারে আকাশে উজ্জ্বল তারাগুলো দেখা যেত। বাবা চেনাতেন সপ্তর্ষিমণ্ডল, কালপুরুষ, ধ্রুবতারা।
শিখা সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা
দাবদাহ
বর্তমানে তীব্র গরমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কষ্টকর হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ, হকার, শিশু ও বয়স্কদের সমস্যা সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। অতিরিক্ত গরমের কারণে অনেকের শরীরে জলশূন্যতা, মাথা ঘোরা, ক্লান্তি ও অসুস্থতার সমস্যা দেখা দিচ্ছে। দুপুরের সময় রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় পানীয় জলের সমস্যাও দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে লোডশেডিংয়ের সমস্যাও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সকলের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বেশি করে জল পান করা, প্রয়োজন ছাড়া রোদে বাইরে না বেরোনো এবং হালকা খাবার খাওয়া উচিত। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পানীয় জলের সরবরাহ ঠিক রাখা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। নজর রাখা প্রয়োজন রাস্তায় বিক্রি হওয়া খাবার, পানীয়ের গুণমানের দিকেও।
বর্তমানের এই তীব্র গরম আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনের দিকেই ইঙ্গিত করছে। তাই আগামী দিনে তীব্র দাবদাহ থেকে পরিবেশ রক্ষা ও বেশি করে গাছ লাগানোর প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সুরজ ঘোষ, মেমারি-১, পূর্ব বর্ধমান
কালজয়ী
‘জ্বলছে মশাল, ডোবেনি নৌকা’ (১৮-৫) শীর্ষক প্রতিবেদন এবং তার সঙ্গের ছবিটিতে গোলদাতাদের (মোহনবাগানের জেসন কামিংস এবং ইস্টবেঙ্গলের এডমুন্ড) নাম দেখে মনে হল, যেন বিদেশের দু’টি দল! মনে পড়ল ছোটবেলার দিনগুলি। ইস্পাতনগরী দুর্গাপুরে এই দুই দলের খেলা হলেই সে কী উত্তেজনা। দেখার মতো দৃশ্য তৈরি হত শহরের প্রাণকেন্দ্র বেনাচিতি বাজারে। সবুজ-মেরুন জিতলে এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে শুধুই সবুজ-মেরুন পতাকা, চিংড়ি মাছের মুখে ইলিশমাছ গোঁজা কাট আউট! আর লাল-হলুদ জিতলে সমস্ত জায়গায় লাল-হলুদ পতাকা, তখন উল্টোটা— ইলিশের মুখে চিংড়ি গোঁজা!
দুই দলেরই নামকরা সব দাপুটে বাঙালি খেলোয়াড়, কাকে ছেড়ে কার নাম করব! আমাদের সময়ে যাঁদের খেলা দেখে চোখ সার্থক করতাম, মন আনন্দে কানায় কানায় ভরা থাকত, সেই কৃশানু দে, বিকাশ পাঁজি, সুব্রত ভট্টাচার্য, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, অলোক মুখোপাধ্যায়, ভাস্কর গঙ্গোপাধ্যায়, বিদেশ বসু, সুরজিৎ সেনগুপ্ত, আরও অসংখ্য দিকপাল বাঙালি। আরও বহু শ্রদ্ধেয় জনের নাম বাদ পড়ে গেল, যাঁরা দাপিয়ে এই দুই দলে সুনামের সঙ্গে খেলেছেন। এঁরা সবাই কালজয়ী খেলোয়াড়।
বর্তমানে দুই দলেই বাঙালি খেলোয়াড় খুঁজতে অণুবীক্ষণ যন্ত্র লাগে। জার্সিতেও সেই প্রাণকাড়া অনুভূতি উধাও! মন খারাপ হয়ে যায়। যাঁদের খেলা আমাদের রক্তে রন্ধ্রে মিশে গিয়েছে, যাঁদের খেলা দেখে আমরা বড় হয়েছি, কালজয়ী হয়ে তাঁরাই রয়ে গিয়েছেন আমাদের হৃদয় জুড়ে। তাঁরা তো থাকবেনই শ্রদ্ধার আসনে। তবে আমরা আবার এই দুই দলে বাঙালিদের দাপিয়ে বেড়ানো দেখতে চাই।
সুপর্ণা ঘোষ, কলকাতা-৩২
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে