SIR in INDIA

সম্পাদক সমীপেষু: মাটিরও সন্তান

এক জন মানুষ যেমন তাঁর বাবা-মায়ের সন্তান, তেমনই সে মৃত্তিকা-মা তথা দেশেরও সন্তান। সেই মাটির সঙ্গেই সম্পৃক্ত থাকে তাঁর মন ও প্রাণ।

শেষ আপডেট: ২৭ মে ২০২৬ ০৭:২৭
Share:

রোহন ইসলামের ‘ভিটেমাটির হিসাব’ (২৯-৪) শীর্ষক প্রবন্ধটি পড়তে গিয়ে মনের মধ্যে ভিড় করতে শুরু করল কিছু গানের পঙ্‌ক্তি, সিনেমার দৃশ্য আর বিখ্যাত এক গল্পের কাহিনি। মনে পড়ছিল দেশভাগের ইতিহাস— রক্তাক্ত স্মৃতিকথা, ভয় আর যন্ত্রণার ইতিকথা। আলোচ্য প্রবন্ধে ‘ভিটেমাটি’র মতো বিষয় উত্থাপনের মূলে ‘দেশভাগ’ যদিও অনুপস্থিত, তবে সেখানেও জড়িয়ে আছে দেশ নির্মাণেরই আর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া, যার নাম হল ‘এসআইআর’।

এক জন মানুষ যেমন তাঁর বাবা-মায়ের সন্তান, তেমনই সে মৃত্তিকা-মা তথা দেশেরও সন্তান। সেই মাটির সঙ্গেই সম্পৃক্ত থাকে তাঁর মন ও প্রাণ। আর এ প্রসঙ্গেই মনে পড়ে সাদাত হাসান মান্টো রচিত ‘টোবা টেক সিং’-এর কথা। এই গল্পের প্রধান চরিত্র বিষেণ সিং, যে টোবা টেক সিং নামেই পরিচিত। ধর্মে শিখ হলেও পাকিস্তানে তাঁর জন্মভূমি সে কিছুতেই ছাড়তে চাইছে না। এক সময় সে দৌড়তে চেষ্টা করলে পাকিস্তানি রক্ষীরা তাঁকে ধরে সীমান্তের ও-পারে ভারতের দিকে পাঠানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সে নড়ে না। গল্পটা শেষ হচ্ছে এই ভাবে— এক বিশাল মূর্তির মতো তার ফোলা পা নিয়ে সে সীমান্তরেখায় দাঁড়িয়ে রইল। যে-হেতু সে এক নিরীহ বৃদ্ধ, তাকে আর জোর করে এ দিকে বা ও দিকে পাঠানোর চেষ্টা হল না। সে যেখানে দাঁড়াতে চাইল, সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। বিনিময়ের কাজ চলতে থাকল। ভোর হওয়ার আগে বিষেণ সিং হঠাৎ এক আর্তচিৎকার করে উঠল। দু’দিক থেকে আধিকারিকেরা ছুটে এলেন। আর তার পরেই সে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। কাঁটাতারের এক দিকে ভারত, অন্য দিকে পাকিস্তান। মাঝখানের ছোট্ট যে জমিখণ্ডটির কোনও নাম নেই, সেখানেই পড়ে রইল টোবা টেক সিং।

দেখা যাচ্ছে, এখানেও ব্যক্ত হয়েছে এক সাধারণ নাগরিকের ‘মাটি’ কামড়ে পড়ে থাকার অদম্য বাসনা। তবে সাধ আর সাধ্যের মধ্যে তো দূরত্ব থাকেই। দিনের শেষে রাষ্ট্রের নীতি বা রাজনীতিই হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্র নির্মাণের ভিত্তি।

গৌতম নারায়ণ দেব, কলকাতা-৭৪

হৃদয়ের টান

রোহন ইসলামের ‘ভিটেমাটির হিসাব’ প্রসঙ্গে কিছু কথা। ভিটেমাটির টান আমৃত্যু অনুভব করেন দেশান্তরি মানুষ। প্রাক্-স্বাধীনতা পর্বেই এ দেশে চলে এসেছিলেন বাবা, কাকা ও ঠাকুমা। রেলের চাকরির সুবাদে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের বিভিন্ন স্টেশনে মুখ্য আধিকারিকের দায়িত্ব সামলে, রিজ়ার্ভেশন সুপারভাইজ়র পদে উন্নীত হয়ে বাবার বদলি হয় শিলিগুড়িতে। সেখানেই স্থায়ী ভাবে বসবাস ও বসতভিটে নির্মাণ।

ভিটেমাটির অদম্য টানে বাবা কর্মক্ষম ও সচল অবস্থাতেই ঈশ্বরদী গিয়েছিলেন, পাসপোর্ট-ভিসা’সহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র তৈরি করে। মনে আছে, সীমান্তের ও-পারে আমার জেঠামশাইয়ের বড় ছেলে বাবার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। বাবার সঙ্গে সেই মধুর মিলন, দীর্ঘ দিন পর ভিটেমাটি দর্শন এবং আবেগমথিত ছোটবেলা বা প্রথম যৌবনের স্মৃতিতাড়িত গল্প এত শুনেছি বাবার মুখে যে, আমাদের চোখেও ছবির মতো প্রতিভাত হত আমাদের পৈতৃক বাড়ি, ঈশ্বরদী শহর ইত্যাদি। মনে আছে, মুক্তিযুদ্ধের টালমাটাল সময়ে আমার সেজোকাকা সপরিবারে বাধ্য হয়ে আমাদের রানাঘাটের বাড়ি হয়ে শিলিগুড়িতে কিছু দিন কাটিয়েছিলেন। তার পর আবার ফিরে যান ভিটেমাটির টানে।

আমার বসবাস, চাকরি সবই কল্লোলিনী কলকাতায়। এখানে নিজের এতটুকু ভিটেও হয়েছে। তবু এখনও ভিটেমাটির টান অনুভব করি শিলিগুড়ির ভূমিপুত্র হিসাবে। এখনও দার্জিলিং মেল নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে ঢুকলে, বা বাগডোগরার আকাশ থেকে অবতরণের কালে অনুভব করি— “যার বুক ফেটে এই প্রাণ উঠেছে,/ হাসিতে যার ফুল ফুটেছে রে,/ ডাক দিল যে গানে গানে।।” কে ডাক দিল? ভিটেমাটি। না, তার ‘হিসাব মিলাতে মন মোর নহে রাজি’।

ধ্রুবজ্যোতি বাগচী, কলকাতা-১২৫

লড়াই চাই

‘শ্রমিক যখন শিরোনামে’ (২৮-৪) শীর্ষক রঞ্জিত শূরের প্রবন্ধটি শ্রমিক শ্রেণির দুর্দশার এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। দেশ জুড়ে শ্রমিক শ্রেণির বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যতে তা কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে তথাকথিত সভ্য সমাজকে দাঁড় করিয়েছে। বস্তুত, স্থায়ী কাজে স্থায়ী কর্মী নিয়োগ এবং সমকাজে সমবেতনের নীতি এখন সর্বত্রই যথেচ্ছ লঙ্ঘিত হচ্ছে। এর উপর কাজের ঘণ্টা, কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তার বিষয়গুলিও কোনও ভাবেই গুরুত্ব পাচ্ছে না। প্রতিবাদ করতে গেলেই নানা অছিলায় ছাঁটাইয়ের খড়্গ নেমে আসে।

অথচ আমরা বেমালুম ভুলে গিয়েছি, শ্রমিকরাই এই সভ্যতার প্রকৃত নির্মাতা। সভ্যতার এই দুরবস্থা দূর করতে শ্রমিকদেরই চিন্তা ও চেতনায় আরও বলীয়ান হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। যাঁরা শ্রমিকদের প্রকৃত কল্যাণ ও মুক্তি চান, সেই নাগরিক সমাজ ও ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। শ্রমিকদের সচেতন করার কাজটি যত্নের সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

একই সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণিকেও বুঝতে হবে, অতি মুনাফার স্বার্থে পরিচালিত উৎপাদন ব্যবস্থা তাদের এই দুর্দশার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। পাশাপাশি নিজেদের চিন্তা-চেতনাকে আরও বিকশিত করে নেতৃত্বকেও বিচার করতে হবে। প্রয়োজনে উন্নত আদর্শের ভিত্তিতে নিজেদেরই নেতৃত্বের জায়গায় উঠে আসতে হবে। তা না হলে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি যেমন সম্ভব নয়, তেমনই সমাজ ও সভ্যতারও প্রকৃত মুক্তি আসবে না।

গৌরীশঙ্কর দাস, খড়্গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর

পরিজন

এক সময় বাঙালি জীবনের সবচেয়ে উষ্ণ শব্দগুলি ছিল— মামা, মাসি, কাকা, পিসি। এই শব্দগুলির সঙ্গে জড়িয়ে থাকত গল্প, আদর, বকুনি, উৎসব আর অগণিত স্মৃতি। পরিবার তখন শুধু বাবা-মা আর সন্তানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল এক বিস্তৃত সম্পর্কের জাল, যেখানে আত্মীয়তার প্রতিটি শব্দের আলাদা মানে, আলাদা আবেগ। কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটে, ছোট পরিবার বা ‘নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি’র দাপটে বাস্তব জীবনে তাঁদের উপস্থিতি হয়ে উঠছে ক্ষীণ।

যৌথ পরিবারের যুগে একটি শিশু বড় হত বহু মানুষের সান্নিধ্যে। সবাই মিলে এক জালের মতো তাকে ঘিরে রাখতেন। একটি শিশুর সামাজিক ও মানসিক বিকাশে এই সম্পর্কগুলির ভূমিকা ছিল অপরিসীম। কিন্তু এখন বাবা-মা এবং এক বা দুই সন্তান— এই সীমিত পরিসরেই পরিবারের সংজ্ঞা আবদ্ধ। শিশুদের বড় হওয়ার পরিসরও এখন অনেকটাই একঘেয়ে— স্কুল, কোচিং, মোবাইল স্ক্রিন— এই ত্রিভুজেই তাদের জীবন সীমাবদ্ধ।

নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি নিঃসন্দেহে আধুনিক জীবনের একটি প্রয়োজনীয় কাঠামো। ছোট পরিবারে দায়িত্ব কম, সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ, এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বেশি। কর্মজীবী দম্পতিদের জন্য এই কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মতও। কিন্তু এই সুবিধার বিনিময়ে আমরা কী হারাচ্ছি— সেই প্রশ্নটাই আজ গুরুত্বপূর্ণ।

একটি শিশু যখন বড় হয়, তখন তার সামাজিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন বহুমাত্রিক সম্পর্ক। মামার সঙ্গে দুষ্টুমি, মাসির কাছে মনের কথা বলা, কাকার কাছ থেকে শাসন, পিসির আদর— এই সব কিছু মিলে একটি শিশুর আবেগ-জগৎকে সমৃদ্ধ করে। এই সম্পর্কগুলি শেখায় ভাগ করে নিতে, মানিয়ে নিতে, সহমর্মিতা, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সম্পর্কের মূল্য বুঝতে। এখন সেই শেখার সুযোগ অনেকটাই কমে গেছে। ফলে শিশুরাও অনেক সময় আত্মকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে, বা সামাজিক সম্পর্ক গড়তে অস্বস্তি বোধ করে।

এক সময় এই শব্দগুলো হয়তো পুরোপুরি হারিয়ে যাবে আমাদের জীবন থেকে। তবে, সেই সময়টা খুব সুখের হবে না।

পিয়ালী ঘোষ, হাওড়া

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন