State Medical Council

আশ্রয় নেন সন্দীপ, রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল কি ‘দুর্নীতি-ভবন’

আর জি কর কাণ্ডে ফের তদন্ত শুরু হতেই খাস কাউন্সিলের সদস্যদের একাংশ অতিথিশালায় সন্দীপের থাকা নিয়ে ঘনিষ্ঠ মহলে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।

শান্তনু ঘোষ

শেষ আপডেট: ২৭ মে ২০২৬ ০৮:১২
Share:

পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিল। সল্ট লেকে। ছবি: স্নেহাশিস ভট্টাচার্য।

আইবি-১৯৬, সেক্টর-৩, সল্ট লেক।

চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে যে কোনও অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব যে সংস্থার উপরে, সেই সংস্থার দফতরকেই ‘সেফ হাউস’ করে নিয়েছিলেন আর জি করের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ। অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৯ অগস্ট তরুণী চিকিৎসকের দেহ উদ্ধারের পর থেকে দু’তিন দিন সল্ট লেকের এই ঠিকানাতেই রাত কাটিয়েছিলেন আর জি করের তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ! বাড়িটি আদতে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের অফিস। তারই পাঁচতলায় রয়েছে কাউন্সিলের অতিথিশালা।

আর জি কর কাণ্ডে ফের তদন্ত শুরু হতেই খাস কাউন্সিলের সদস্যদের একাংশ অতিথিশালায় সন্দীপের থাকা নিয়ে ঘনিষ্ঠ মহলে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। তাঁদের দাবি, বিষয়টি জানার পরে কাউন্সিলের সদস্যদের একাংশের আপত্তিতে এক শীর্ষ পুলিশ কর্তা এসে বের করে নিয়ে গিয়েছিলেন সন্দীপকে। ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ওই পুলিশ কর্তাকে নিলম্বিতও করেছেন। কাউন্সিলের সভাপতি সুদীপ্ত রায় অবশ্য দাবি করেছেন, ‘‘সন্দীপ থাকার বিষয়টি অসত্য। তবে দরপত্র ডাকা না হলেও তিনটি কোটেশন নিয়ে অতিথিশালা সংস্কার করা হয়েছিল।’’

রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলকে ঘিরে দীর্ঘ বছর ধরে বিভিন্ন দুর্নীতি, বেনিয়মের অভিযোগ তুলছেন খোদ চিকিৎসকেরাই। আর জি কর আন্দোলনের সময়ে তা তুঙ্গে উঠেছিল। কাউন্সিলের পাঁচতলা ভবনটি দুর্নীতির আখড়া হয়ে উঠেছিল বলেই অভিযোগ। কাউন্সিলের অন্দরেরই খবর, ২০২২-সালে কাউন্সিল নির্বাচনের পরে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নেতা তথা উত্তরবঙ্গের চিকিৎসকদের থাকার জন্য কোনও রকম দরপত্র না ডেকেই ভবনের পাঁচতলায় অতিথিশালা সংস্কার করা হয়েছিল। দরপত্র ছাড়া প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা কী ভাবে খরচ করা হল, তা নিয়ে আপত্তি তুলে কাউন্সিলের ফিনান্স কমিটির বৈঠকে নথিতে কয়েক জন চিকিৎসক-সদস্য সেই সময় সই করেননি বলেও খবর।

এখন চিকিৎসক মহলের দাবি, নির্বাচন থেকে শুরু করে নিয়োগ-সহ ভুরিভুরি বেনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ মেডিক্যাল কাউন্সিলের বিরুদ্ধেও সরকারের জোরদার তদন্ত করা প্রয়োজন। বিধায়ক চিকিৎসক শারদ্বত মুখোপাধ্যায় বলেন, “কাউন্সিলের বিভিন্ন দুর্নীতির বিরুদ্ধেই দীর্ঘ দিন ধরে লড়ছি। কাউন্সিলের প্রতিটি নিয়োগে টাকা, না হলে সুপারিশে কাজ হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “অতিথিশালায় কোনও সিসি ক্যামেরা ছিল না। যাতে দিনের পর দিন সেখানে বিভিন্ন অনৈতিক কাজে অসুবিধা না হয়। ওখানে সন্দীপ ঘোষও গাঢাকা দিয়েছিল।”

আর জি করের আন্দোলন থেকেই বারবার দাবি উঠেছিল রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের বোর্ড ভেঙে দিতে হবে। যদিও সেটি স্বশাসিত সংস্থা বলে দাবি করে পদক্ষেপ করেনি রাজ্য সরকার। মেডিক্যাল এডুকেশন সার্ভিসে যুক্ত সাত জন এবং তাতে যুক্ত নন এমন সাত জন চিকিৎসক কাউন্সিলের বোর্ডে নির্বাচিত হয়েছিলেন। বোর্ডে আরও তিন জন সরকার মনোনীত সদস্য ছিলেন। তাঁদের মিলিয়ে সদস্য সংখ্যা ১৭। তবে নিয়মানুযায়ী ওই বোর্ডে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিকর্তা ও স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও থাকতে পারেন। সিনিয়র চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, নিয়মানুযায়ী নির্বাচিত ও মনোনীত সদস্য মিলিয়ে মোট সংখ্যার অন্তত ৫০ শতাংশ পদত্যাগ করলে কিংবা না থাকলে বোর্ড ভেঙে গিয়ে গভর্নিং বডি তৈরি করতেপারে সরকার।

বাস্তবে কাউন্সিলে এখন সরকার মনোনীত কোনও সদস্য নেই। আবার, এক সদস্যের মৃত্যু হয়েছে, গত সপ্তাহে পদত্যাগ করেছেন দু’জন। আর এক সদস্য অভীক দে-র বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলছে, সেখানে তিনি কী ভাবে কাউন্সিলে থাকতে পারেন তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। বিধায়ক চিকিৎসক শারদ্বত মুখোপাধ্যায় বলেন, “কাউন্সিল আদতে কালীঘাটের স্বশাসিত ছিল। তাই কাউন্সিলরাখার যৌক্তিকতা ও নৈতিক অধিকারও নেই।”

কাউন্সিলের অন্দরের সদস্যরাও এখন ঘনিষ্ঠ মহলে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। অভিযোগ, দীর্ঘ দিন ধরেই সভাপতি, সহসভাপতি ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে সদস্যদের একাংশ প্রতিবাদ করেছেন। নিজেদের মধ্যেই প্রায়ই বিবাদ লেগে থাকত। এ-ও অভিযোগ, অবসরের পরেও সরকারি নিয়ম না মেনে রেজিস্ট্রার পদে থেকে গিয়েছিলেন মানস চক্রবর্তী। আদালতের নির্দেশে শেষমেশ তিনি পদ থেকে সরে দাঁড়ালেও, তাঁকে উপদেষ্টা পদে রাখা হয়েছে। বেশ কয়েক মাস আগে সহ-রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগেও চরম স্বজনপোষণের অভিযোগ উঠেছে। সূত্রের খবর, কাউন্সিলের এক সদস্যের তৈরি করা প্রশ্নপত্রেই পরীক্ষা হয়েছিল। তাতে তাঁরই এক আত্মীয় ১০০-র মধ্যে ৮০-৮৫ নম্বর পান। সেখানে দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রার্থীর নম্বর ছিল ৫৫ মতো। কী ভাবে এতটা ফারাক হল, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন পরীক্ষা-কমিটির সদস্যরাও। অভিযোগ, চতুর্থ স্থানে থাকা প্রার্থীকে পরে আবার পরীক্ষা নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে তুলে আনা হয়েছিল। যিনি কাউন্সিলের এক কর্তার ঘনিষ্ঠের নিকটাত্মীয়। এ প্রসঙ্গে সুদীপ্ত বলেন, ‘‘পরীক্ষার পুরো ভিডিয়োগ্রাফি করা আছে। স্বচ্ছতার সঙ্গে আপস করা হয়নি। আর দুই জন শিক্ষক চিকিৎসক সদস্য ওই পরীক্ষার দায়িত্বে ছিলেন।’’

জানা যাচ্ছে, কাউন্সিলে ১৭ জন সদস্যের নেতৃত্বে আলাদা-আলাদা ‘পিনাল ও এথিক্স’ কমিটি ছিল। তাতে বাইরের আরও পাঁচ-ছ’জন অন্য চিকিৎসকও রয়েছেন। কোনও চিকিৎসকের বিরুদ্ধে চিকিৎসা সংক্রান্ত অভিযোগ এলে, তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব ছিল ওই কমিটির। সেখান থেকে রিপোর্ট যায় কাউন্সিলের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের কাছে। দোষ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে চার্জশিট তৈরি হয়। অভিযোগ, শাস্তির সিদ্ধান্তের আগেই লক্ষাধিক টাকায় মামলার রফা হয়ে যায়। আবার, নিয়ম বহির্ভূত ভাবে কাউন্সিল থেকে মাসে ৫০ হাজার টাকা করে ভাতা নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তিন সদস্যের বিরুদ্ধে।

আর জি কর আন্দোলনের সময়ে এই বিষয়ে বিতর্ক হওয়ায় তৎকালীন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীকে চিঠি পাঠিয়ে ওই ভাতা বন্ধের দাবি তুলেছিলেন কাউন্সিলের সদস্য, চিকিৎসক কৌশিক বিশ্বাস। কৌশিক বলেন, ‘‘তৃণমূলের মুখপাত্র হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন অনৈতিক বিষয়ে প্রতিবাদ করেছি। নিজের ভাতা বন্ধ করেছি। কাউন্সিলকে জানানো সব অভিযোগেরই নথি আছে। তবে বাইরে কিছু বলব না।’’ যদিও এখনও দু’জন সদস্য মাসে ভাতা নিচ্ছেন বলে কাউন্সিল সূত্রের খবর। সুদীপ্তের কথায়, ‘‘মামলা নিষ্পত্তিতে টাকার লেনদেনের প্রমাণ সহ নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন