‘অবশেষে জীবন থেকে নিষ্কৃতি হরিশের, মৃত্যু এমসে’ (২৫-৩) শীর্ষক প্রতিবেদনটি যতটা হৃদয়বিদারক, ততটাই নজিরবিহীন ও সম্মানজনক। প্রায় ১৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিশ্চল থেকে দীর্ঘ যন্ত্রণাদায়ক জীবন কাটানোর পর ৩১ বছরের হরিশ এই পরোক্ষ নিষ্কৃতি-মৃত্যুর সহায়তা পেলেন। পুরো প্রক্রিয়াটি সংবিধানের ২১তম অনুচ্ছেদের আওতায় সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে কার্যকর হল। মানবাধিকারের অমোঘ স্বার্থে দেশের সুপ্রিম কোর্ট এই প্রথম বার এমন আইন প্রয়োগের পক্ষে যুগান্তকারী রায় দেন।
পরোক্ষ নিষ্কৃতি-মৃত্যু হল দীর্ঘকালীন জীবনদায়ী চিকিৎসার ভেন্টিলেটর সাপোর্ট বা কৃত্রিম শ্বাসগ্রহণের সহায়তা সরিয়ে দিয়ে, বা ওষুধ বন্ধ করার মধ্য দিয়ে যন্ত্রণাবদ্ধ রোগীকে জৈবিক অস্তিত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া, যা ভারতে প্রথম বার হরিশের ক্ষেত্রে ঘটল। আর প্রত্যক্ষ নিষ্কৃতি-মৃত্যু হল প্রাণঘাতী বা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীর অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে চিকিৎসকের সক্রিয় সহায়তায় ওষুধ ও ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে ইচ্ছামৃত্যুর অধিকার দেওয়া— যে মৃত্যুবরণকে আজ নেদারল্যান্ডস, সুইৎজ়ারল্যান্ড, বেলজিয়াম প্রভৃতি দেশ ইতিমধ্যে সম্মানের সঙ্গে বৈধ বা মৃত্যুর অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
উল্লেখ্য, নেদারল্যান্ডসে জটিল মানসিক অবসাদ ও আরও নানা কষ্ট থেকে নিষ্কৃতি পেতে ২৯ বছরের এক যুবতী মৃত্যুর আবেদন করেছিলেন। তাঁকে ইচ্ছামৃত্যুর ছাড়পত্র দেওয়া হয়। আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও প্যারালিম্পিকসে সোনা, রুপো এবং ব্রোঞ্জজয়ী বেলজিয়ামের মারিয়েকে ভারভুর্ট ২০১৯ সালে মাত্র ৪০ বছর বয়সে স্বেচ্ছায় নিষ্কৃতি-মৃত্যুকে বেছে নেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। যন্ত্রণা আর সহ্য করতে পারছিলেন না বলেই চিকিৎসকেরা অবশেষে তাঁকে আইনানুযায়ী প্রত্যক্ষ বা স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি দেন।
ভারতে জাতীয় উপশমকারী সেবা কর্মসূচীর পরিচালিত তথ্য ও নানা সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশের কোটিরও বেশি মানুষ দুরারোগ্য ও অনারোগ্য রোগে ভোগেন। নিয়মিত উপশমকারী ঠিক চিকিৎসার প্রয়োজন এঁদের বহুলাংশের। বর্তমানে দেশে উপশমকারী সেবা ব্যবস্থার অভাব, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্য পরিকাঠামো, রোগীর পরিচর্যার জন্য প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি এবং সর্বোপরি আর্থিক দুরবস্থার প্রবল চাপ— এই সব কারণে বাস্তবে এঁদের মধ্যে প্রায় ১%–৪% মানুষ এই ব্যয়বহুল পরিষেবার সুযোগ পান। ‘কোয়ালিটি অব ডেথ’ (কষ্টের মধ্য দিয়ে জীবনাবসান) সূচকেও ভারতের অবস্থান একেবারেই নিম্নস্তরে, যা উদ্বেগজনক। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের মতে, স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার সর্বস্তরে উপশমমূলক সেবা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
ভারতের দীর্ঘকাল পীড়িত বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষের জন্য উপযুক্ত উপশমকারী স্বাস্থ্য-পরিষেবা গড়ে তোলা অবশ্য কর্তব্য। এবং একই সঙ্গে তাঁদের অসহনীয় রোগ-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে নিষ্কৃতি মৃত্যুর বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত, প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তোলাও আবশ্যিক।
পৃথ্বীশ মজুমদার, কোন্নগর, হুগলি
মানবিক সিদ্ধান্ত
দীর্ঘদিন কোমায় থাকা এক রোগীর ক্ষেত্রে জীবনদায়ী ও সহায়ক চিকিৎসা প্রত্যাহারের অনুমতি দিয়ে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে বাস্তবিকই হরিশ রানার সুস্থ হয়ে ওঠার আর কোনও সম্ভাবনা ছিল না। এই প্রেক্ষাপটে আদালতের নির্দেশমতো ‘প্যাসিভ ইউথানেসিয়া’ বা জীবনরক্ষাকারী কৃত্রিম ব্যবস্থা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া কার্যকর হয়েছে, যা দেশে ‘মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার’ নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ সৃষ্টি করেছে।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে আজ বহু ক্ষেত্রে মানুষের জীবন কৃত্রিম উপায়ে দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। কিন্তু যখন চিকিৎসা আর আরোগ্যের কোনও সম্ভাবনা দেখায় না, তখন সেই জীবনকে যন্ত্রের সাহায্যে অনির্দিষ্ট কাল ধরে টেনে নেওয়া কতটা মানবিক— এই প্রশ্নই ক্রমশ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
ভারতে এই বিতর্ক জোরদার হয় অরুণা শানবাগের মামলার রায়ের মাধ্যমে, যখন সুপ্রিম কোর্ট প্রথম বার সীমিত শর্তে ‘প্যাসিভ ইউথানেসিয়া’-র স্বীকৃতি দেয়। পরে আদালত স্পষ্ট ভাবে জানায় যে মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুবরণ করার অধিকারও সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের জীবনের অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, জীবন যেমন মূল্যবান, তেমনই জীবনের শেষ মুহূর্তেও মানুষের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রাখার অধিকার সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেই রায়ে আগাম ইচ্ছাপত্রের ধারণাকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যাতে এক জন ব্যক্তি সুস্থ অবস্থায় ভবিষ্যতের চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিজের মত প্রকাশ করে যেতে পারেন।
হরিশ রানার শেষের দিনগুলি প্রমাণ করল, এ ধরনের সিদ্ধান্ত কোনও ভাবেই সহজ নয়। মৃত্যু জীবনেরই এক অনিবার্য সত্য। সেই সত্যকে স্বীকার করে যদি কোনও অসহায় মানুষকে অন্তহীন যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়া যায় এবং পরিবারের দীর্ঘ বেদনাকেও কিছুটা লাঘব করা যায়, তবে তা মানবিকতা, সহমর্মিতা ও মর্যাদাবোধের এক পরিণত সামাজিক উপলব্ধি।
অলোক কুমার মুখোপাধ্যায়, সোদপুর, উত্তর ২৪ পরগনা
সতর্কতা জরুরি
হরিশ রানার নিষ্কৃতি-মৃত্যু বিষয়ে কিছু কথা। এক জন ভারতীয় নাগরিক হিসাবে মনে হয়, এক দিকে কৃত্রিম চিকিৎসা-সহায়তায় দীর্ঘদিন সম্পূর্ণ চেতনাহীন রোগীর জীবন টেনে নিয়ে যাওয়ার অপরিসীম বেদনাকে অস্বীকার করা যায় না; তেমনই অন্য দিকে আমাদের দেশের সামাজিক ও আর্থিক বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে এমন সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য অপব্যবহারের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই এই ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে সুস্পষ্ট, স্বচ্ছ ও কঠোর চিকিৎসা ও আইনি প্রক্রিয়া বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দেয়— জীবন ও মৃত্যুর মতো গভীর প্রশ্নে মানবিকতা, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও আইনের মধ্যে দায়িত্বশীল ও সতর্ক ভারসাম্য রক্ষা করা অপরিহার্য।
বিজুরিকা চক্রবর্তী, দমদম, কলকাতা
আইনের প্রত্যাশা
প্রায় দেড় দশক ধরে হরিশ রানা স্থায়ী ভাবে জীবনশক্তিবিহীন ও চেতনাবিরহিত অবস্থায় ছিলেন। অর্থাৎ, তাঁর মস্তিষ্কে সচেতনতার কোনও লক্ষণ ছিল না। তিনি কৃত্রিম যন্ত্র এবং চিকিৎসা-সহায়তার উপর নির্ভরশীল ছিলেন। অবশেষে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের অনুমতিতে তাঁর নিষ্কৃতি-মৃত্যু সম্ভব হল। তাঁর জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা-সহায়তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে আদালত কেন্দ্রকে নির্দেশ দিয়েছে, ভারতে জীবনের শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নিষ্ক্রিয় মৃত্যু-সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের বিষয়টি নিয়ে এগোতে।
ভারতে স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বহু চিকিৎসকই মনে করেন, যাঁরা মারণ রোগের শিকার এবং নিদারুণ শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে আছেন, তাঁদের মর্যাদার সঙ্গে নিষ্কৃতি দেওয়াই শ্রেয়। বিশ্বের বহু দেশেই নিষ্কৃতি-মৃত্যু আইনসিদ্ধ।
বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের একমাত্র ৩৫ বছরের পুত্রও আজ দীর্ঘ ১২ বছর ধরে মারণ রোগ ‘ব্রেন ক্যানসার’-এ আক্রান্ত। তাঁর মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণাকে আমরা, বাবা-মা হিসাবে, আর চোখে দেখতে পারছি না। এমন একটি আইন সম্ভবত আমাদের মতো পরিবারকেও নির্দিষ্ট কোনও দিশা দেখাতে পারে।
নিষ্কৃতি-মৃত্যুর মধ্যে যে গরিমা নিহিত রয়েছে, তার সম্মান আমাদের সকলকেই রাখতে হবে। তবে এ-ও ঠিক, অন্যান্য দেশের মতো ভবিষ্যতে আমাদেরও হয়তো এই ক্ষেত্রটিকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়োজন পড়বে।
প্রদীপকুমার সেনগুপ্ত, ব্যান্ডেল, হুগলি
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে