সাইনা চট্টোপাধ্যায় আগামী দিনে কি অভিনয় পেশাতেই থাকতে চায়? ছবি: সংগৃহীত।
প্রশ্ন: দশম শ্রেণির পরীক্ষা শেষ। এ বার একাদশ। ‘হোমস্কুলিং’-এর মাধ্যমে পড়াশোনা করেছ। এই মাধ্যমে ভাল দিক কোনটা আর কোনটা খারাপ দিক?
সাইনা: ‘হোমস্কুলিং’ শুরু করার পরেই আমি নিজের ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে পেরেছি। বুঝতে পেরেছি আমি কেমন মানুষ হতে চাই। একটাই খারাপ দিক, সে ভাবে নতুন কোনও বন্ধু তৈরি হয় না। তবে এই মাধ্যমে পড়াশোনার আগে আমি খুব নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতাম, যা আমার মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলত। কিন্তু বাড়িতে পড়াশোনা সেই সব ভাবনা-চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছে।
প্রশ্ন: কী বিষয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে তুমি?
সাইনা: আমি নিজের বাহ্যিক গঠন সম্পর্কে খুবই সচেতন। তাই সবসময় মনে হত আমি রোগা নই। আর সবসময় মনে হত স্কুলে আমাকে জনপ্রিয় হতে হবে। যেমন প্রথম ন’বছর যে স্কুলে পড়েছিলাম সেখানে আমার খুবই জনপ্রিয়তা ছিল। কিন্তু পরে যখন অন্য স্কুলে ভর্তি হই, সেখানে আমাকে নিয়ে কম আলোচনা হত তুলনায়। মনে মনে একটা জিনিস কাজ করত, যে আমাকে সবার চেয়ে সেরা হতে হবে। হোমস্কুলিং এগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছে আমাকে। দায়িত্বশীল হতেও শিখিয়েছে।
নিরাপত্তাহীনতা প্রসঙ্গে কী বলল সাইনা। ছবি: ইনস্টাগ্রাম।
প্রশ্ন: জনপ্রিয় হতে হবে, সেরা হতে হবে— এমন ভাবনা মাথায় ঢুকল কী ভাবে?
সাইনা: তখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। সেই সময় চেহারা নিয়ে খুব যে ভাবতাম তা নয়। মোটা ছিলাম। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমার চেহারা নিয়ে স্কুলে খুব হাসিমজা করত অনেকে। তার পর থেকে জিমে যাওয়া শুরু করি। স্কুলের জন্যই নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছিল। আসলে এমন সমস্যায় অনেকেই হয়তো আগে পড়েছেন। সমাজমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে কিছুটা দায়ী। এমনকি, এত ছোট ছোট জিনিস নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন অনেক।
প্রশ্ন: এই প্রজন্মের মেয়ে হিসাবে সমাজমাধ্যম তো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ তোমাদের।
সাইনা: হ্যাঁ, তা ঠিক। কিন্তু সমাজমাধ্যমে অনেক বিষয় আমার পছন্দ নয়। যেমন কেউ বলেন কানের পাশের চুল নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন কেউ। আবার ঘাড়ের কাছে চুল থাকলে তা সমস্যার মনে হয় কারও কারও। পাতলা ঠোঁট থাকলে, মোটা করতে চায়। আর অনেকে আবার উল্টোটা চায়।
‘হোমস্কুলিং’ কী কী শেখাল সাইনাকে? ছবি: সংগৃহীত।
প্রশ্ন: তুমি নিজের ঠোঁট, নাক নিয়ে খুশি?
সাইনা: ছোটবেলায় নিজের নাকটা নিয়ে মনে হত। তবে ছোটবেলা থেকে কখনও মনে হয়নি আমাকে বাজে দেখতে। মা-বাবাও সবসময় বলে এসেছে, আমাকে দারুণ দেখতে। তাই আমার আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। কিন্তু এক বার আমাকে দু’তিন জন বলেছিলেন আমার নাক হয়তো বাঁকা। তখন মনে হয়েছিল। নাক ঠিক করব। কিন্তু কোনও অস্ত্রোপচার করাব ভাবিনি। তার পরে মনে হল এই বাঁকা নাকেই আমাকে দেখতে ভাল লাগে।
প্রশ্ন: তোমার ছোটবেলা কেমন ছিল?
সাইনা: আমার ছোটবেলা সত্যিই স্বপ্নের মতো ছিল। অনেক বন্ধু ছিল। মা-বাবার খুব আদুরে তো। ছোটবেলায় কোনও দিন মা-বাবার ঝগড়া দেখিনি। খুব সুন্দর পরিবেশে বড় হয়েছি। যা চেয়েছি তাই পেয়েছি এক বার বললেই। কখনও বাবার সঙ্গে নাচ করছি।
প্রশ্ন: অভিষেক চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে হওয়ার জন্য কি অভিনেত্রী হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সহজপথ বলে মনে হয়?
সাইনা: আমার বাবা প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা। এটা তো আমি অস্বীকার করতে পারি না। ফলে এই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ শুরু করা সত্যিই সহজ। কারণ, অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। আমাকে সত্যি অনেক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়নি। বাবার জন্যে সেই পথ খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু মানুষ আমাকে পছন্দ করে সেটা আমার কাজের জন্য। ‘কনে দেখা আলো’ ধারাবাহিকের জন্য খুবই খেটেছি। বাবা ভাল অভিনেতা মানে যে আমিও ভাল অভিনেত্রী হব সেটা বলা যায় না।
বাবাকে হারিয়ে কি একধাক্কায় অনেকটা বড় হয়ে গিয়েছে সাইনা? ছবি: সংগৃহীত।
প্রশ্ন: এই কারণে কখনও মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে?
সাইনা: না, মানসিক চাপ হিসাবে দেখি না। কেউ বাবার সঙ্গে আমাকে তুলনা করলে তাতে আমার গর্বই হয়। নেতিবাচক মন্তব্য করলে সেটাকে গুরুত্বই দিই না।
প্রশ্ন: তুমি কি অভিনেত্রী হতেই চেয়েছিলে?
সাইনা: ছোটবেলা থেকেই অভিনয় করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু এখন পড়াশোনা করতেও খুব ভাল লাগে। মনোবিজ্ঞান প্রিয় বিষয়। তাই জানি না, ভবিষ্যতে কোন দিকে এগোব। এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি।
প্রশ্ন: আচমকা বাবাকে হারানো সাইনার মধ্যে কী পরিবর্তন এনেছে?
সাইনা: বাবা চলে যাওয়ার আগে আমি একেবারে অন্যরকম ছিলাম। ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনে হয়, খুব একটা ভাল বাচ্চা ছিলাম না। মা যদিও এই কথাটা মানতে চাইবে না। তখন অনেক বেশি আদুরে ছিলাম। কিছু ভাবতাম না। এখন অনেকটা পরিণত হয়েছি। জটিল পরিস্থিতি বুঝতে শিখেছি। সিদ্ধান্ত নিতে শিখেছি। নিজেকে বুঝতে শিখেছি। কে কী বলতে পারে, আমি কী করতে পারি— সবটা আমার মাথায় স্পষ্ট।
প্রশ্ন: ছোটবেলা থেকে রোজগার করছ। যা তুমি নিজে চাইছ তা-ই কিনতে পারছ। মাটিতে পা রেখে কী ভাবে চলছ, নিজেকে তৈরি করছ কী ভাবে?
সাইনা: সবসময় তাই অনেক ভেবে চলি। প্রথম থেকেই মাকে বলে রেখেছি, যদি কখনও মনে হয় আমার ঔদ্ধত্য হয়ে গিয়েছে, আমাকে সঠিক পথ দেখিয়ে দিও। এই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ শুরুর পরে অনেকেই অন্যরকম হয়ে যায়। এটা আমি চোখের সামনে দেখেছি। তাঁরা নিজেরাও বুঝতে পারেন না নিজের পরিবর্তন। আমি সত্যি কখনও চাই না এমন কোনও পরিবর্তন আমার মধ্যে আসুক।