Tamil Nadu Assembly Elections 2026

সংখ্যাজটে ভোট

সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচনে এক দিকে থাকে আসনের হিসাব এবং তার ব্যবধান, আর অন্য দিকে থাকে ভোট শতাংশের ব্যবধান। ২০২৬-এর সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে বিজেপি এবং তৃণমূলের ভোট শতাংশের তফাত ৫%, আসনের তফাত ১২৭।

শেষ আপডেট: ১৪ মে ২০২৬ ০৬:৩৮
Share:

তামিলনাড়ুতে এ বার একটি আসনে জয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান মাত্র একটি ভোটের। এবং সেই সবেধন নীলমণি ভোটটি পোস্টাল ব্যালটে এসেছে বলে তা নিয়েও বিতর্ক। বিজয়ী দল টিভিকে-র জয়ী প্রার্থী শ্রীনিবাস সেতুপতির বিরুদ্ধে আদালতে গেলেন পরাজিত প্রার্থী, তিন বারের ডিএমকে বিধায়ক পেরিয়াকরুপ্পান। মাদ্রাজ হাই কোর্টের মতে পেরিয়াকরুপ্পানের আবেদন যথেষ্ট জোরালো, ফলে আদালতের আদেশ— জয়ী প্রার্থী এখনই বিধানসভায় যোগ দিয়ে কোনও কার্যক্রম কিংবা ফ্লোর টেস্ট-এ যোগ দিতে পারবেন না। ভারতের ঘটনাবহুল নির্বাচনী ইতিহাসেও এমন কাণ্ড দুর্লভ। আদালতের সিদ্ধান্ত যা-ই হোক না কেন, এমন ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতে সংখ্যার হিসাবে জয়-পরাজয় নির্ধারণেও কত সমস্যা হতে পারে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতি— যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কতখানি নৈতিক তা নিয়ে এখন বিশ্বব্যাপী বিতর্ক। একটি নির্বাচকমণ্ডলে কুড়ি হাজার জন থাকলে, তার নয় হাজার নয়শো নিরানব্বইটি ভোট এক দিকে, আর দশ হাজার একটি ভোট অন্য দিকে পড়লে কিছু নৈতিক প্রশ্ন উঠতেই পারে। রাষ্ট্রতাত্ত্বিক বলতে পারেন, এই পদ্ধতির বদলে বরং জনসংখ্যার আনুপাতিক হারেই বিজয় স্থির করা উচিত। ২০২৬ সালের ভোটেও এই প্রশ্ন উঠল।

কেবল তামিলনাড়ু নয়, পশ্চিমবঙ্গের ভোটও এই সমস্যা তুলে ধরে। সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচনে এক দিকে থাকে আসনের হিসাব এবং তার ব্যবধান, আর অন্য দিকে থাকে ভোট শতাংশের ব্যবধান। ২০২৬-এর সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে বিজেপি এবং তৃণমূলের ভোট শতাংশের তফাত ৫%, আসনের তফাত ১২৭। অর্থাৎ প্রতি এক শতাংশে প্রায় পঁচিশটি আসনের ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বলতে পারেন, সব জায়গার জনবিন্যাস এক রকম না-হলে ভোট শতাংশের ব্যবধানের তুলনায় আসনের সংখ্যার এই ব্যবধান বেশ বেশি। তবে প্রণিধানযোগ্য— এই রাজ্যে এমন প্রথম বার হল না। মনে করা যেতে পারে, ২০১১ সালে যখন এই রাজ্যে শেষ বড় পালাবদল ঘটিয়ে বাম ফ্রন্ট সরকারকে সরিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে, তখনও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল। ভোটে শতাংশের ৭% তফাতে আসনের ব্যবধান হয়েছিল ১৬৪, অর্থাৎ প্রতি ১ শতাংশে ২৩টি আসনেরও বেশি। এ বারে তৃণমূলের ভোট শতাংশের হার ৪১%। ঠিক একই ভাবে ২০১১ সালেও বাম জোটের জনসমর্থন ছিল ৪১%। সুতরাং অনেক দিক থেকেই এই দু’টি পালাবদল এক বিন্দুতে দাঁড়িয়ে। এর অর্থ— বহুদলীয় গণতন্ত্র হলেও যখনই বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তীব্র মেরুকরণ ঘটে যায়, জনসমর্থনে স্বল্প ক্ষয়ও আসনের হিসেবে ধসের চেহারা নেয়। যে-হেতু শেষ পর্যন্ত আসনসংখ্যাই ভোট ফলাফলের একমাত্র নির্ধারক, এই সমর্থনের ব্যবধান আর আসনের ব্যবধান অনেক আলাদা হলেও একমাত্র গ্রহণযোগ্যতা থাকে দ্বিতীয়টিরই। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর ফলে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ ভোটার হিসাবে অনিশ্চিত হওয়ায় ভোট দিতে অপারগ হয়েছেন, ফলে এই সংখ্যাতত্ত্ব এ বার আরওই চর্চায় উঠে আসছে।

সাম্প্রতিক অতীতে অনেক বার আলোচিত হলেও বিষয়টি নিয়ে কোনও সুরাহা হয়নি, সুরাহা হওয়া খুব সহজও নয়। অনেক পশ্চিমি গণতন্ত্রের মতোই ভারতেও এখনও ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ ব্যবস্থাই চলমান। প্রসঙ্গত, জার্মানি এ বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করেছে, আরও কিছু দেশ আনুুপাতিক নির্বাচনী পদ্ধতি চালু করার দিকে এগোচ্ছে। গণতন্ত্র একটি গতিশীল প্রক্রিয়া, এবং গণতন্ত্রের নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার আলোচনায় ভারতের অভিজ্ঞতা স্বাভাবিক ভাবেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এ বারের অভিজ্ঞতাও তাতে কিছু অতিরিক্ত মাত্রা যোগ করল।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন