Jutemill

স্বখাতসলিল

পাটের পুনরুজ্জীবনের জন্য কেন্দ্র কম বিনিয়োগ করেনি— চটকলগুলির আধুনিকীকরণ, পাট চাষে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছে।

শেষ আপডেট: ০২ জুন ২০২৬ ০৮:৫৫
Share:

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

পশ্চিমবঙ্গের চটকল দীর্ঘ দিন ধরেই থাকে দু’টি অবস্থায়, সঙ্কটজনক আর অতি সঙ্কটজনক। সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে আধা-তৈরি পাটসামগ্রীর আমদানির ফলে বিপদঘণ্টা বেজেছে— ১৪টির মতো চটকলে তালা ঝুলেছে, বহু চটকলে রাতের শিফ্‌ট বন্ধ হয়েছে, প্রায় ৮০ হাজার কর্মী কাজ হারিয়েছেন। কর্মী সংগঠন এবং মালিক সংগঠন, দু’তরফই বাংলাদেশ থেকে পাটের পণ্য আমদানি বন্ধ করার জন্য রাজ্য এবং কেন্দ্রের সরকারের কাছে দরবার করছে। যে পণ্য দেশের চটকল তৈরি করছে, সে পণ্য কেন পড়শি দেশ থেকে আমদানি করা হবে, এই হল তাঁদের অভিযোগ। কর্মসংস্থানের নিরিখে অবশ্যই এর সপক্ষে যুক্তি পাওয়া যায়— ৮০ হাজার কাজ জোগানোর মতো শ্রম-নিবিড় শিল্প ভারতে ক’টিই বা রয়েছে? সেই সঙ্গে জড়িত রয়েছে কয়েক লক্ষ পাটচাষির ভাগ্য, কাঁচা পাট ক্রয় ও মজুতকারী ব্যবসায়ী-কর্মীদের জীবিকার প্রশ্ন। এতগুলি মানুষের জীবিকার দিকে চেয়ে দেশি পাটশিল্পের সহায়ক নীতি গ্রহণ করার পক্ষে সওয়াল করা হবে, এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু এ প্রশ্নও উঠতে বাধ্য, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অনেক কম দামে, অনেক উত্তম মানের তৈরি পণ্য যদি পাওয়া যায়, তা হলে বেশি দামে নিম্ন মানের পণ্য কিনতে সরকার কেন বাধ্য করবে ভারতের ক্রেতাদের? বিশ্বায়িত বাজারের নিয়ম তো তা নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় যাতে স্থান করে নিতে পারে দেশের শিল্প, যাতে উচ্চমানের পণ্য সরবরাহ করতে পারে আকর্ষণীয় দামে, তার জন্য সরকারের বিনিয়োগ, সহায়তা অবশ্যই দাবি করতে পারে শিল্প সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন। কিন্তু শতাধিক বছর প্রাচীন এক শিল্পের দুর্বলতা আড়াল করতে শুল্কের সুরক্ষা চাওয়া যুক্তির ধোপে টেকে না।

পাটের পুনরুজ্জীবনের জন্য কেন্দ্র কম বিনিয়োগ করেনি— চটকলগুলির আধুনিকীকরণ, পাট চাষে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছে। সর্বোপরি রয়েছে সরকারি বরাত— ধান, গম-সহ নানা শস্যের জন্য বস্তা ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি। অথচ, পাটের কালোবাজারি, সাবেক পরিকাঠামো এবং কম উৎপাদনের জেরে অধিকাংশ চটকল দীর্ঘ দিন ধরে সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে রয়েছে। পাটশিল্পে দেখা যাচ্ছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য— এক দিকে পাটের দাম না-পেয়ে চাষিরা পাটচাষ ছেড়ে দিয়ে ঝুঁকছেন ভুট্টা, তিলের মতো অন্যান্য ফসলের দিকে, পশ্চিমবঙ্গে পাটের জমি কমেছে এক দশকে ১ লক্ষ ৭০ হাজার হেক্টর। অন্য দিকে, চড়া দামে পাট কিনতে না পেরে চটকলগুলি দরজা বন্ধ করছে। এই দুইয়ের মধ্যে কাজ করেছে কালোবাজারের কুচক্র। চাষির থেকে কম দামে পাট কিনে অবৈধ গুদামে মজুত করে কৃত্রিম ভাবে বাজারে পাটের দাম বাড়াচ্ছে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী। কিছু চটকল যথাসময়ে বস্তা জোগানোর শর্ত না মিটিয়ে গোপনে কাঁচা পাট বিক্রি করছে। জুট কমিশনরের দফতরের নির্দেশে পুলিশি তল্লাশি, বেআইনি গুদামের পাট বাজেয়াপ্ত করার নাটক সংবাদে আসে বার বার। কিন্তু প্রায় প্রতি বছরই বস্তার জোগানে অন্তত ২৫-৩০ শতাংশ ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। ফলে চটের বস্তার বাজার কেবলই খেয়ে যাচ্ছে প্লাস্টিক— যথাসময়ে যথেষ্ট চটের বস্তার অভাবে খাদ্যশস্য মজুতের জন্য চাষিদের প্লাস্টিকের বস্তা ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে কেন্দ্র। যা পরিবেশকে বিপন্ন করছে।

পাটের সঙ্কট বহুমাত্রিক। পুকুর, নয়ানজুলি প্রভৃতি ক্রমাগত বুজিয়ে দেওয়ায় পাট পচানোর মতো স্বচ্ছ জল নেই রাজ্যে। অপরিষ্কার জল পাটের গুণমান নষ্ট করছে। উন্নতমানের কাঁচা পাটের জন্য বাংলাদেশেরই মুখ চেয়ে থাকে পশ্চিমবঙ্গের পাট শিল্প। অতএব আজ যদি বা পাটচাষি, চটকল শ্রমিক এবং শিল্পপতিদের দাবি মেনে ভারত সরকার বাংলাদেশ থেকে পাটসামগ্রী আমদানি বন্ধ করে, তাতে ভারতের পাটশিল্পের সুরাহা হবে কতটুকু? বাংলায় উন্নতমানের পাটের ফলন, দামের নিশ্চয়তা, চটকলগুলিতে বিধিবদ্ধ, উন্নত উৎপাদন, এগুলোই হল প্রধান পরীক্ষা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন