Digital Amnesia

স্বেচ্ছা-বিস্মরণ

যন্ত্র মানুষকে যান্ত্রিক কাজের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দিয়েছে। ফলে, তার মগজের ক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব তুলনায় জটিলতর সৃষ্টিশীল কাজের ক্ষেত্রে। কিন্তু, যান্ত্রিক কাজের থেকে মুক্তিকে আলস্যের সুযোগে পরিণত করলে সমূহ বিপদ।

শেষ আপডেট: ১০ মে ২০২৬ ০৮:২৭
Share:

মোবাইল ফোন সর্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠার আগে যাঁদের সচেতন জীবনের খানিকটা কেটেছে, তাঁদের মধ্যে অনেকেই হয়তো অন্তত দু’-চারটে ফোন নম্বর এখনও স্মৃতি থেকে বলতে পারবেন। সে নম্বর এখন হয়তো তামাদি; যাঁর নম্বর, তাঁর সঙ্গেও হয়তো যোগাযোগ রাখার কোনও কারণ আর অবশিষ্ট নেই— কিন্তু, স্মৃতিতে সে নম্বর থেকে গিয়েছে। যাঁদের মোবাইল-যুগে জন্ম বা বেড়ে ওঠা, খুব ব্যতিক্রমী দু’-এক জন বাদে কেউ কোনও ফোন নম্বর মনে রাখার কথা চিন্তাও করেন না। এক বার স্পর্শেই যে নম্বর ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে, তা স্মরণে রাখা অনর্থক বলেই মনে হয়। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের জন্মদিনও মনে করিয়ে দেয় বিভিন্ন অ্যাপ— ফলে, মনে রেখে শুভেচ্ছা জানানোর আর প্রয়োজন পড়ে না। সে তারিখগুলোও স্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। শুধু কিছু নম্বর আর তারিখই নয়, যে কোনও তথ্য যে-হেতু এখন আক্ষরিক অর্থেই মুহূর্তে খুঁজে পাওয়া যায় ‘ওয়েব সার্চ’-এর মাধ্যমে, তাই তথ্য মনে রাখার ইচ্ছা এবং ক্ষমতা, উভয়ই কমেছে। স্নায়ুবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের পরিসরে গত দেড় দশকে এই প্রবণতা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। এর পোশাকি নাম হল ডিজিটাল অ্যামেনেশিয়া বা ডিজিটাল বিস্মৃতি। গত বছর তিনেকে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কৃত্রিম মেধা-নির্ভরতা— শুধু মনে রাখার কাজ নয়, ভাবার কাজগুলোতেও আরও বেশি করে যন্ত্রনির্ভর হয়ে উঠছে মানুষ। এমনকি, যাঁরা সচেতন ভাবে কৃত্রিম মেধা-নির্ভরতা এড়িয়ে চলতে চান, তাঁরাও। পথ চেনানোর দায়িত্ব এখন জিপিএস-নির্ভর অ্যাপের হাতে; কোন জিনিসটা কিনলে আর কোনটা কেনা উচিত, সে কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে ই-কমার্সের কৃত্রিম মেধা-চালিত ব্যবস্থা; এমনকি, মাইক্রোওয়েভ আভেনের মতো সাদামাঠা যন্ত্রও এখন নিজে ভাবতে শিখেছে, কোন খাবার গরম করতে কত ক্ষণ চলতে হবে।

স্বভাবতই এই প্রশ্ন উঠছে, মানুষ কি শেষ অবধি ভাবতে ভুলে যাবে? আশঙ্কাটি যে কিঞ্চিৎ বাড়াবাড়ি, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু, যন্ত্র ও কৃত্রিম মেধার দাপট যে মানুষের মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করছে, গবেষণাতেও তা স্পষ্ট। একাধিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের উপস্থিতিতেই মানুষের ‘কগনিটিভ এবিলিটি’ বা ভাবার ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, সে মুহূর্তে যন্ত্রগুলি ব্যবহার না করলেও। এমনকি, একটি গবেষণা বলছে, কম্পিউটার বা স্মার্টফোন সামনে থাকারও দরকার নেই, মানুষের ভাবার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে সেগুলির উল্লেখই যথেষ্ট। নাগালের মধ্যে কম্পিউটার বা স্মার্টফোন না-থাকলে নিজের জানা, এবং বিবেচনার ক্ষমতা বিষয়েও সন্দেহ তৈরি হয় মানুষের মনে। অন্য দিকে, কেউ নিজে কতখানি জানেন, সেই আত্মবীক্ষণের ক্ষমতাও প্রভাবিত হয় অতিরিক্ত ইন্টারনেট-নির্ভরতায়। কোন তথ্যটি সত্যই নিজের জানা, আর কোনটি ইন্টারনেট থেকে জেনে নেওয়া সম্ভব বলে তা ‘জানা’ বলে মনে হচ্ছে, অনেকের কাছেই সেই সীমারেখাটি ঝাপসা হয়ে যায় বলে গবেষণায় প্রকাশ। অর্থাৎ, সহায়ক থেকে যন্ত্র ক্রমে নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে, মানুষের অগোচরেই।

এই পরিণতি কি অনিবার্যই ছিল? বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, না। যন্ত্র মানুষকে যান্ত্রিক কাজের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দিয়েছে। ফলে, তার মগজের ক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব তুলনায় জটিলতর সৃষ্টিশীল কাজের ক্ষেত্রে। কিন্তু, যান্ত্রিক কাজের থেকে মুক্তিকে আলস্যের সুযোগে পরিণত করলে সমূহ বিপদ। স্নায়ুবিজ্ঞানীরা এ কথাও জানাচ্ছেন, মনে রাখার মতো যান্ত্রিক কাজে মস্তিষ্কের যে ব্যবহার হয়, তা অন্য কাজের ক্ষেত্রেও সহায়ক হয়। কাজেই, যান্ত্রিক কাজগুলি থেকে মুক্তি মিললেও মস্তিষ্কের ব্যায়াম ক্রমাগত চালিয়ে যেতে হবে। কৃত্রিম মেধার সাহায্যে যে কাজগুলি করা যায় না, যে কাজে অধিকতর সৃষ্টিশীলতা প্রয়োজন, সে কাজে আরও বেশি মনোনিবেশ করা জরুরি। আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মনোযোগী হওয়ার। চার পাশে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে অজস্র ঘটনা— তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ, কিছু নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর। কিন্তু, বিবর্তনের দীর্ঘ যাত্রা মানুষের মস্তিষ্ককে বিভিন্ন আপাত-অসম্পর্কিত ঘটনার মধ্যেও নিহিত যোগসূত্র আবিষ্কার করতে সক্ষম করেছে। তার জন্য প্রয়োজন চার পাশের ঘটনায় মনোযোগী অভিনিবেশ। সেই সঙ্গে প্রয়োজন— দ্রুত ও সহজলভ্য উত্তর খোঁজার প্রবণতা থেকে সচেতন ভাবে দূরে থাকা। নিজের বিচারবুদ্ধির নিত্য ও ক্রমাগত অনুশীলনই মানুষকে যন্ত্রের দাসে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে। স্বেচ্ছা-বিস্মরণ থেকে রক্ষা করতে পারে নিজেকে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন