এ বারের কেন্দ্রীয় বাজেটে সরকার প্রতিরক্ষা খাতে ৭.৮৫ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, যা আগের বছরের বাজেট অনুমানের তুলনায় প্রায় ১৫% বেশি। এর মধ্যে ২.১৯ লক্ষ কোটি টাকা মূলধন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য। বস্তুত, সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকীকরণ এবং তাদের নিয়মিত প্রয়োজনীয়তা পূরণের পাশাপাশি, বর্ধিত বরাদ্দ অপারেশন সিঁদুর-এর পর জরুরি অস্ত্র, প্রযুক্তি ও গোলাবারুদ ক্রয়ের ফলে উদ্ভূত আর্থিক চাহিদাও পূরণ করবে। প্রস্তাবিত মোট প্রতিরক্ষা বাজেট সরকারি ব্যয়ের ১৪.৭% এবং সকল মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সামরিক ক্ষেত্রে আধুনিকীকরণ একটি কৌশলগত অপরিহার্যতা। তা ছাড়া অপারেশন সিঁদুর-এর পরে পাকিস্তান তো বটেই, চিন এবং বাংলাদেশের সঙ্গেও সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়টি ভারতের কাছে আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে। অন্য দিকে, এই স্বল্পমেয়াদি সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে আধুনিক লড়াই বর্তমানে কতখানি সাইবার ক্ষমতা, মহাকাশ সম্পদ, চালকবিহীন প্রযুক্তি এবং তথ্য-চালিত যুদ্ধের উপরে নির্ভরশীল। তাই এই ক্ষেত্রগুলিতে বিনিয়োগ কেবল দেশের নিরাপত্তা বৃদ্ধিরই সহায়ক নয়, বিশ্বের প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ভারতকে আরও উন্নত করবে।
তবে, প্রতিরক্ষায় ব্যয়বৃদ্ধি বিশ্ব জুড়ে, বিশেষত ভারতে চিরকালই বিতর্কের বিষয় থেকেছে। এর অন্যতম কারণ, এ দেশে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের কম ‘মাল্টিপ্লায়ার এফেক্ট’। প্রসঙ্গত, ‘মাল্টিপ্লায়ার এফেক্ট’ হল একটি অর্থনৈতিক ধারণা, যেখানে প্রাথমিক ভাবে ব্যয়ের প্রভাব (সরকারি বিনিয়োগ, উপভোক্তা ব্যয় ইত্যাদি) দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি)-কে পরিচালিত করে বৃহত্তর বৃদ্ধির দিকে। অথচ, ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা ব্যয় স্বাস্থ্য ও শিক্ষার জন্য সম্পদ বরাদ্দের সুযোগ সঙ্কুচিত করে, যা দীর্ঘমেয়াদি মানব পুঁজি এবং বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শুধু তা-ই নয়, বড় প্রতিরক্ষা ক্রয় প্রকল্পগুলি প্রায়শই সম্পূর্ণ হতে দীর্ঘ সময় লাগে, যার প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতিতেও। তা ছাড়া, বাজেটের একটি অংশ বেতন, পেনশন এবং রক্ষণাবেক্ষণ (রাজস্ব ব্যয়) প্রদানে যায়, যা রাস্তা, সেতু বা যন্ত্রপাতির মতো নতুন সম্পদ তৈরি করে না। এগুলো প্রয়োজনীয় ঠিকই, তবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে এদের অনুৎপাদনশীল বলেই ধরা হয়। তবে, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সরকার স্বদেশীকরণের প্রচেষ্টা করলেও, এ-যাবৎ উচ্চ আমদানি নির্ভরতা এখনও ‘মাল্টিপ্লায়ার এফেক্ট’-কে কমই রেখেছে।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের জন্য প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ব্যয় অপরিহার্য। তাই এমন নীতি নির্ধারণ জরুরি, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় মুদ্রা স্থিতিশীল থাকে। সেই সঙ্গে দেশের বাজারে উপযুক্ত সংস্থান করতে হবে যাতে আরও বিদেশি বিনিয়োগের পথ সুগম হয়। পাশাপাশি ঋণের সুযোগ বৃদ্ধি, কর প্রণোদনা প্রদান এবং নিয়ন্ত্রক বাধা হ্রাস করে বেসরকারি খাতের মূলধন ব্যয়কে (ক্যাপেক্স) উৎসাহিত করতে পারে কেন্দ্রীয় সরকার। অভ্যন্তরীণ ভাবে প্রতিরক্ষা মূলধন উৎপাদন বৃদ্ধি করে এবং এই প্রচেষ্টায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করে, কেন্দ্রীয় সরকার আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ‘মাল্টিপ্লায়ার এফেক্ট’ বৃদ্ধি করতে পারে। ‘আত্মনির্ভর’ হতে হলে এ ছাড়া গত্যন্তর নেই কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে