নথি নেই, ভোটার তালিকায় স্থান নেই— সম্প্রতি এমনই দাবি করেছেন বিজেপির বসিরহাট সাংগঠনিক জেলার সভাপতি। তাঁর বক্তব্যের প্রেক্ষিত— ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ক্ষোভে উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটে অবরোধ। মন্তব্যটি তাৎক্ষণিক নয়, বরং এসআইআর-এর গোড়া থেকে এ কথাই কেন্দ্রীয় শাসক দল, এবং নির্বাচন কমিশনের তরফে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলেছে। এবং ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে কী হতে পারে, রাতারাতি অ-নাগরিকের তালিকাভুক্ত হওয়া, শরণার্থী শিবিরে পাঠানো, অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া, না কি সমস্ত সরকারি প্রকল্প থেকে বাদ পড়া— এই সমগ্র বিষয় নিয়ে এক আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর সংক্রান্ত কারণে একের পর এক মৃত্যু তারই পরিণতি। সম্প্রতি ফের সেই তালিকায় যোগ হয়েছে দু’টি নাম। মালদহের কৃষিজীবী কাবিল ইসলাম এবং দক্ষিণ দিনাজপুরের পরিযায়ী শ্রমিক জামাল মিঁয়ার নাম অতিরিক্ত তালিকায় বাদ পড়েছিল। অতঃপর কী, সেই আশঙ্কাতেই তাঁদের মর্মান্তিক মৃত্যু। এ ছাড়াও মার্চে এসেছে এসআইআর-সংক্রান্ত আরও মৃত্যুসংবাদ: শালবনির বিএলও সুবিমল কারকের, কিংবা মালদহের উৎপল থোকদারের।
গত বছর এসআইআর শুরুর পর আতঙ্কে, কাজের চাপে ঠিক কত জনের মৃত্যু ঘটেছে শুধুমাত্র এই বঙ্গে, তার নানা হিসাব। পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এক সময় শতাধিক মৃত্যুর অভিযোগ তুলেছিল। এমনও জানা গিয়েছিল, এসআইআর ঘোষণার ৩১ দিনের মধ্যেই রাজ্যে ৩৩টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। পরিসংখ্যানগুলি অভ্রান্ত— এমন দাবি করা চলে না। শুধুমাত্র এসআইআর-ই এতগুলি মৃত্যুর একমাত্র কারণ— এমন ভাবনাও একপেশে। তদুপরি, রাজনৈতিক স্বার্থেই তথ্যকে অতিরঞ্জিত করার প্রবণতা এ দেশে নতুন নয়। তাকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচন-পূর্বে বিজেপি-বিরোধিতার সুবর্ণসুযোগটি তৃণমূল কংগ্রেস একেবারেই হাতছাড়া করছে না। কিন্তু এও সত্যি, রাষ্ট্রিক অবহেলা এবং অপদার্থতায় যদি এক জন নাগরিকেরও প্রাণ যায়, তবে তা অক্ষমণীয় অপরাধ। ইতিপূর্বে তেমন ‘দুর্ঘটনা’ এই বঙ্গেই পরিলক্ষিত হয়েছে, তজ্জনিত বিপুল নাগরিক রোষেরও সাক্ষী এই রাজ্য। সুতরাং এসআইআর-জনিত মৃত্যুসংবাদের সামান্য অংশও যদি সত্য হয়, তা অত্যন্ত ক্লেশকর। এর দায় কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশন এড়িয়ে যেতে পারে না।
প্রথমাবধি এসআইআর প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি অ-মানবিক, জনস্বার্থবিরোধী চরিত্র আছে। ভারতের মতো দেশে যেখানে বিপুল সংখ্যক দরিদ্র জনগণের কাছে শিক্ষালোক পৌঁছয়নি, তার প্রত্যন্ত অঞ্চলে, নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা মানুষদের হাতে নথিপত্রের অভাবকে অ-স্বাভাবিক বলা চলে না। এবং সেই দায়ও কিন্তু রাষ্ট্রেরই। অভিভাবকসম কল্যাণকামী হয়ে এই মানুষদের পাশে এসে দাঁড়ানো, তাঁদের সমস্যার প্রকৃত স্বরূপটি নির্ণয় করে বিকল্প পথের সঠিক দিশা দেখানোর পরিবর্তে ভারতীয় রাষ্ট্র কী করল? এক নিয়মনির্দিষ্ট সরকারি কাজকে রাষ্ট্র বনাম নাগরিকের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করল, যে যুদ্ধে টিকে থাকার দায়টি সম্পূর্ণ চাপিয়ে দেওয়া হল নাগরিকের উপরেই। ক্ষণে ক্ষণে বদলানো হল রণনীতি। এমনই অস্পষ্ট সে সব নীতি, ক্ষেত্রবিশেষে পরস্পরবিরোধী যে— রাষ্ট্র এবং নাগরিকের মাঝের অংশে থাকা সরকারি কর্মীরাও হামেশাই খেই হারিয়েছেন, কাজের চাপে গ্রস্ত হয়েছেন। বিএলও-দের একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা তারই জ্বলন্ত প্রমাণ। সমস্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র পেশ করেও তালিকার বাইরে থেকে যাওয়া নামের সংখ্যাটিও বিরাট। সেই সুবিশাল ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’রই বা কী ব্যাখ্যা দেবে নির্বাচন কমিশন? গণতন্ত্রে নাগরিক জীবনের সুরক্ষা রাষ্ট্রের সংবিধানস্বীকৃত প্রতিশ্রুতি। অথচ, গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার অজুহাতে ভারত রাষ্ট্র সে দায়িত্ব সম্পূর্ণ বিস্মৃত হল। মর্মান্তিক।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে