রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর নতুন বিজেপি সরকার পূর্বতন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নাকচ করে দিয়েছে। ইমাম-মুয়াজ্জিন-পুরোহিত ভাতা বন্ধ করার সিদ্ধান্তটি তার মধ্যে অন্যতম, এবং অত্যন্ত স্বাগত একটি পদক্ষেপ। পূর্বতন সরকারের ভাতার ভান্ডারের বিবিধ রতনের মধ্যেও এটি ছিল সর্বার্থে ব্যতিক্রমী। কোনও সামাজিক ন্যায়ের যুক্তিতে এই ভাতাকে সমর্থন করা যায়নি; উন্নয়ন অর্থনীতির কোনও গবেষণা এর তিলমাত্র সুপ্রভাবের কথা বলতে পারেনি; এমনকি জনবাদী রাজনীতির দায়রাতেও এই ভাতার পক্ষে যুক্তি খাড়া করা ছিল অতি দুরূহ কাজ। এমন ভাতা চালু করার সিদ্ধান্তটির পিছনে কোন রাজনৈতিক কারণ ছিল, তা নিয়ে এখন আর জল্পনার প্রয়োজন নেই। কিন্তু, জুন মাস থেকে এই ভাতাবাবদ টাকা বন্ধ করার সিদ্ধান্তটি সর্বার্থে স্বাগত। ইমাম-মুয়াজ্জিন অথবা পুরোহিতরা ভাতা পেলেও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর তাতে তিলমাত্র লাভ হয়নি; অতএব, ভাতা বন্ধ হলেও ক্ষতি হবে না। বরং, বছরে সরকারের রাজকোষে তিনশো কোটি টাকার বেশি বাঁচবে। ক্লাবে ক্লাবে টাকা বিলি করার রীতিটিও এ বার বর্জন করা হবে বলেই আশা করা যায়। তাতে আরও কিছু টাকা বাঁচবে। কেউ বলতে পারেন, সরকারের মোট আর্থিক আয়তনের নিরিখে অঙ্কটি যৎসামান্য। সে কথা স্বীকার করেও বলতে হয়, রাজকোষের প্রতিটি টাকা যাতে জনগণের সর্বোচ্চ উন্নয়নের কাজে ব্যবহৃত হয়, তা নিশ্চিত করা সরকারের কর্তব্য। সে ব্যয়গুলি উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রকৃতই গুরুত্বপূর্ণ, এই তিনশো কোটি টাকায় যেন তেমন খাতেই ব্যয় করা হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গসাম্য, পরিকাঠামো— ক্ষেত্রের কোনও অভাব নেই; বেছে নিলেই হয়।
পূর্বতন সরকারের আমলের বৃহত্তম সমস্যাটি বর্তমান সরকারের আমলেও অপরিবর্তিত রয়েছে— রাজ্যে কল্যাণ খাতে ব্যয়ের বিপুলতা। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে বর্তমান সরকার অন্তত আপাতত আগের জমানার সব বড় কল্যাণ প্রকল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে। বস্তুত, অন্নপূর্ণার ভান্ডারের মতো প্রকল্পে মাথাপিছু বরাদ্দের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। যদিও এই নগদ হস্তান্তর প্রকল্পকে সর্বজনীন না করে ‘টার্গেটেড’ করার সিদ্ধান্তে প্রাপকের সংখ্যা কমবে, কিন্তু প্রাপকসংখ্যা যদি আগের সংখ্যার অর্ধেকের বেশি হয়, তা হলেই খরচ বাড়বে। আধুনিক অর্থনীতির গবেষণা এবং ভারতীয় রাজনীতির বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, প্রত্যক্ষ নগদ বা সুবিধা হস্তান্তর এখন আর ঐচ্ছিক নয়, যে কোনও সরকারেরই অবশ্যকর্তব্যে পরিণত হয়েছে। ফলে, রাজ্য সরকারকে এই টাকার সংস্থান করতে হবে— নচেৎ, রাজ্যের ঋণগ্রস্ততার ছবিটি পাল্টাবে না। সরকারের কর্তব্য দ্বিবিধ। এক, কল্যাণ ব্যয়কে যুক্তিসঙ্গত এবং কুশলী করে তুলতে হবে— উন্নয়ন অভিঘাতের নিরিখেই স্থির করতে হবে প্রকল্প; এবং দুই, আরও অর্থের সংস্থান করতে হবে। আয় বাড়ানো এবং ব্যয়কে যুক্তিসঙ্গত করা, এই জোড়া অস্ত্রই ঋণগ্রস্ততার সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করতে পারে।
রাজ্যের আয় বাড়ানোর প্রকৃষ্ট পথ শিল্পায়ন। বর্তমান সরকার কার্যভার নেওয়ার পর থেকেই শিল্পবিষয়ক ইতিবাচক বার্তা পাওয়া গিয়েছে— তবে কিনা, শুধু শুকনো কথায় বিনিয়োগের চিঁড়ে ভিজবে না। তার জন্য প্রকৃত পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্য দিকে, পূর্বতন সরকারের আমলে বিভিন্ন কারণে পশ্চিমবঙ্গ কেন্দ্রীয় বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অর্থব্যবস্থায় সে টাকা নিয়ে আসতে হবে। রাজ্যের আর্থিক ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে দিল্লির তৎপরতা চোখে পড়ছে। রাজ্য সরকারের কর্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের বকেয়া পাওনা আদায় করা, এবং নতুনতর আর্থিক বরাদ্দের ব্যবস্থা করা। ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’-এর যে প্রতিশ্রুতি ভোটের আগে নাগরিককে দেওয়া হয়েছিল, তার সত্য রক্ষার দায়িত্বটি বর্তমান শাসকদের নিতেই হবে। অহেতুক ব্যয় বন্ধ করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েও তাই বলা প্রয়োজন, আসল কাজ এখনও বাকি।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে