বিধানসভা ভোটের প্রথম-পর্ব মোটের উপরে শান্তিতে সম্পন্ন হল, কিছু বিক্ষিপ্ত অশান্তি ও সংঘর্ষ বাদ দিয়ে। নির্বাচন কমিশন এর জন্য প্রশংসা দাবি করতে পারে। শান্তিপূর্ণ ভাবে ভোটপর্ব সম্পন্ন হোক, পশ্চিমবঙ্গের সব মানুষই চান। তার জন্য প্রশাসনকে প্রয়োজনে কঠোর হোক, এও তাঁদের চাওয়া। তবে এখানে একটি প্রশ্ন আছে। শান্তিতে ভোট করানোর নামে আইনকানুনের ঠিকঠাক প্রয়োগ ও কার্যকর পদক্ষেপ করাই যথেষ্ট— বাড়াবাড়ি করার দরকার আছে কি? নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গে যা করছে, সেটা কেবল বাড়াবাড়ি নয়, কার্যত যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। কলকাতা হাই কোর্ট সঙ্গত ভাবেই নির্বাচন কমিশনকে এ নিয়ে কড়া ভর্ৎসনা করেছে, মোটরবাইক সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার সূত্রে। বিশেষত কোভিড-পরবর্তী সময়ে এই দ্বিচক্রযান পশ্চিমবঙ্গের অনতিসচ্ছল কর্মী-সমাজের প্রায় অপরিহার্য পরিবহণ হয়ে উঠেছে। মোটরবাইকে চেপে পণ্য ডেলিভারি হচ্ছে, বিভিন্ন পরিষেবা দিতে গ্রাহকের বাড়িতে পৌঁছনোর জন্যও কর্মীদের ভরসা মোটরবাইক। কমিশন ভোট করাবে বলে কি তাঁরা সবাই কাজ বন্ধ করে বাড়িতে বসে থাকবেন? উত্তরে কমিশন বলবে, কেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাড় তো রয়েছে— তার বাইরেও, থানা থেকে ছাড়পত্র নিলেও চলবে। পায়ে জুতো না গলিয়ে কমিশন কেন চর্ম দিয়ে পৃথ্বী মুড়িয়ে দিতে উদ্গ্রীব, সে উত্তর অবশ্য মিলবে না। বাইকে মূল আপত্তি হওয়ার কথা রাজনৈতিক বাইকবাহিনীর দাপটের কারণে। তার উপরে তো প্রতি বারই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়— এ বার নাহয় কঠোরতর নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা করা যেত। তার বদলে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করা কেন? বাইক-নির্দেশ জারি করেই অবশ্য কমিশন ক্ষান্ত দেয়নি— জানিয়েছে, যে সব বহুতল আবাসনে ভোটের বুথ থাকবে, সেখানে কোনও ফ্ল্যাটে কারও আত্মীয়পরিজন-বন্ধু থাকতে পারবেন না। নির্বাচনী শান্তি রক্ষার জন্য নাগরিকের ব্যক্তিগত পরিসরে এমন প্রবল হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হচ্ছে কেন?
দু’টি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথম ব্যাখ্যাটি বিরোধী রাজনৈতিক মহলে বহু-আলোচিত— এই যে, নির্বাচন কমিশন এ বার যেন আর নিরপেক্ষ পরিচালক সংস্থা নয়, এই নির্বাচনে প্রত্যক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে, তাদের সিদ্ধান্তেও গণতান্ত্রিক সুবিবেচনার পরিচয় মিলছে না। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হল, নির্বাচন কমিশন এ বার পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যটিকেই শত্রু ঠাওরেছে। কমিশনের চোখে এ রাজ্যে প্রত্যেকেই সম্ভাব্য দুষ্কৃতী। সে কারণেই প্রথম দফা নির্বাচন পরিচালনার নামে রাজ্যে দু’লক্ষ চল্লিশ হাজারেরও বেশি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে— অগ্নিগর্ভ মণিপুরের তুলনায় প্রায় ন’গুণ। ব্যক্তিপরিসরেও রাষ্ট্র ঢুকে পড়ছে নির্দ্বিধায়। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তার সঙ্গে কার্যত একটি রাজ্যেরই তুলনা চলতে পারে— তার নাম কাশ্মীর। পথেঘাটে যে কোনও মুহূর্তে দেহতল্লাশিটুকুই যা বাকি আছে।
পশ্চিমবঙ্গে যা ঘটছে, তার প্রতিবাদ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শোনা যাচ্ছে বটে— কিন্তু সেই প্রতিবাদের স্বর এখনও ক্ষীণ। তার একটি সম্ভাব্য কারণ, কেন্দ্রীয় সরকার গত এক যুগে যে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে, সেখানে প্রতিবাদের প্রতিটি শব্দ বুঝে উচ্চারণ করাই দস্তুর। কিন্তু, সম্ভবত বৃহত্তর কারণটি হল, কিছু দিন ধরে অত্যন্ত সুচারু ভাবে দেশের সামনে পশ্চিমবঙ্গকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলাহীন, অপরাধীদের মুক্তাঞ্চল হিসাবে; অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ডেরা হিসাবে। খোদ কেন্দ্রীয় সরকারের পরিসংখ্যানই এই কথাগুলিকে সমর্থন করে না, কিন্তু তাতে পিছু না হটে, বাঙালি পরিচিতিকে ক্রমাগত আক্রমণ করে যাওয়া হয়েছে। দক্ষিণপন্থী বাস্তুতন্ত্র বাঙালিকে গোটা দেশের ‘অপর’ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। আর, রাষ্ট্র যখন শত্রুসংহারে নামে, তখন তাকে সমর্থন করাই তো দেশপ্রেম! ফলে, এই নির্বাচনটি হয়ে উঠেছে যুদ্ধ। এবং কে না জানে, যুদ্ধে সবই ন্যায্য।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে