RELOS

নমনীয়তা জরুরি

রেলোস চুক্তিটি ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করবে।

শেষ আপডেট: ০২ মে ২০২৬ ০৭:২০
Share:

গত জানুয়ারিতে ভারত ও রাশিয়া-র মধ্যে ‘রেসিপ্রোকাল এক্সচেঞ্জ অব লজিস্টিক্স সাপোর্ট’ (রেলোস) চুক্তির কার্যকর হওয়া একটি উল্লেখযোগ্য বিবর্তনের সূচনা করল বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে। চুক্তিটি দুই দেশের ক্ষেত্রেই যৌথ সামরিক মহড়া, প্রশিক্ষণ এবং অনুরূপ কার্যক্রমের সময় জ্বালানি ভরা, মেরামত ইত্যাদির জন্য সামরিক ঘাঁটি, বন্দর ও বিমানক্ষেত্রে পারস্পরিক প্রবেশাধিকার সহজতর করল। রেলোস-এর অন্তর্গত ভারত ও রাশিয়া একে অপরের দেশে সর্বোচ্চ ৩,০০০ সৈন্য, পাঁচটি যুদ্ধজাহাজ এবং ১০টি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করতে পারবে। আমেরিকা, ফ্রান্স এবং অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ভারতের অনুরূপ ব্যবস্থা থাকলেও, রাশিয়ার সঙ্গে ‘রেলোস’ চুক্তিটির একটি গভীরতর কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। বিষয়টি কেবল পরিচালনগত সুবিধায় সীমাবদ্ধ নয়— এর সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, সম্পদের অধিকার এবং বিশ্বব্যাপী শক্তি বণ্টনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সম্পর্ক রয়েছে, বিশেষত উত্তর মেরু ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে।

লক্ষণীয়, সাম্প্রতিক কালে উত্তর মেরু অঞ্চলটি ক্রমশ বিশ্ব প্রতিযোগিতার পরবর্তী সীমান্ত হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ায় তেল, গ্যাস এবং দুর্লভ খনিজ পদার্থের ভান্ডারগুলো সহজলভ্য হয়ে উঠছে। এ দিকে, এ-যাবৎ এখানে ভারতের উপস্থিতি মূলত বৈজ্ঞানিক অভিযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সেই পরিস্থিতি বদলাতে চলেছে রেলোস। রাশিয়ার ক্ষেত্রে এই অঞ্চলে ভারতের অংশগ্রহণ উত্তর মেরুর সম্পদ আহরণে বিনিয়োগের সম্ভাবনার পাশাপাশি তার আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় রাজনৈতিক বৈধতাও দিতে পারে। অন্য দিকে, ঐতিহ্যগত ভাবে একটি মহাদেশীয় ও ইউরেশীয় শক্তি হওয়া সত্ত্বেও, এ পর্যন্ত ভারত মহাসাগরে রাশিয়ার প্রভাব সীমিত ছিল। রেলোস-এর মাধ্যমে ভারতীয় বন্দর ও বিমানক্ষেত্রগুলিতে প্রবেশাধিকার লাভ করলে এই অঞ্চলে রাশিয়ার বৃহত্তর নৌ উপস্থিতি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা কাঠামোয় বর্ধিত অংশগ্রহণের পথ সুগম হবে। ভুললে চলবে না, আমেরিকার চাপের কারণে সাম্প্রতিক কালে ভারত তার বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী রাষ্ট্রটির উপর নির্ভরতা কমিয়ে সামরিক চাহিদায় বৈচিত্র আনতে আমেরিকা ও ইউরোপ থেকে অস্ত্র কিনেছে। এই প্রেক্ষাপটে, রেলোস চুক্তিটি ভারত-রাশিয়া কৌশলগত অংশীদারির একটি পুনর্নিশ্চয়তা। সেই সঙ্গে এই চুক্তি এটিও প্রমাণ করে যে মস্কো ও নয়াদিল্লি উভয়ই এটিকে তাদের নিরাপত্তা নীতির একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে দেখছে।

ফলে অনেকের মতে, রেলোস চুক্তিটি ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করবে। চুক্তিটি দ্বিপাক্ষিক মহড়াগুলোতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে, বিগত বছরগুলিতে অতিমারি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে যে কাজ ব্যাহত হয়েছিল। তবে, রেলোস-এর কৌশলগত গুরুত্বকে বাড়িয়ে দেখাও উচিত হবে না। এর কার্যকারিতা আসলে নির্ভর করবে ভারত ও রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সামঞ্জস্যের উপর। তবে, জোট ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা দ্বারা সংজ্ঞায়িত এই বিশ্বে রেলোস যেন বাস্তব পরিস্থিতির কূটনৈতিক প্রতিফলন। অংশীদারি আজ আর একচেটিয়া নয়। কৌশলগত আনুগত্যের মতোই এখন কৌশলগত নমনীয়তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন