Himanta Biswa Sarma

মাইলফলক

ভোটার তালিকার সংশোধন একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, তা কোনও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়— অন্তত কোনও সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার হওয়ার কথা তো নয়ই।

শেষ আপডেট: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০০
Share:

আজকের ভারতের ‘নেতা’ হিসাবে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মাকে ‘সার্থক’ বলতে হবে, তিনি অবধারিত ও অবিচলিত পদক্ষেপে দেশকে নিয়ে চলেছেন সেই গন্তব্যে, যেখানে দেশের অসহিষ্ণু সংখ্যাগুরুবাদী শাসক পৌঁছতে চান। বাংলাভাষী মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিমন্ত যে বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যগুলি করেছেন, তার পুনরাবৃত্তি করতেও দ্বিধা হবে যে কোনও সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন দেশবাসীর। বাংলাভাষী মুসলিমদের বোঝাতে ‘মিঁয়া’ শব্দটির ব্যবহার অসম্মানজনক বলে মনে করা হয়। সেই শব্দটিই ব্যবহার করে প্রকাশ্য সভায় হিমন্ত বলেছেন, তিনি বিজেপি কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাভাষী মুসলিমদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে যেতে, যাঁতে তাঁরা সমস্যায় পড়েন। অন্যান্য ভাবে এঁদের হয়রান করার পরামর্শও দিয়েছেন হিমন্ত। যেমন, বাংলাভাষী মুসলিম রিকশাওয়ালাদের ন্যায্য ভাড়ার চাইতে কম টাকা দিতে। এর আগেও বাংলাভাষী মুসলিমদের জমি বিক্রি করতে কিংবা বাড়ি ভাড়া দিতে নিষেধ করেছিলেন। শিল্পপতি, ব্যবসায়ীদের বলেছিলেন, তাঁরা যেন এই মানুষদের কাজ না দেন। গাড়ির চালক হিসেবে কিংবা দোকানের কর্মী হিসেবে কেবল যেন ‘অসমিয়া’ তরুণরাই কাজ পান। এর প্রতিটিই বিদ্বেষ ভাষ্য বা ‘হেট স্পিচ’-এর দৃষ্টান্ত। ভারতের কোনও মুখ্যমন্ত্রী নিজের রাজ্যের বাসিন্দাদের একটি গোষ্ঠী সম্পর্কে এমন ভাবে কথা বলতে পারেন, বিদ্বেষে উস্কানি দিতে পারেন, কিছু কাল আগেও অভাবনীয় ছিল।

ভোটার তালিকার সংশোধন একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, তা কোনও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়— অন্তত কোনও সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার হওয়ার কথা তো নয়ই। অথচ, এক জন মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে ফর্ম ৭ ব্যবহার করে এক বিশেষ সম্প্রদায়ের ভোটারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা দিতে বলছেন, যদিও এ ভাবে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। দলীয় কর্মীদের তিনি বেআইনি কাজে প্ররোচিত করছেন। এর পরও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, বিজেপি সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন নীরব। নির্বাচন কমিশন তো নীরব বটেই। অসম পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে মামলা করতে পারত, কারণ মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্টতই ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৯৬ ধারা ভঙ্গ করেছেন (বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ উস্কানির অপরাধ)। এই সার্বিক নীরবতা পরোক্ষে হিমন্তের বক্তব্যের প্রতি সম্মতিরই লক্ষণ, এই আশঙ্কা সঙ্গত। হিমন্ত-সহ বিজেপি নেতারা বার বার সরাসরি অথবা ইঙ্গিতে একটি বিশেষ ধর্মের মানুষকেই ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে চিহ্নিত করছেন, তাঁদের উপস্থিতিকে দেশের জন্য ‘বিপজ্জনক’ বলে দাবি করছেন। এই ভিত্তিহীন, যুক্তিহীন দাবির প্রধান উদ্দেশ্য যে ভোটদাতাদের মেরুকরণের মাধ্যমে নির্বাচনী লাভ, সে বিষয়ে সংশয়ের বিশেষ অবকাশ নেই। পশ্চিমবঙ্গে শাসক দল তাঁদের লক্ষ্যসাধনে এসআইআর-এ বাধা দিচ্ছে, এমন অভিযোগ যখন সর্বত্র, অসম নিয়ে একই সময়ে এই হিমালয়সম নীরবতা অসহনীয়।

হিমন্ত যে ভাবে তাঁর সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব নস্যাৎ করে দলীয় রাজনীতির নির্বাচনী কৌশলকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, অনুগামীদের বেআইনি কাজ করতে বলছেন, এসআইআর প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার এবং বৈধ ভোটারকে সঙ্কটে ফেলার চেষ্টা করছেন, তা এক কথায় অগণতান্ত্রিক, অসাংবিধানিক। স্বাভাবিক ভাবেই বিরোধীরা হিমন্তবিশ্ব শর্মার পদত্যাগ দাবি করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ওস্কানো, জাতীয় ঐক্যে আঘাত, প্রভৃতি অভিযোগ দায়েরও করা হয়েছে পুলিশের কাছে। এই ধরনের নাগরিক প্রতিবাদের ফল কী হবে, সে অন্য প্রশ্ন। কিন্তু গণতন্ত্রে এক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির দায়বদ্ধতাকে লঘু করে দেখার অবকাশ নেই। সাম্যের অধিকার (ধারা ১৪), নিজ ধর্মবিশ্বাস পালনের স্বাধীনতা (ধারা ২৫), এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার (ধারা ২১): মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে সংবিধানের অন্তত তিনটি ধারা সরাসরি লঙ্ঘন করে হিমন্ত গণতন্ত্রের ইতিহাসে খোদিত হয়ে রইলেন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন