SIR

লাভের পাল্লা

সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর-শুনানিতে আইনজীবীর কালো চাদরে সজ্জিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভূত হওয়ার দৃশ্যটি নানা কারণেই ঐতিহাসিক।

শেষ আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৩
Share:

রাজনীতি সম্ভাবনার শিল্প হলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক জন উচ্চ মানের শিল্পী। তিনি এই দেশের তাবৎ নেতা-নেত্রীকে রাজনীতির পাঠ দিতে পারেন— অবশ্যই, প্রশাসকের রাজনীতি নয়, বিরোধীর রাজনীতির পাঠ। আরও এক বার মমতা প্রমাণ করে দিলেন, বহু চাপের মধ্যে থেকেও তিনি যা করতে চাইছেন তা অনায়াসে করে শাসক পক্ষকে কেমন অস্বস্তিতে ফেলা যায়। সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর-শুনানিতে আইনজীবীর কালো চাদরে সজ্জিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভূত হওয়ার দৃশ্যটি নানা কারণেই ঐতিহাসিক। প্রথমত, ভারতে এর আগে কোনও মুখ্যমন্ত্রী সর্বোচ্চ আদালতের প্রাঙ্গণে স্বয়ং মামলা লড়তে আসেননি। দ্বিতীয়ত, জনসাধারণের দাবির প্রতিনিধিত্বের অধিকারে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে কোনও রাজ্যের নেতা/নেত্রী এই প্রথম বার দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ে ন্যায়প্রার্থী হয়ে এলেন— যুক্তরাষ্ট্রীয় দেশের রাজনীতিতে এ এক বড় খবর। তৃতীয়ত, দেখা যাচ্ছে, বিরোধী নেত্রী হিসাবে মমতা যে দক্ষ, এমন কথা প্রকাশ্যেই বলছেন তাঁর বিরোধীরা, এমনকি কেন্দ্রীয় শাসক দল বিজেপির এক বড় অংশ। এমন ঘটনা ভারতীয় রাজনীতিতে সুলভ নয়।

কী করতে চাইছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী? আইনি বক্তব্য পেশ করলেও আইনি লড়াই তাঁর প্রকৃত লক্ষ্য ছিল না। লক্ষ্য ছিল নিজের অভিপ্রেত রাজনৈতিক বার্তাটি প্রেরণ। নির্বাচন সমাগত, এমন সময়ে নির্বাচন কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়ার অধিকার-বিরোধী অমানবিক চরিত্রটি তিনি সোজাসুজি উচ্চতম বিচারালয়ের সামনে নিজে বহন করে নিয়ে গিয়েছেন, এই দৃশ্য বা ‘অপটিকস’ তৈরি করাই ছিল লক্ষ্য। ‘অপটিকস’ তৈরিকে সু-রাজনীতি বলা চলে না, এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই প্রবণতা বারংবার দেখা গিয়েছে। তবে কিনা, একুশ শতকের প্রযুুক্তিপ্রবাহের অভিঘাতময় রাজনীতির প্রেক্ষিতে ‘অপটিকস’ বা দৃশ্যনির্মাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রকরণ হিসাবে ইতিমধ্যেই স্বীকৃত, তাই তাঁর নিন্দকদেরও পুনর্বিবেচনা করা দরকার, ঠিক কোন যুক্তিতে মমতা-নিন্দাভাষ্যটিকে তাঁরা সাজাবেন। ‘অপটিকস’ দিয়ে সাধিত লক্ষ্যটি জরুরি হলে, এবং তাতে মানবিক বা নাগরিক অধিকারের সুরাহার সম্ভাবনা হলেও কি এর বিরুদ্ধে সুতীক্ষ্ণ সমালোচনা সাজে?

দৃশ্যগত পেরিয়ে বস্তুগত স্তরে পৌঁছলে স্পষ্ট, শেষাবধি কেন সমগ্র অধ্যায়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রইল। এসআইআর প্রক্রিয়া এক অমানবিক রূঢ়তা ও অসংবেদনশীলতার সঙ্গে সংঘটিত হচ্ছে, নিয়মিত নিত্যনতুন নীতির সঙ্গে সাধারণ মানুষ কেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএলও-রাই তাল রাখতে অপারগ হচ্ছেন। বিএলও-দের উপর অমানুষিক চাপের ফলে একের পর এক আত্মঘাতের ঘটনা ঘটছে। প্রশাসনিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করে এত জরুরি একটি বিষয়ের নির্দেশ লিখিত ভাবে না এসে ওয়টস্যাপে আসার ফলে পরবর্তী কালে অস্বীকার করা অথবা অবজ্ঞা করার পথ খোলা থাকছে, অস্বচ্ছতার পথ থাকছে অবাধ। নাম-পদবির বানানে বেনিয়মের শাস্তি দাঁড়াচ্ছে ভোটার তালিকা থেকে নামকর্তন। সব মিলিয়ে স্বল্পশিক্ষিত কিংবা নথিপত্রবিরহিত মানুষের নাম অকাতরে উঠে যাচ্ছে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ নামক একটি প্রশ্নযোগ্য তালিকায়— যাঁদের মধ্যে প্রান্তিক, সংখ্যালঘু, নারী, অসুস্থদের উপস্থিতি অত্যন্ত বেশি। মাইক্রো-অবজ়ার্ভাররা বাংলা না জানায় ভ্রান্তি-বিভ্রান্তি ও অস্বচ্ছতার পরিবেশ তুঙ্গে। অথচ নিবিড় সংশোধনের অর্থ তো বিনা বিচারে নাম বাতিল ও ভোটাধিকার হরণ হতে পারে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই প্রশ্নটিও সঙ্গত যে, ভোটের আগে তাড়াহুড়ো করে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর হল, অথচ অসমে হল না— সে কি রাজ্যের শাসকচরিত্রের কারণেই? বিচারবিভাগের সিদ্ধান্ত যা-ই হোক, নজরকাড়া রাজনীতির দৌলতে প্রশ্নগুলি আরও এক বার জাতীয় রাজনীতির উচ্চতম মঞ্চে উচ্চ গুরুত্বে আনীত হল। এটাও বড় লাভ।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন