মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের (ডান দিকে) সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ছবি: পিটিআই।
দেড় বছর আগে মালয়েশিয়ার সঙ্গে যে কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ (সিএসপি) বা ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিতে উন্নীত হয় ভারতের সম্পর্ক, তা বজায় রাখতেই সম্প্রতি ঝটিকা কুয়ালালামপুর সফর করে এলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সফরকালে সেমিকন্ডাক্টর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি এবং ডিজিটাল পেমেন্ট-সহ বিবিধ ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করতে ১১টি ‘মউ’ স্বাক্ষরিত হল। তবে সফরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল উভয় দেশ জুড়ে পরিচালিত ব্যবসার ক্ষেত্রে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের প্রয়াস। জানা গিয়েছে, এই উদ্যোগে একে অপরকে সহযোগিতা করবে ভারতীয় রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক এবং ব্যাঙ্ক নেগারা মালয়েশিয়া, যাতে ভারতীয় টাকা বা রুপি এবং মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত-এর মাধ্যমে বাণিজ্যের আর্থিক লেনদেন আরও সহজ হয়। দ্বিপাক্ষিক সংযোগ স্থাপনের জন্য উভয় দেশ এনপিসিআই ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (এনআইপিএল) এবং পেনেট মালয়েশিয়ার মধ্যে সহযোগিতার কথা ঘোষণা করেছে। আসলে, এটি একটি বৃহত্তর বিশ্বব্যাপী প্রবণতারই ইঙ্গিতবাহী, যেখানে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে আমেরিকান ডলারের মতো একক রিজ়ার্ভ মুদ্রা থেকে সরে আসতে (ডি-ডলারাইজ়েশন) চাইছে ভারত, মালয়েশিয়ার মতো বহু রাষ্ট্রই।
ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার অর্থ জোগানের পথ বন্ধ করতে ২০২২ সালে পশ্চিমি দেশগুলি, বিশেষত আমেরিকার দ্বারা রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের রিজ়ার্ভের প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার আটক করার ঘটনা বিশ্ব জুড়েই এই ‘ডি-ডলারাইজ়েশন’-এর প্রচেষ্টাকে উল্লেখযোগ্য ভাবে ত্বরান্বিত করেছে। এর ফলে ভারতের মতো ব্রিকস সদস্য দেশগুলি পশ্চিম-অধ্যুষিত আর্থিক ব্যবস্থার উপর তাদের নির্ভরতা কমাতে চাইছে, যা তাদের বিশ্বাস, আমেরিকার অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা এবং নীতির উপর অতি নির্ভরশীল হতে বাধ্য করছে। ভুললে চলবে না, বিনিময় হারের অস্থিরতা ভারতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ যে-হেতু ডলারের মূল্যের ওঠানামার প্রভাব পড়ে মূল্যবৃদ্ধির হার এবং ঋণ পরিশোধের খরচের উপরে। শুধু তা-ই নয়, রাশিয়ার ঘটনার পরে ‘ডলার’কে নিরাপদ বিদেশি মুদ্রা সম্পদের বদলে এখন বলপ্রয়োগের সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবেই দেখছেন অনেকে। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার কোপ এড়াতে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের পথ নিচ্ছে ভারত-সহ আরও অনেক রাষ্ট্রই। তা ছাড়া, বাণিজ্যিক লেনদেন সরাসরি রুপি এবং রিঙ্গিতে নিষ্পত্তি হলে স্থানীয় মুদ্রাগুলিকে আর ডলারে রূপান্তর করার প্রয়োজন পড়বে না। ফলে, আমদানি ও রফতানি— দু’তরফেই বাঁচবে মুদ্রা রূপান্তরের বাড়তি খরচ।
লক্ষণীয়, এই দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা ভারতীয় টাকাকে বিশ্বব্যাপী গৃহীত বাণিজ্য মুদ্রায় পরিণত করার দিকে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যা বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় ভারতের ভূমিকাকে আরও শক্তিশালী করবে। তা ছাড়া এই উদ্যোগ সেমিকন্ডাক্টর, জ্বালানি এবং ডিজিটাল সংযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে উৎসাহিত করবে বলেই আশা। ডলার আপাতত বিশ্বব্যাপী প্রভাবশালী মুদ্রা হিসেবে রয়ে গেলেও, বিশ্ব জুড়ে বিকল্প মুদ্রা এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। ভারত-মালয়েশিয়ার চুক্তি এই প্রবণতারই ফল।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে