নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রিসভার দ্বিতীয় দফার রদবদল নিয়ে কিছুটা অপ্রত্যাশিত ভাবেই বেশ আলোড়ন হয়ে গেল। এই রদবদলের চরিত্র এবং পদ্ধতিতে প্রধানমন্ত্রীর চিন্তা ও কর্মধারার একটা ছাপ পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সেটা স্বাভাবিক। এক এক জন রাষ্ট্রপ্রধানের এক এক ধরনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, তাঁদের কাজের শৈলীও সেই অনুসারে আলাদা।
এ ব্যাপারে মোদীর সঙ্গে যাঁর তুলনা খুব স্বাভাবিক ভাবে আসে, তিিন ইন্দিরা গাঁধী। ইন্দিরা গাঁধীর পরে প্রবল এবং দাপুটে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদী ছাড়া আর কারও নাম ভাবা কঠিন। আর তাই প্রশ্ন ওঠে, মন্ত্রিসভার রদবদলের ব্যাপারে ইন্দিরা গাঁধীর শৈলীর সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর মিল কতটা, ফারাকই বা কোথায়।
ইন্দিরা গাঁধী মন্ত্রিসভার রদবদল করতেন ঘন ঘন। এবং শুধু কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা নয়, রাজ্য স্তরে মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যপাল, কেন্দ্রের আমলাবর্গ— বিভিন্ন ক্ষেত্রে খুব অপ্রত্যাশিত ভাবে, আগাম কোনও সংকেত ছাড়াই তিনি নাটকীয় পরিবর্তন করতেন। ১৯৮৪ সালে, মৃত্যুর ঠিক দু’মাস আগে, ৩১ অগস্ট ইন্দিরা আচমকা নাটকীয় ভাবে লখনউয়ের তখ্ত থেকে বরখাস্ত করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শ্রীপথ মিশ্রকে। ওই পদে বসিয়েছিলেন নারায়ণ দত্ত তিওয়ারিকে। যে দিন তিনি এই ঘোষণা করেন, সে দিন ওই দু’জনেই ছিলেন ভিয়েনায়। রাষ্ট্রপুঞ্জের সম্মেলনে। তাঁদের কাছে অবিলম্বে নতুন দায়িত্ব গ্রহণের নির্দেশ যায়। ভিয়েনা থেকে তড়িঘড়ি তাঁরা ফেরেন। লখনউয়ের মন্ত্রিসভা গঠন করতে তিওয়ারির সাত দিন সময় লেগেছিল। কারণ তখন তিনি দিল্লির কৃষ্ণ মেনন মার্গের বাংলো থেকে ইন্দিরা গাঁধীর বাসভবনে ঘন ঘন বৈঠক করতে ছুটছেন— কাদের মন্ত্রিসভার সদস্য করবেন আর কাদের করবেন না, তা-ই নিয়ে।
ইন্দিরা গাঁধীর মতো নরেন্দ্র মোদীর প্রশাসনও ভীষণ ভাবে কেন্দ্রীভূত। মোদীই প্রথম এবং শেষ কথা। কিন্তু কেন্দ্রীভূত শাসনের মহানায়ক হয়েও মোদী তাঁর টিমের সদস্যদের ঘন ঘন রদবদলের পক্ষে নন। লক্ষণীয়, গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে টানা পনেরো বছরেও মন্ত্রীদের কোর গ্রুপ-এ তিনি কখনও খুব নাটকীয় রদবদল করেননি। এর পিছনে একটি মানসিকতা কাজ করে। প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ের এক কর্তা বললেন, ‘মোদী বিশ্বাস করেন, যদি কোনও মন্ত্রক তার কাজে ব্যর্থ প্রতিপন্ন হয় তা হলে সেটাও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব, সেই অসাফল্যের প্রতিকার করা তাঁর কাজ।’ ব্যক্তির ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে মন্ত্রিসভায় নাটকীয় পরিবর্তনের পক্ষে নন তিনি।
মন্ত্রিসভার রদবদলে ইন্দিরা গাঁধী রহস্যময়তা বজায় রাখতে ভালবাসতেন। এক বার অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিতেশ্বর সইকিয়াকে দিল্লিতে ডেকে পাঠিয়ে তিনি বৈঠক করেন। গুয়াহাটি ফিরে সইকিয়া জানতে পারেন তিনি আর মুখ্যমন্ত্রী নেই। অনেক সময় অনেক সচিবকে আচমকাই বদল করতেন ইন্দিরা, যা ঘনিষ্ঠ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরাও জানতে পারতেন অনেক পরে। এ বিষয়ে তিনি কারও সঙ্গে বড় একটা পরামর্শও করতেন না। আশির দশকে মুখ্যমন্ত্রী বা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বদলের সময় কিছু ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়কে কেবল জানাতেন।
মোদী সেই রহস্যময়তা চান না। তাঁর গবেষণা টিম-এর মাধ্যমে অগ্রিম জানিয়ে দিয়েছিলেন, রদবদল নয়, মূলত মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ চাইছেন। কেন মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ চাইছেন, বাড়িতে কিছু সাংবাদিককে ডেকে তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
দু’জন দাপুটে প্রধানমন্ত্রীর কাজের ধরনের বৈপরীত্যে পরিস্থিতিরও প্রভাব আছে। বিজ্ঞাপন-বিশারদ পীযূষ পান্ডে বলেন, আগে অহোরাত্র মিডিয়ার সর্বব্যাপী দাপট ছিল না। এখন গোপনীয়তা রক্ষা করাই কঠিন। বরং সরকারিভাবে মন্ত্রীদের নাম আগাম জানিয়ে দিলে দলের অভ্যন্তরীণ গোলযোগ নিয়ন্ত্রিত রাখা যায়। বিক্ষুব্ধদের কাছে ধাক্কাটা আচমকা লাগে না। বিজেপি নেতা মীনাক্ষী লেখি যেমন বললেন, ‘বিজয় গোয়েল মন্ত্রী হচ্ছেন, এটা আগে জেনে যাওয়ায় দিল্লির অন্য সংসদ-সদস্যদের উত্তেজনাটা আগাম প্রশমিত হয়ে গিয়েছে।’
এই মিডিয়া-ইন্টারনেটের যুগে মন্ত্রিসভার রদবদলে ইন্দিরা গাঁধীর আচরণও কি মোদীর মতোই হত?