সিরিয়ার শিল্পী আবদাল্লা আল ওমারি আঁকিলেন ‘দ্য ভালনারেবিলিটি সিরিজ’, চিত্রগুলিতে এই সময়ের বিভিন্ন বিশ্বনেতা বা নেত্রীকে দেখানো হইল অসহায় দুর্বল শরণার্থী হিসাবে। কোথাও ডোনাল্ড ট্রাম্প পিঠে একটি ঘুমাইবার কম্বল বহিয়া, কোলে একটি শিশু লইয়া হাঁটিতেছেন, কোথাও ওবামা একটি ভাঙা থালা হস্তে খাদ্যের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াইয়া আছেন, কোথাও অ্যাঞ্জেলা মের্কেল হতাশ নয়নে বসিয়া— তাঁহার চতুষ্পার্শ্বে মুরগি উড়িয়া বেড়াইতেছে। শিল্পী বছর পাঁচ পূর্বে সিরিয়া ছাড়িয়াছেন, তখন গৃহযুদ্ধ লাগিবার উপক্রম হইয়াছে, তাহার পর শিল্পী বেলজিয়ামে আশ্রয় লইয়াছেন। এই সিরিজটি আঁকিয়া তিনি নিজ ক্রোধ ক্ষোভ ও সহমর্মিতা প্রকাশ করিলেন। যে মুহূর্তে অমন ক্ষমতাসীন মানুষগুলিকে ভঙ্গুর ও ধুঁকিতে থাকা অবস্থায় দর্শক দেখিতে পান, বুঝিতে পারেন, যে কোনও মানুষকে রাজনৈতিক অস্থিরতা মুহূর্তে কী ভাবে পথের ভিখারি করিতে পারে, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা কেমন তাহার মুখে প্রহার আঁকিয়া দিতে পারে।
ক্ষমতাশালী নেতাদের লইয়া বহু প্রকারের ছবিই আঁকা হইয়াছে। তাহার মধ্যে ব্যঙ্গাত্মক ছবির সংখ্যা স্বাভাবিক ভাবেই অধিক। প্রতিকৃতি সেই ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিবাদ ও বিদ্রুপের বাহন। জেফ্রি ভালান্স-এর ‘পপ আর্ট’ সমৃদ্ধ ছবিতে কখনও কিম জং ইল-এর সহাস্য মুখের পার্শ্বে কার্টুন বাঘ ও পুষ্পস্তবকের সহিত ক্ষেপণাস্ত্র আঁকা, কখনও আয়াতোল্লা খোমেইনির পার্শ্বে অঙ্কিত ছয়টি বোমা-আরোহিণী যৌবনবতী নারী, তাহারা যুদ্ধাস্ত্র চড়িয়া উড়িয়া যাইতেছে। ইতালীয় চিত্রকর ক্রিস্টিনা গাগেরি-র সিরিজের নাম ইংরাজি অনুবাদে ‘দ্য ডেলি ডিউটি’, এক একটি প্রতিকৃতিতে বিশ্বের প্রবল প্রতাপান্বিত নেতা বা নেত্রী প্রাতঃকৃত্য-রত। ছবিগুলি অশালীন নহে, অস্বস্তি-অঙ্গ উন্মোচনের গিমিকও নাই, কেবলমাত্র ওই মুহূর্ত-নির্বাচনটিই ইতিহাসের অংশীগণকে নিতান্ত সাধারণ ও নশ্বর হিসাবে প্রতিভাত করিয়াছে। এই তালিকায় ওবামা বা ব্রিটেনের সম্রাজ্ঞী তো আছেনই, স্বয়ং পোপ বা দলাই লামাও বাদ পড়েন নাই। কিছু দিন পূর্বে লিথুয়ানিয়ার শিল্পী মিনডগাস বনানু-র করা ম্যুরালে যখন দেখা যাইল ট্রাম্প ও পুতিন ঘনিষ্ঠ চুম্বনে লিপ্ত, হইহই পড়িয়া গেল। তখনও ট্রাম্প রাষ্ট্রপতি হন নাই, কিন্তু পুতিন সম্পর্কে বলিয়াছেন, আমেরিকায় এমন জবরদস্ত নেতার বড় অভাব, আর পুতিন ট্রাম্প সম্পর্কে বলিয়াছেন উজ্জ্বল, প্রতিভাবান ব্যক্তি। এই উজ্জ্বল ব্যক্তিটিই যে মার্কিন রাষ্ট্রপতি হইবেন ও তাহার নেপথ্যে রুশ হস্তের সম্ভাবনা লইয়া ঝড় বহিয়া যাইবে, তাহা তখনও কালের গর্ভে। কিন্তু একটি রেস্তোরাঁর দেওয়ালে আঁকা এই ম্যুরালটি হয়তো আশ্চর্য ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিল, যেমন কোনও শিল্পী অচেতনেও কখনও করিয়া থাকেন। ছবিটি অবশ্য অনেককেই স্মরণ করাইয়া দিয়াছিল ১৯৯০ সালে বার্লিনের প্রাচীরের অংশে আঁকা রুশ শিল্পী দ্মিত্রি ভ্রুবেল-এর ছবির কথা, যেখানে পূর্ব জার্মানির নেতা হোনেকার ও সোভিয়েত নেতা ব্রেজনেভ চুম্বন করিতেছেন। ২০১৭-র ভ্যালেন্টাইন দিবসে আমেরিকার বিভিন্ন বাড়ির উপর প্রক্ষেপণ করা হইল একটি ছবি: পুতিন আদর করিতেছেন ‘গর্ভিণী’ ট্রাম্পকে। এই ছবিটির কারিগর ‘হেটার’ অ্যাপ সংস্থা, যাহারা, কোন মানুষ কী ঘৃণা করেন তাহার ভিত্তিতে সমমনস্ক ‘জুটি’ নির্বাচন করিয়া তাঁহাদের ‘ডেট’ করিতে প্রণোদিত করে। ছবিটির নাম ছিল ‘লাভ থ্রু হেট’। গুন্দুজ আগায়েভ-এর একটি বিখ্যাত সিরিজে দেখা যায়, চক্ষে কাপড় বাঁধা ও হস্তে তরবারি ও তুলাদণ্ড বহনকারী ন্যায়বিচারের দেবীকে পুতিন গুলি করিয়া মারিতেছেন, অন্য ছবিতে সিরিয়ার রাষ্ট্রপতি আসাদ দেবীর মুণ্ডচ্ছেদ করাইয়া মৃতদেহটিকে বিকৃত অপমান করিতেছেন।
কার্টুনে বা ছবিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নির্মম সমালোচনা দেখিতে বিশ্ব অভ্যস্ত। কিন্তু আবদাল্লার চিত্র-সিরিজে নেতাদের যখন ক্ষুধার্ত উদ্বিগ্ন শরণার্থী হিসাবে আঁকা হইল, তাহা নিন্দাকে অতিক্রম করিয়া গিয়া, অকস্মাৎ নগ্ন করিয়া দিল পরিস্থিতির বশে মানুষের দুর্দশার কথা, এবং বলিয়া উঠিল এই প্রায়-বিস্মৃত অথচ সর্বজ্ঞাত সত্য: মানুষের জীবনের ন্যায়, সমৃদ্ধি বা গৌরবও নশ্বর। যে কোনও মানুষই যে কোনও মুহূর্তে শরণার্থী হইতে পারেন, তাঁহার জীবনের ভিত্তি কাঁপিয়া উঠিতে পারে, তাই সকল শরণার্থীই তোমার ভ্রাতা (বা সম্ভাব্য তুমি)— ইহা বলিয়া, অশ্রুসিঞ্চিত শিল্পটি বাস্তবকে অন্য ভাবে নাড়া দিয়া গেল।
যৎকিঞ্চিৎ
যেই ভারতীয় ক্রিকেট টিম দেঁড়েমুশে হারাল পাকিস্তানকে, অমনি মাথায় তুলে নাচ, এমন দলটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, শ্রীলঙ্কার হার স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। শ্রীলঙ্কা বিশাল রান অনায়াসে তাড়া করে ভারতকে হারাল, এখন বলা হচ্ছে ধুর একে বসাও তাকে বসাও অশ্বিন লাও শামি লাও। একটা করে খেলা হয়, তক্ষুনি ক মতামত ডিগবাজি খ মতামত লাগু। এ ‘চরম’পন্থী দেশে রাজা হওয়া মহা বিপদ, বালিশের তলায় ফকিরের পোশাক রেখেই শোওয়া ভাল।