১৩ তারিখ দুপুরে আমার এক বছরের ছেলেটাকে ঘুম পাড়ানো অসম্ভব হল। ভোর থেকেই আমার শ্রীনগরের বাড়ির সামনে কার্ফু জারি হওয়া রাস্তা থেকে আওয়াজ আসছিল। এক দিকে আজাদির স্লোগান, অন্য দিকে কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটার শব্দ। আমি দেখলাম, সেই মুহূর্ত থেকেই ইতিহাস আমার ছেলেকে দখল করে নিল, সে কাশ্মীরি হয়ে উঠল। তিন দশক আগে এমনই এক দিন আমার বাবা আমায় ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন, আর ক্রমাগত মর্টার শেল বিস্ফোরণের আওয়াজে তাঁর সেই চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছিল। সে দিন আমি কাশ্মীরি হয়েছিলাম।
সে দিন, একটু পরেই, এক জন ফোন করে জানালেন, একটি নিউজ চ্যানেলে দু’দিন ধরে কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে। সেই আলোচনায় আমার ছবি দেখানো হচ্ছে জীবিত ও মৃত কিছু উগ্রপন্থীর ভিডিয়ো ফুটেজের পাশাপাশিই— ‘আদর্শ কাশ্মীরি’ বলতে ঠিক কাকে বোঝায়, সেই বৈপরীত্য দেখানোর জন্য। খবরটা আমায় ভয়ানক বিচলিত করল। নিজেকে ‘কাশ্মীরের সফলতম আদর্শ তরুণ’ বলে ভাবা আমার পক্ষে মুশকিল— মাসে ৫০,০০০ টাকা মাইনে আর মাথায় ৫০ লক্ষ টাকার হাউজিং লোন নিয়ে সফলতম! বিশেষত যে রাজ্যে বিশিষ্টতার একমাত্র মাপকাঠি মৃতদেহ নিয়ে হওয়া শোকমিছিলে আগত লোকের সংখ্যা! মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকার জন্য কে মরতে চায়? তা-ও এমন মৃত্যু, যার শবদেহের পাশে এক জনও এসে দাঁড়াবে না?
অচিরেই শুনলাম, আমার বাড়ির সামনে বড় জমায়েত হয়েছে। চ্যানেলের সাংবাদিক নাকি বলেছেন, মৃত উগ্রপন্থীদের আবর্জনার সঙ্গে জ্বালিয়ে দেওয়া হোক, ভারতের মাটিতে কবর দিতে হবে না। জমায়েত এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছিল। বুঝলাম, স্টুডিয়োর সঙ্গে রাস্তার প্রতিযোগিতা চলছে।
পর দিন ছদ্মবেশে অফিসে গেলাম। ভয় করছিল, রাস্তায় কেউ চিনে ফেললে বিপদে পড়তে পারি। শ্রীনগরে দাঁড়িয়ে ভারত বনাম কাশ্মীরের যুদ্ধে ভুল পক্ষে থাকলে সাবধান হওয়াই ভাল। আমার ফেসবুক ওয়াল যে ভাবে ভরে উঠছিল গালিগালাজে, সেটাও বলল, খুব সাবধান। আমাকে এই বিচিত্র অবস্থায় দাঁড় করিয়ে দিল ভারতীয় মিডিয়া। ২০০৮, ২০১০, ২০১৪— কয়েক বছর ধরেই দেখছি, ‘ন্যাশনাল মিডিয়া’-র একটি অংশ সুকৌশলে কাশ্মীরে ভারত সম্বন্ধে একটা ভ্রান্ত ধারণা প্রচার করে চলেছে। আবার, কাশ্মীর সম্বন্ধে গোটা দেশকে মিথ্যে কথা বলছে। এ বারও সেই একই ধারা।
কাশ্মীর হোক বা অন্য কোনও প্রসঙ্গ, সর্বভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর হাত থেকে ‘জাতীয় স্বার্থ’ রক্ষা করার দায়টি ছিনিয়ে নেওয়াই এখন ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ। রাষ্ট্রকে দেশের মানুষের সঙ্গে, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সংলাপের সম্পর্কে ফেরত যেতে হবে।
নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক কোন পথে চলবে, ভারতে তার একটি নির্দিষ্ট পথ ছিল। সেই পথ সংলাপের, জায়গা করে দেওয়ার— হুমকির নয়। সেই পথ উন্নয়নের, হিংস্রতার নয়। ভারতীয় রাষ্ট্র কাশ্মীরের মানুষের সঙ্গে কথা বলার দায়িত্ব কিছু বোধহীন মানুষের হাতে ছে়ড়ে রাখতে পারে না। তারা জাতীয় স্বার্থের স্বঘোষিত রক্ষক হলেও নয়।
টেলিভিশন চ্যানেলের বক্তব্যকে কাশ্মীরের মানুষ অনেক সময় ভারতীয় রাষ্ট্রের দমনমূলক নীতি ভেবে বসেন। টেলিভিশন-বিতর্কে যখন কাশ্মীরের প্রতিনিধিদের নাজেহাল করা হয়, যখন তাঁদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে হাসির খোরাক বানিয়ে ফেলা হয়, যখন তাঁরা নিজেদের ক্ষোভের কথা বলেন তখন যে ভাবে তাঁদের চিৎকার করে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়, কাশ্মীরের নিজস্ব গর্বের প্রতীকগুলোকে যখন অপমান করা হয়, যখন নিরীহ সাধারণ মানুষের মৃত্যুর চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় কিছু অবান্তর প্রসঙ্গ, যখন মানুষের যন্ত্রণাকে ছাপিয়ে গুরুত্ব পায় সেনাবাহিনীর বীরত্বের কাহিনি, যখন রাজ্য সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপগুলিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়, এবং সবচেয়ে বড় কথা, যখন দেখা যায় যে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের চেয়ে গরু ঢের বেশি মূল্যবান, তখন রাগ স্বাভাবিক। সেই রাগ হয় ভারতের ওপর। এই প্রক্রিয়া ক্রমশই কাশ্মীরকে ভারত থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। পশ্চিমের দিকে।
দিল্লি ও শ্রীনগরের মধ্যে সংলাপের সমস্ত পথ— পুরনো-নতুন, প্রথাগত-উদ্ভাবনী— সব খোলা রাখতে হবে। উগ্র জাতীয়তাবাদী বয়ান ত্যাগ করে কাশ্মীরের মাটির কাছাকাছি আসতে হবে। শ্রীনগরের কোনও এক সদ্য-তরুণকে জিজ্ঞেস করুন, সে আপনাকে বলে দেবে, এত দিন ধরে ভারতীয় রাষ্ট্র কাশ্মীরিদের সঙ্গে কোন পথে সংলাপ চালিয়েছে। সে গড়াপেটা নির্বাচনের কথা বলবে, নির্বাচিত সরকারকে বরখাস্ত করার কথা বলবে, এনকাউন্টারের কথা বলবে, দুর্নীতির কথা বলবে। সে বলবে, কাশ্মীরে ভারত কেমন ভাবে মিলিটারি বাঙ্কার বা পুলিশের সাঁজোয়া গাড়ির সমার্থক হয়ে গিয়েছে। অথবা, ভারত মিশে গিয়েছে টেলিভিশনের প্যানেলে বসে কাশ্মীরের বিরুদ্ধে বিষ উগরে দেওয়া কোনও প্যানেলিস্টের সঙ্গে। ভারত বললে যদি এই ছবিগুলোকেই বোঝায়, তবে কি সেই ভারতের পক্ষে কাশ্মীরের হৃদয় জয় করা সম্ভব?
কাশ্মীরের মানুষ ‘ভারত’ বলতে আজ যে এগুলোই বোঝেন, সেই কথাটা মেনে নেওয়া কাশ্মীর-সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ। তাঁরা অত্যন্ত সংবেদনশীল, কিন্তু ভারত সম্বন্ধে তাঁদের মনে প্রচুর সন্দেহ, প্রচুর দ্বিধা। তাঁদের সঙ্গে অর্থপূর্ণ সংলাপ চাইলে প্রথমে বন্ধুত্বপূর্ণ উষ্ণতা প্রয়োজন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে হবে সমানে-সমানে, ওপর থেকে নয়।
শ্রীনগরে ডায়রেক্টরেট অব স্কুল এডুকেশন, কাশ্মীর-এর নির্দেশক