নাকের ভিতরে একটা লম্বা নরম খড়কে কাঠি ঢোকাতে ঢোকাতে বর্মবস্ত্রে আচ্ছাদিত ডাক্তারবাবু বললেন, ‘একটা নাক থেকে, আর একটা মুখ থেকে নেব, কেমন?’
হ্যাঁ বা না, কিছু বলার অবস্থাতেই নেই তখন। সকালে বাড়িতেই হালকা জ্বর এসেছিল, দুপুরে তার সঙ্গে বমি আর আচ্ছন্নতা। অবস্থা দেখে বাড়িতে আর ঝুঁকি নেয়নি, অ্যাম্বুল্যান্স ডেকে সটান হাসপাতাল। জরুরি বিভাগ।
এই হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগে আগেও কয়েক বার বন্ধুবান্ধবকে ভর্তি করাতে এসেছি, কিন্তু এখন সবই অন্য রকম। স্ট্রেচারে করে নিয়ে গিয়ে ভিতরে শুইয়ে রাখা হল। রোগী ছাড়া তার সঙ্গী, পরিজন সকলের প্রবেশ নিষেধ। রোগী যদি নিজের কেস হিস্ট্রি বলার মতো অবস্থায় না থাকে? অসুবিধে নেই। যন্ত্র বুঝে নেবে নাড়ির গতি, রক্তচাপের ওঠানামা। আগে দেখতে হবে করোনা-পরীক্ষায় এরা পাশ করে কি না! যত ক্ষণ না রিপোর্ট আসে, কেউই সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। আচ্ছন্ন অবস্থাতেই কানে এল, বর্মবস্ত্রে আচ্ছাদিত নার্স আর এক জনকে বলছেন ‘ফোর টু ফাইভ জ়িরো।’ পর দিন সঙ্কেতের মানে বুঝেছিলাম। চার তলায় ২৫০ নম্বর বেড। ওই চতুর্থ তলই এখন আইসোলেশন ফ্লোর। কেউ দেখা করতে পারবে না, ওখানেই তোমাকে একা থাকতে হবে। বহু কাল আগে জয় গোস্বামীর কবিতায় পড়েছিলাম, ‘এইমাত্র জ্ঞান ফিরল: ভাই এসেছিস? ভাস্করদা? ওষ্ঠে ভেজা তুলো/ মা আসবে না?’ সে সব প্রাক্-করোনা যুগের স্বগতোক্তি। এখন কেউ আসে না, অন্য লোক বাড়িতে এলেও আগে হাত-পায়ে স্যানিটাইজ়ার ছিটিয়ে নেয়, ডাক্তার থেকে রোগী সবাই মাস্কের আড়ালে। সবই ‘নিউ নর্মাল’।
এই নব্য স্বাভাবিকতন্ত্রে আমার মাথার কাছে সাঁটা অক্সিজেনের বোতলে জলের বুড়বুড়ি। হাতে বাঁধা চ্যানেলের এক দিকে স্যালাইন, আর এক দিকে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ প্রবেশের শুঁড়িপথ। ঘুম ভাঙিয়ে স্বাস্থ্যসেবিকা মাঝে মাঝেই থার্মোমিটারে জ্বর মাপছেন, জিজ্ঞাসা করছেন, ‘শ্বাসকষ্ট হচ্ছে না তো?’ দুনিয়ার প্রাচীনতম অতিমারিতে যেমন ছিল, আজও সে রকম জ্বর আর শ্বাসকষ্টই লক্ষ্মণরেখা।
প্রাচীনতম মানে আথেন্স, জিশুখ্রিস্টের জন্মের ৪৩০ বছর আগের কথা। এক দিকে ক্রিটের নৌবহরের সঙ্গে যুদ্ধ, অন্য দিকে অবরুদ্ধ শহরে হানা দিল অতিমারি। অসুস্থ মানুষগুলি প্রথমে প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হয়, চোখ লাল হয়ে ওঠে। তার পর গলায় ব্যথা, জিভে রক্ত, শ্বাসপ্রশ্বাসে দুর্গন্ধ। এ বার বমি, দাস্ত। সঙ্গে সর্দিকাশি ও শ্বাসকষ্ট। গায়ে গোটা গোটা লালচে ফুসকুড়ি বেরিয়ে যায়। রোগটা প্লেগ না অন্য কিছু, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে দ্বিমত আছে। কিন্তু আথেন্সের তৎকালীন ইতিহাসবিদ থুকিদাইদিস এ রকমই বর্ণনা দিয়ে গিয়েছেন। তিনি নিজেও এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, ফলে এটি বহু যুগের ও-পার থেকে ভেসে-আসা খাঁটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।
আথেন্স প্রায় উজাড় হয়ে গিয়েছিল, মৃত্যুমিছিলের পুরোভাগে ছিলেন নগরীর চিকিৎসকেরা। থুকিদাইদিস কারণটাও জানিয়ে দিয়েছেন— ওঁরাই সবচেয়ে বেশি সংক্রামক রোগীদের সংস্পর্শে এসেছিলেন। সেই পৃথিবীতে ভাইরাস নিয়ে ধারণা ছিল না। কিন্তু মানুষ প্রদীপ জ্বালিয়ে ও হেলিকপ্টার থেকে ফুল ছুড়ে, এবং ডাক্তারকে পাড়াছাড়া করে একই সঙ্গে অভিনন্দিত ও ধিকৃত করত না।
সবচেয়ে বড় কথা অন্যত্র। ডাক্তারের আকাল, অতএব আথেন্সে তখন রোগীদের শুশ্রূষায় এগিয়ে এলেন এক দল মানুষ। যাঁরা রোগে আক্রান্ত হয়ে সেরে উঠেছেন। এঁরা জানেন, সংক্রমণ একাধিক বার শরীরে হানা দেয় না। অ্যান্টিজেন, অ্যান্টিবডি এবং প্লাজ়মাথেরাপি গোছের শব্দ তখন ভবিষ্যতের গর্ভে। হাসপাতালে শুয়ে মনে হল, কবে অতিমারির প্রতিষেধক বার হবে, তা নিয়ে মানবসভ্যতা কখনওই হাপিত্যেশ করে বসে থাকেনি। ‘নব্য স্বাভাবিকতা’র ব্যাপারটাই বরং হাস্যকর আদেখলেপনা।
আইসোলেশন ওয়ার্ডের একাকিত্ব অনেক ভাবনার খোরাক দেয়। কাচের জানালার উল্টো দিকে হাসপাতালের আর একটা উইং, জানালাগুলি অনেকটা এক রকম। কী আছে ওই বাড়িতে? ক’টা বাজে? জানি না। আমার কাছে এখন মোবাইলও নেই। ওয়ার্ডের আয়া দিদিকে বলব?... দুর! এই যক্ষপুরীতে সময়-টময় জেনে কী হবে? মরে গেলে মৃত না কো-মর্বিডিটি, কোন তালিকায় আমাকে ফেলবে, তা ভেবেই বা লাভ কী? একটা সিগারেট পেলে হত, কিন্তু এখানে বোধ হয় এ সব ভাবাও পাপ! তার চেয়ে বাসবদত্তা, তুমি বরং এই ভরদুপুরে স্বপ্নে এসো। আমি বরং একটু ঘুমিয়ে নিই।
বাসবদত্তাকে আমি দেখিনি। শুধু এটুকু জানি, ‘আজি রজনীতে হয়েছে সময়, এসেছি বাসবদত্তা।’ নগরনটীকে কোথায় আবিষ্কার করছেন সন্ন্যাসী উপগুপ্ত? ‘নগর ছাড়ায়ে গেলেন দণ্ডী/বাহিরপ্রাচীরপ্রান্তে’— মানে, রোগাক্রান্ত শরীরটিকে নাগরিকরা শহরের প্রাচীরের বাইরে, পরিখার ধারে স্বেচ্ছায় ফেলে রেখে গিয়েছে। অতিমারিতে এটাই হয়ে থাকে। মৃতদেহের অসম্মান। তখনকার আথেন্সেই বা কী হয়েছিল? জায়গার অভাবে মরদেহগুলি চিতায় একটার ওপর আর একটা ছুড়ে ফেলা হত, কেউ বা অন্য চিতার আগুন চুরি করে নিত। আজই বা কী হচ্ছে? কেউ রাস্তায় মৃতদেহ ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে, কোনও শ্মশানে সংক্রমিত দেহ দাহ করতে গেলে পাড়ার লোকেরা রুখে দাঁড়াচ্ছে। অতিমারি কিছুই করেনি, মনুষ্যত্ব-টনুষ্যত্ব ইত্যাদি ধোপদুরস্ত বুলির আড়ালে সঙ্গোপন আর একটি হিংস্র জিজীবিষাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
হিংস্র, কারণ অতিমারিতেও নিজের আর্থিক লাভ এবং স্বার্থসিদ্ধির কানাগলি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারেনি থুকিদাইদিসের আথেন্স। সে তখনও নিজের লাভের হিসেব কষে। ওই শহরে নারী এবং ক্রীতদাসরা নাগরিক নয়, সম্পত্তি বা অন্য কিছুর অধিকার তাদের নেই। ফলে মড়কে কেউ উজাড় হয়ে গেলে অন্যরা জাল-জোচ্চুরি করে মৃতের সম্পত্তি দখল করে নিত। থুকিদাইদিসের বয়ান, ‘বিপর্যয় এতটাই সাঙ্ঘাতিক ছিল যে, মানুষ জানত না, এর পর কী হবে। ধর্ম এবং আইন, কোনও কিছুরই তখন তোয়াক্কা করেনি তারা।’
তাই, মহামারিতে মানবসভ্যতা একটা অসম্পূর্ণ বইয়ের মতো। এক এক জায়গায় এক এক রকম প্রতিক্রিয়া। এবং প্রতিটি অভিজ্ঞতাই ক্ষণে ক্ষণে বদলে যায়। মহামারির শুরুতে আথেন্সের লোকজন বলত, ক্রিটের লোকেরা ঝর্নার জলে বিষ মিশিয়ে গিয়েছে, সেখান থেকে বিপদ। থুকিদাইদিস এই রটনাকে গুরুত্ব দেননি, এক বারই উল্লেখ করেছেন। ক্রমে তাঁর মহামারির বর্ণনা যত এগিয়েছে, গুজব ব্যাঙাচির লেজের মতো খসে পড়েছে। এ বারেও শুরুতে লোকে চিনা ভাইরাস, তবলিঘি জামাত কত কী বলছিল! এখন আইটি সেল সে নিয়ে প্রায় নীরব। আথেনীয়রা জীবন দিয়ে বুঝেছিল, অহেতুক শত্রু খুঁজে লাভ নেই। বিস্ফোরণের স্প্লিন্টার যে কখন কার ঘাড়ে আছড়ে পড়বে, কেউ জানে না।
আমাদের বহুতল-পাড়ার ছোট্ট পরিসরেও যে কত কী বদলে গেল। গোড়ার দিকে প্রায়ই শুনতাম, ‘জানিস তো, ওখানে একটা করোনা ধরা পড়েছে।’ করোনা রোগী যেন চোর বা ডাকাত! এখন অবস্থা একটু ভাল। ধরা পড়া, চোর-পুলিশ খেলার অনুযোগ আর নেই। উল্টে কারও করোনা সংক্রমণের খবর পেলে আবাসন সমিতিই পুরসভাকে স্যানিটাইজ়ার-গাড়ি পাঠিয়ে লিফট ও ফ্ল্যাট পরিষ্কার করতে বলে। অতিমারি অবশ্যই মহৎ শিক্ষক!
পাড়ার মাইকিং? তাকেই বা ভুলব কী ভাবে? সংক্রমণ যত এগিয়েছে, গত কয়েক দিন লোকে তত মাইকে বলতে বলতে গিয়েছে, ‘অমুক অমুক দিন লকডাউন। বিনা প্রয়োজনে বেরোবেন না।’ এর আগে এই নাগরিক সভ্যতা ভাবত, মাইক শুধু গ্রামদেশে যাত্রাপালা ও ভিডিয়ো শো ঘোষণার অস্ত্র। অতিমারি প্রায় ফ্যাতাড়ু স্টাইলে বুঝিয়ে দিল, শুধু উচ্চবর্গের নেটফ্লিক্স, ওয়েবিনারেই ‘নিউ নর্মাল’ ঘটে না। গত শতকের মাইক, সাইকেল-রিকশা এবং হ্যান্ডবিলও জনপরিসরে সমান জরুরি।
ডাক্তারবাবু আবার এলেন, ‘ভাল খবর। আপনার করোনা আর ডেঙ্গি, দুটোই নেগেটিভ।’
‘তা হলে কি আজ ছাড়া পাব?’ ডাক্তার হাসলেন, ‘আর এক দিন থাকুন। শুগার, ইকোকার্ডিয়োগ্রাম ওগুলি করিয়ে নিই। চিন্তা নেই। আজ আপনাকে নীচে শিফ্ট করে দিতে বলছি।’
এ যাত্রা নাহয় কানের পাশ দিয়ে তির বেরিয়ে গেল। কিন্তু এর পর? এখন তো সামান্য সর্দিকাশিতেই মনে হয়, কোভিড হল!
‘অত ঘাবড়াবেন না। এখন কোভিড ভাইরাসের অ্যাটাক অন্য রকম। হালকা জ্বর। কিন্তু খাবারের স্বাদ আর গন্ধ পাবেন না। ওটাই মেজর সিম্পটম।’
নষ্ট ইন্দ্রিয়! থাকবে না রসনাবিলাস? কিংবা ঘ্রাণেন অর্ধভোজনম্! পরিষ্কার হয়ে গেল, এই রোগলক্ষণ ধ্রুপদী সভ্যতার নয়। জনতা আদিখ্যেতার বশে এটাকেও ‘নিউ নর্মাল’ আখ্যা না দিলেই হয়!