সর্বজনীন

মন বলিবে, সব কিছুই একত্র মিলিয়া যাক। মস্তিষ্ক বলিবে, সব মিলিতেছে না। সর্বজনীন প্রকৃত অর্থে সর্বজনীন হইয়া উঠিতেছে না। এক বৃহৎ আপাত-সর্বজনীনের মাঝে রহিয়াছে অনেকগুলি ছোট ছোট সর্বজনীনের বৃত্ত।

Advertisement
শেষ আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ০১:০৩
Share:

সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমাগত। নিজ নিজ সজ্জায় প্রস্তুত মণ্ডপ, প্রতিমা, পূজার উপচার এবং সর্বজনীন আনন্দ। মন বলিবে, সব কিছুই একত্র মিলিয়া যাক। মস্তিষ্ক বলিবে, সব মিলিতেছে না। সর্বজনীন প্রকৃত অর্থে সর্বজনীন হইয়া উঠিতেছে না। এক বৃহৎ আপাত-সর্বজনীনের মাঝে রহিয়াছে অনেকগুলি ছোট ছোট সর্বজনীনের বৃত্ত। মধ্যবিত্তের, উচ্চ-মধ্যবিত্তের, নিম্নবিত্তের, দরিদ্রদের, নেতা-মন্ত্রী ও সাঙ্গোপাঙ্গদের, কলিকাতার, মফস্সলের, গ্রামের... বহু সর্বজনীন পাশাপাশি থাকিতেছে, কিন্তু এক যথার্থ বৃহৎ সর্বজনীন তৈয়ারি হইতেছে না। এবং এই ছোট সর্বজনীনগুলি নিজের বৃত্তের সর্বজনীনতার আনন্দটুকু লইয়াই তৃপ্ত, একে অপরের প্রতি উদাসীন। বস্তুত, পরস্পর সম্পর্কে হয়তো বা তাহাদের মনে কাজ করে ঔদাসীন্য, ক্রোধ, বিরক্তি ইত্যাদি নানা নেতিবাচক অনুভূতি। এত অপছন্দ সত্ত্বেও, পূজার সময় সব সর্বজনীন পাশাপাশি অবস্থান করে। কিন্তু মিলিতে পারে না।

Advertisement

মিলিতে পারা সত্যই কি অসম্ভব? বস্তুত, মিলিতে পারাই কি স্বাভাবিক নহে? রাত্রি দশটার সময় মহানগরের রাজপথে বেলুন হস্তে মফস্সলের নিম্নবিত্ত বাড়ির ছোট্ট মেয়েটি পায়ে ফোসকা লইয়া যে উত্তেজনায় ঠাকুর দেখিতে আগ্রহী, কাঞ্জীভরম শাড়ি পরিহিতাও একই লাইনে দাঁড়াইয়া সেই প্রতিমা দর্শনে আকাঙ্ক্ষী। ছোট মেয়েটির উৎসাহী মুখের জ্বলজ্বলে ভাবটি দেখিয়া কাঞ্জীভরমের অন্তত এক বার দ্বিগুণ আনন্দে উৎফুল্ল হওয়াই কি স্বাভাবিক নহে? সকলের আনন্দ হইতে আপন আনন্দ সংগ্রহ করিয়া লওয়াই কি প্রকৃত সামাজিকতা নহে? সমাজকাঠামোটি কিন্তু সর্বজনীন সহাবস্থানের ভিতেই দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। শারদোৎসব সেই সহাবস্থানকে অনিবার্য করিয়া তোলে। তাহা না হইলে কাঞ্জীভরম বেলুন-মেয়ের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপের সুযোগটুকুও পাইতেন না। এবং এই সহাবস্থান যদি না থাকিত, তাহা হইলে সমাজের পিরামিডটিও সুস্থিত থাকিত না। আমরা খাদ্য-পিরামিড বিষয়ে প্রতি অধুনা সচেতন। সমাজ-পিরামিডটির প্রতি সচেতন না হইলে ক্ষতি।

না হইলেই বরং ক্ষতি। সেই ক্ষতির নিদর্শন ইদানীং অতি প্রকট। বহু মানুষই এখন নিজস্ব গণ্ডির সুখে ও দুঃখে মশগুল, বৃহত্তর সমাজ সম্পর্কে তাঁহারা আগ্রহী নহেন, বস্তুত ওয়াকিবহালই নহেন। তাঁহারা দৈনন্দিন আনন্দের নিজস্ব বৃত্তটিকেই সত্য বলিয়া বিশ্বাস করিতে চাহেন, তাহার দেখনদারিই তাঁহাদের একমাত্র অবলম্বন হইয়া দাঁড়ায়। ফলে, তাঁহাদের আনন্দ মনের উপরিতলেই ভাসিতে থাকে। গভীরে প্রবেশ করে না। কিন্তু নিজ অনুভূতির শিকড়ে না পৌঁছাইলে সেই অনুভূতি পূর্ণতা পায় না। শিকড় মানে দুর্গাপূজাকে হিন্দু-ঐতিহ্যের পরাকাষ্ঠা হিসাবে দেখা এবং দেখানো নহে, আপনার গভীর অনুভূতির নিকট সৎ থাকা। তাহার জন্য প্রয়োজন অন্যের মনের সহিত আপনার মানসিক সংযোগ রচনা করা। তাহাই প্রকৃত সর্বজনীনতা। এই সর্বজনীনের অঙ্গ হইবার সুযোগ আজ আর সুলভ নহে, এখন ব্যক্তিনাগরিকের দৈনন্দিন জীবন বহুলাংশে আপন আপন বিচ্ছিন্ন বলয়েই অতিবাহিত হয়। দুর্গাপূজার কয়েকটি দিন সেই বলয়গুলি পরস্পরকে স্পর্শ করিবার সুযোগ পায়। সেই সুযোগের পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করিব না কেন?

Advertisement
(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
Advertisement
Advertisement
আরও পড়ুন