সম্পাদকীয় ২

কৃমিসংহার

জি তিল কৃমি। পরাজিত হইল বাঙালি। স্কুলের শিশুদের কৃমিমুক্ত করিবার যে জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম গোটা বিশ্ব গ্রহণ করিয়াছে, এ রাজ্যে সরকার তাহা বন্ধ করিল। দায়িত্ব এড়াইবার এমন দৃষ্টান্ত বিরল। কিছু শিশু ঔষধ খাইয়া পেট ব্যথায় ভুগিয়াছে। অভিভাবকরা স্কুলে আসিয়া গালমন্দ করিয়াছেন। তাহাতেই পিছাইয়া গেলেন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দফতরের কর্তারা।

Advertisement
শেষ আপডেট: ২০ অগস্ট ২০১৬ ০০:০০
Share:

জি তিল কৃমি। পরাজিত হইল বাঙালি। স্কুলের শিশুদের কৃমিমুক্ত করিবার যে জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম গোটা বিশ্ব গ্রহণ করিয়াছে, এ রাজ্যে সরকার তাহা বন্ধ করিল। দায়িত্ব এড়াইবার এমন দৃষ্টান্ত বিরল। কিছু শিশু ঔষধ খাইয়া পেট ব্যথায় ভুগিয়াছে। অভিভাবকরা স্কুলে আসিয়া গালমন্দ করিয়াছেন। তাহাতেই পিছাইয়া গেলেন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দফতরের কর্তারা। কেবল কৃমিবিনাশ নহে, যে কোনও জনস্বাস্থ্য প্রকল্পের প্রতি ইহা এক অশুভ সংকেত। টিকাকরণ হইতে প্রতিষেধক বা ঔষধ বিতরণ, যে কোনও জনস্বাস্থ্য কার্যসূচি সম্পর্কে নাগরিকদের একাংশের ভীতি ও বিভ্রান্তি কাজ করিয়া থাকে। তৃতীয় বিশ্বে রাষ্ট্র ও সরকারের সহিত দরিদ্র মানুষের এক সংঘাতপূর্ণ দূরত্ব রহিয়াছে। সরকারকে তাঁহারা ভয় ও সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখিয়া থাকেন। ফলে কোনও সরকারি প্রকল্পকে সকলে নির্দ্বিধায়, মুক্তমনে গ্রহণ করিবেন, ইহা অলীক প্রত্যাশা। ঔপনিবেশিক কাল হইতে আজ অবধি যে কোনও জনস্বাস্থ্য প্রকল্পে কুসংস্কার ও অপপ্রচারের বশবর্তী হইয়া কিছু মানুষ বাধা সৃষ্টি করিয়াছেন। সেই বাধা অতিক্রম করিয়া তাহাদের সহমত করিবার কাজটি জনস্বাস্থ্যের কর্মসূচির মধ্যেই পড়ে। এ রাজ্যে সরকারি কর্তারা সে কাজটি ইতিপূর্বে কৃতিত্বের সহিত করিয়াছেন। পোলিয়ো দূরীকরণে রাজ্যের সাফল্য তাহার দৃষ্টান্ত। পোলিয়ো টিকার ‘ক্ষতি’ সম্পর্কে বহু গুজব ছড়াইয়াছে। গ্রাম বা মহল্লা হইতে ‘বয়কট’ ডাকিয়া নানা শর্ত আরোপের চেষ্টা হইয়াছে। এমনকী সাম্প্রদায়িক তাস খেলিবার চেষ্টারও কসুর হয় নাই। কিন্তু সরকার ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলির দৃঢ়তার সম্মুখে কোনও বাধা ধোপে টেকে নাই। শিশুদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত, পোলিয়োমুক্ত হইয়াছে।

Advertisement

সেই রাজ্যেই আজ কৃমি মারিতে হাত কাঁপিতেছে কেন? কৃমি কম ক্ষতিকর নহে। শিশুদের অপুষ্টি, রক্তহীনতার অন্যতম কারণ কৃমির সংক্রমণ। ক্রমাগত কৃমি-সংক্রমণে শিশুর শরীর শীর্ণ ও হ্রস্ব হইয়া যায়, মেধার বিকাশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আফ্রিকার নানা দেশের তুলনায় ভারতের আর্থিক অবস্থা উন্নত হওয়া সত্ত্বেও এ দেশের শিশুরা অধিক অপুষ্ট। বিশেষজ্ঞদের মতে, মুক্তস্থানে শৌচ এবং তাহার জেরে কৃমি সংক্রমণ ইহার একটি প্রধান কারণ। নানা দেশে গবেষণায় স্পষ্ট, স্কুলের শিশুদের কৃমির ঔষধ নিয়মিত খাওয়াইলে তাহাদের স্কুলে উপস্থিতির হার বাড়িয়া যায়। পরিণত বয়সে অধিক কর্মক্ষমতা ও অধিক রোজগার করিতে পারে। শিশু ও সমাজের জন্য কৃমিবিনাশের প্রকল্পের ফল নিশ্চিত ও দীর্ঘমেয়াদি। ইহাকে এড়াইবার উপায় নাই।

কৃমির ঔষধ হইতে যে শিশুর স্বাস্থ্যহানি কোনও মতেই হইতে পারে না, সে বিষয়ে মেডিক্যাল শাস্ত্র দ্বিধাহীন। অধিকাংশ রাজ্য ঔষধ লইয়া আশঙ্কার মোকাবিলায় সফল। ইতিপূর্বে স্কুলে কৃমির ঔষধ দিবার পর বিহার, হরিয়ানা, রাজস্থানে বেশ কিছু শিশু পেট ব্যথা, বমিতে আক্রান্ত হইয়া হাসপাতালে ভর্তি হইয়াছে। কিন্তু সরকারি ডাক্তাররা অভিভাবকদের আশঙ্কা দূর করিয়াছেন। ঔষধ লইয়া কোনও সংশয়ে কান দেওয়া হয় নাই। এ রাজ্যে নেতা, ডাক্তার, শিক্ষক প্রস্তুতিহীন। জনমানসে বিভ্রান্তি দূর করিবার কষ্ট করিতে তাঁহারা রাজি নন। অতএব প্রকল্প স্থগিত হইল। তাহাতে এই বার্তাই প্রচার হইল যে, কৃমির ঔষধের নিরাপত্তা লইয়া সরকারও সন্দিহান। ইহাতে কৃমিমুক্তি কর্মসূচির ভবিষ্যৎ আরও কঠিন হইবে। কয়েক লক্ষ শিশুকে কৃমির ভক্ষ্য করিয়া রাখিয়া দিল রাজ্য সরকার। বাহবা স্বাস্থ্যনীতি।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement