কাহাকে ঠকাইতেছেন

কৈলাস চৌধুরীর শাস্তি হয় নাই। রাহুল গাঁধীকে গুলি করিয়া মারা উচিত, না কি ফাঁসি দেওয়াই ঠিক হইবে, সেই বিষয়ে তাঁহার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বটি রাজস্থানের বারমেড় জেলার এই বিজেপি বিধায়ক সপ্তাহখানেক পূর্বে প্রকাশ্যে, বুক ফুলাইয়া, ব্যক্ত করিয়াছিলেন। ব্যক্তি কৈলাস চৌধুরী যতখানি অকিঞ্চিৎকর, তাঁহাকে তিরস্কার অবধি না করিবার দলীয় সিদ্ধান্তটি ততখানি নহে।

Advertisement

সম্পাদকীয় ১

শেষ আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০০:২৩
Share:

কৈলাস চৌধুরীর শাস্তি হয় নাই। রাহুল গাঁধীকে গুলি করিয়া মারা উচিত, না কি ফাঁসি দেওয়াই ঠিক হইবে, সেই বিষয়ে তাঁহার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বটি রাজস্থানের বারমেড় জেলার এই বিজেপি বিধায়ক সপ্তাহখানেক পূর্বে প্রকাশ্যে, বুক ফুলাইয়া, ব্যক্ত করিয়াছিলেন। ব্যক্তি কৈলাস চৌধুরী যতখানি অকিঞ্চিৎকর, তাঁহাকে তিরস্কার অবধি না করিবার দলীয় সিদ্ধান্তটি ততখানি নহে। অনুমান করা চলে, এই নিষ্ক্রিয়তার পিছনে দলের নৈতিক অবস্থানের প্রভাব আছে। নাগপুরের মনসবদাররা হয়তো সত্যই মনে করেন, কোনও রাজনীতিক যদি জেএনইউ-র ‘দেশদ্রোহী’ ছাত্রদের পার্শ্বে দাঁড়ান, তবে তাঁহারও মৃত্যুদণ্ড হওয়াই বিধেয়। কিন্তু, মনে যাহাই থাকুক, মুখে কৈলাস চৌধুরীকে খানিক বকিয়া দিলে বিরোধীদের ক্ষোভ প্রশমিত করিতে সুবিধা হইত। বিশেষত এই সময়ে, যখন রোহিত ভেমুলা হইতে কানহাইয়া কুমার, পাঠানকোটের উগ্রপন্থী হামলা হইতে হরিয়ানায় জাঠদের সংরক্ষণের দাবির ন্যায় হরেক প্রশ্নে বিরোধীরা প্রবল বিক্ষুব্ধ। সংসদের বাজেট অধিবেশনটিও বিনষ্ট হইবে, সেই সম্ভাবনা প্রকট। অধিবেশনটিকে বাঁচাইবার ইচ্ছা থাকিলে বিরোধীদের নিকট পৌঁছাইয়া যাওয়া কর্তব্য ছিল, তাঁহাদের পিঠে হাত রাখিয়া ক্ষোভ প্রশমন বিধেয় ছিল। ‘আশা করি অধিবেশনটি সফল হইবে, বিরোধীরা গঠনমূলক সমালোচনা করিবেন’ বলিয়া বিবৃতি দিয়াই প্রধানমন্ত্রী দায় সারিয়াছেন। তিনি কাহাকে ঠকাইতেছেন— নিজেকে, না কি দেশবাসীকে?

Advertisement

রাজনীতিতে মতভেদ থাকিবেই। যতই অগ্রহণযোগ্য হউক, চড়া পর্দার জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অধিকারও ভারতীয় জনতা পার্টির আছে। অনুমান করা চলে, ভোটের বাজারে উগ্র হিন্দুত্ববাদ যথেষ্ট সফল না হওয়ায় জাতীয়তাবাদের তাসটি এনডিএ-র প্রধান শরিকের নিকট গুরুত্বপূর্ণ হইয়াছে। কিন্তু, সেই গৈরিক উগ্র জাতীয়তাবাদই একমাত্র রাজনীতি, তাহার বাহিরে অন্য কোনও মতামত থাকিতেই পারে না, এই বিশ্বাসটি গণতন্ত্রের পক্ষে মারাত্মক। ভিন্ন মতাবলম্বী মাত্রেই ভারত-বিদ্বেষী, পাকিস্তানের চর, এমন দাবি বহুস্বরবাদী গণতন্ত্রে চলিতে পারে না। বিজেপি সেই পথটিই বাছিয়াছে। এবং, রাজনীতি হইতে ‘সৌজন্য’ নামক বালাইটিকে কুলার বাতাস দিয়া বিদায় করিয়াছে। তাঁহারা উগ্র জাতীয়তাবাদী, অতএব অন্যান্যদের তুলনায় তাঁহারা পবিত্রতর, এমন একটি অলীক বিশ্বাসও বিজেপি নেতাদের স্কন্ধে ভর করিয়াছে। সীতারাম ইয়েচুরি যখন বলেন যে শাসক দল ‘নিয়মিত দেশের পরিবেশ বিষাইয়া তুলিতেছে’, সেই অভিযোগটিকে উড়াইয়া দেওয়ার অবকাশ বিজেপি নেতারা রাখেন নাই। এই বিষাক্ত পরিবেশে গঠনমূলক সমালোচনা-নির্ভর ইতিবাচক গণতন্ত্রের অনুশীলন অসম্ভব।

হিন্দুত্ববাদী আস্ফালনের বাড়াবাড়ি হইলে নরেন্দ্র মোদী-অরুণ জেটলিরা এত দিন খুচরা নেতাদের ঘাড়ে সেই দোষ চাপাইয়া দিতেন। ঘর ওয়াপসি হইতে দাদরি হত্যাকাণ্ড, প্রতি ক্ষেত্রেই সেই অজুহাত প্রযুক্ত হইয়াছে। এই দফায় আর সেই কথা বলিবারও কোনও উপায় নাই। রাজনাথ সিংহ বা স্মৃতি ইরানি খুচরা নেতা নহেন। যে ভঙ্গিতে দলের মুখপাত্ররা পাটিয়ালা হাউস কোর্টের বেয়াড়া আইনজীবীদের আড়াল করিতে ব্যস্ত, যে ভাবে দিল্লির নগরপাল কানহাইয়া কুমারকে দেশদ্রোহী প্রমাণ করিতে উন্মুখ, তাহাতেও স্পষ্ট যে কাজটি খুচরা অত্যুৎসাহীদের নহে, বরং দলের সর্বসম্মতিক্রমে হইয়াছে। নরেন্দ্র মোদীর চর্চিত নীরবতা দেখিয়াও অনুমান করা চলে, তাঁহার অগোচরে কিছু ঘটে নাই। নিজেদের উগ্র মুখটি আড়াল করিবার কোনও চেষ্টাও বিজেপির তরফে হইল না। বিরোধীরা সংসদ অচল করিয়া রাখিলে সম্পূর্ণ দোষটি আর তাঁহাদের উপর চাপাইয়া দেওয়া যাইবে কি?

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement