সম্পাদকীয় ২

জননী, সমাজ, রাষ্ট্র

সন্তানপালন কেবল মাতার দায় নহে— রাষ্ট্রের চিন্তায় এই বোধ ক্রমে আসিতেছে। সন্তান জন্মের সময়ে সংগঠিত ক্ষেত্রের বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত মহিলারা যাহাতে ছাব্বিশ সপ্তাহের ছুটি পান, সে জন্য গত দুই বৎসর ধরিয়া কেন্দ্রীয় সরকারের নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রক তৎপর।

Advertisement
শেষ আপডেট: ১৫ অগস্ট ২০১৬ ০০:০০
Share:

সন্তানপালন কেবল মাতার দায় নহে— রাষ্ট্রের চিন্তায় এই বোধ ক্রমে আসিতেছে। সন্তান জন্মের সময়ে সংগঠিত ক্ষেত্রের বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত মহিলারা যাহাতে ছাব্বিশ সপ্তাহের ছুটি পান, সে জন্য গত দুই বৎসর ধরিয়া কেন্দ্রীয় সরকারের নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রক তৎপর। এখন মাতৃত্বের ছুটি বারো সপ্তাহের। মন্ত্রকের আনীত সংশোধনী আইনপ্রস্তাব গত সপ্তাহে রাজ্যসভায় পাশ হইয়াছে। নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী মেনকা গাঁধীর বক্তব্য, শিশু ও জননীর সম্পর্ক নিবিড়তর করিতে সদ্যোজাত সন্তানের সহিত মায়ের আরও বেশি সময় অতিবাহিত করা প্রয়োজন। এই সুচিন্তা গুরুত্বপূর্ণ। তবে কেবল ছুটি দিয়াই ক্ষান্ত থাকিলে হইবে না। এই ছুটির গুরুত্ব সমাজকে আরও গভীর এবং ব্যাপক ভাবে বুঝিতে হইবে। কারণ নবজাতকটি একটি সামাজিক জীব। তাহাকে ঠিকঠাক গড়িয়া তোলার পিছনে সমাজের একটি বড় ভূমিকা থাকা উচিত। সেই ভূমিকা পালনের একটি উপায় শিশুর লালনে জননীকে সাহায্য করা। সমাজ এই মাতৃত্বের ছুটিকে অন্তর হইতে সমর্থন করিলে তবেই বুঝা যাইবে, আপন দায়িত্ব পালনে সমাজ কতটা আগ্রহী।

Advertisement

এই সূত্রেই প্রশ্ন ওঠে, পিতৃত্বের ছুটি মিলিবে না কেন। প্রশ্নটি সঙ্গত। তর্কসাপেক্ষও। কেহ বলিতে পারেন, মাকে শিশুর যতটা প্রয়োজন, বাবাকে কি ততটা প্রয়োজন হয়? সত্য, জৈবিক কারণেই হয় না। কিন্তু প্রয়োজন তুলনায় কম হইবার অর্থ এমন নহে যে, প্রয়োজন নাই। প্রথমত, মায়ের শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রান্তির মোকাবিলায় বাবার সাহায্য খুবই মূল্যবান। দ্বিতীয়ত, বাবার সঙ্গে শিশুর সম্পর্ক নিবিড় হওয়ার জন্যও তাঁহার সাহচর্য আবশ্যক। অনেকেই পিতৃত্বের ছুটির অপব্যবহার করিতে পারেন, কিন্তু সেই আশংকায় কোনও ভাল পদক্ষেপ করা যাইবে না, ইহা সুযুক্তি নহে। আজ হয়তো অনেক পুরুষ মা বা শিশুর প্রতি তেমন দায়িত্ব পালন না করিয়া এই ছুটি আপন বিনোদনের প্রকরণ হিসাবে ব্যবহার করিবেন। কিন্তু ইহার প্রচলন থাকিলে সমাজ ক্রমে তাহার মানসিকতা বদলাইবে। পিতৃত্বের ছুটিকে পুরুষ উত্তরোত্তর দায়িত্ব পালনের উপায় হিসাবে দেখিবেন। সন্তানের দায়িত্ব যে কেবল মায়ের নহে, তাহা শিখিবেন। এই দায়িত্ববোধই এক দিন সমাজে পরিবর্তন আনিবে, এমন আশা করিলে হয়তো ভুল হইবে না।

অনেকের আশঙ্কা, বেসরকারি সংস্থাগুলি এই বিল পাশ হইবার পর হয়তো মেয়েদের কাজে নিয়োগ করিবার ব্যাপারে উৎসাহী হইবে না। তাহারা ভাবিবে, ছয় মাস সবেতন ছুটি দিতে হইলে লোকসান। সেই আশঙ্কা অমূলক নহে, কিন্তু সম্ভবত কিঞ্চিৎ অতিরঞ্জিত। সব সংস্থাই এক মনোভাব পোষণ করে না। আইনের অনুশাসন না থাকিতেই অনেক বেসরকারি সংস্থাই নানা ক্ষেত্রে মহিলাদের প্রয়োজন বা সুবিধা-অসুবিধার কথা অনুভব করে এবং সেই অনুযায়ী সংস্থার নীতি স্থির করিয়া থাকে। বিশেষত, আন্তর্জাতিক পরিসরে সক্রিয় বেশ কিছু সংস্থা মাতৃত্বের ছুটি ছাড়াও সন্তান পরিচর্যার বিশেষ বন্দোবস্ত করিয়া দেয়, মেয়েরা মাতৃত্বের কারণে কয়েক বৎসর অবসর লইবার পর কাজে ফিরিতে চাহিলে তাহার সুযোগ করিয়া দেয়। এই ধরনের সংস্থা হয়তো আজও ব্যতিক্রম। কিন্তু যাহারা যথেষ্ট উদার মনোভাবাপন্ন নহে, সরকার তাহাদের মহিলা কর্মী নিয়োগে বিশেষ উৎসাহ দিতে পারে। এই ধারা চলিতে থাকিলে আজ যাহা ব্যতিক্রম, কাল তাহাই নিয়ম হইয়া উঠিবে।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement