সম্পাদকীয় ২

প্রচার-গহ্বর

নরেন্দ্র মোদীর ‘স্বচ্ছ ভারত’ অভিযানের বৎসর-পূর্তির ঠিক আগেই বিরোধী রাজনীতিকরা দিল্লিতে বসিয়া ইহার প্রতি তীব্র কটাক্ষ করিলেন, পরিহাস করিলেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী গোটা প্রয়াসটিকে ‘নাটক’ বলিয়া অভিহিত করিলেন। বিরোধিতাই বিরোধীদের কাজ। কিংবা দস্তুর।

Advertisement
শেষ আপডেট: ০২ অক্টোবর ২০১৫ ০০:০১
Share:

নরেন্দ্র মোদীর ‘স্বচ্ছ ভারত’ অভিযানের বৎসর-পূর্তির ঠিক আগেই বিরোধী রাজনীতিকরা দিল্লিতে বসিয়া ইহার প্রতি তীব্র কটাক্ষ করিলেন, পরিহাস করিলেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী গোটা প্রয়াসটিকে ‘নাটক’ বলিয়া অভিহিত করিলেন। বিরোধিতাই বিরোধীদের কাজ। কিংবা দস্তুর। কিন্তু এই বিশেষ বিরোধিতাটিকে দস্তুর হিসাবে উড়াইয়া না দিয়া, ব্যঙ্গ-পরিহাসের প্রাত্যহিক চাপান-উতোর সাগরে ভাসাইয়া না দিয়া আর একটু প্রণিধানসহ বিচার করিলে ভাল। ঠিক কোন ফাঁক গলিয়া কোনও কর্মসূচি, এমনকী সুবিবেচিত কর্মসূচিও ‘নাটক’ হইয়া উঠে, নাটকীয়তার সীমা ছাড়াইয়া কাজের মহিমায় উন্নীত হইতে পারে না, তাহা একটি জরুরি প্রসঙ্গ। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আমলে কাজকে সমানেই নাটকে পর্যবসিত করিবার প্রবল ধারাবাহিকতা: স্বচ্ছ ভারত, গঙ্গাশোধন, কোনওটিই তাঁহার আমলে কাজ হইয়া উঠিতে পারিল না, নাট্য-পরিকল্পনাতেই শেষ হইয়া গেল। গঙ্গার মহিমা লইয়া কাব্য হইল, স্লোগান হইল, দফতরে কাজ হইল না। স্বচ্ছতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হইয়া প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ঝাঁটা লইয়া রাজপথে নামিলেন, সচিন তেন্ডুলকর ও আরও নামীদামি মানুষ অভিযানের ব্র্যান্ড তৈরিতে আপ্রাণ সাহায্য করিলেন, ভারত কিন্তু ঘুমায়েই রহিল। স্বচ্ছ ভারতের অভিজ্ঞতা বলিতেছে, প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রচারের দিকটিতে যত পারদর্শী, প্রয়োগের ক্ষেত্রে ততই বালখিল্য। বিদেশনীতির বাগাড়ম্বর হইতে শুরু করিয়া সংস্কারের বাহাদুরিপূর্ণ প্রতিশ্রুতি, সবেতেই দেখাইয়া দিয়াছেন, আত্মনির্ঘোষী প্রচারের আলোর অত্যুজ্জ্বলতার গহ্বরে তিনি কেমন নিজেই হারাইয়া যান।

Advertisement

প্রচারের আলো এবং কাজ-বিমুখতার মধ্যে কি কার্যকারণ সম্পর্ক আছে, না কি ইহা নিছক সমাপতন, আকস্মিকতা? যুক্তি বলিতেছে, দুইয়ের সম্পর্ক আছে। সংস্কারের পরিকল্পনার প্রথমে, শেষে এবং মধ্যে যদি কেবলই তাহার ঢাকটি কী ভাবে ও কত জোরে পিটানো হইবে, সেই হিসাব পরিব্যাপ্ত থাকে, তবে সংস্কারের উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা উপেক্ষিত হইবার সম্ভাব্যতাও উচ্চ। দেশের সর্বত্র কেন্দ্রীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে এই কর্মসূচি বহন করিতে হইলে প্রথমেই দরকার ছিল পৌর সংগঠন ও গ্রাম পঞ্চায়েতের সক্রিয় অংশগ্রহণ। অথচ এক বৎসর ধরিয়া সুষ্ঠু সাংগঠনিক প্রয়াসের পরিবর্তে বিক্ষিপ্ত, বিচ্ছিন্ন গিমিক চলিতেছে। কোনও সমাজ-সংস্কারই শর্টকাটে সাধনযোগ্য নয়। গাঁধীজিকেও শর্টকাটে নিজের রাজনীতির ‘আত্মস্থ’ করা যায় না। একটি সু-উদ্যোগ তাই রেডিয়ো-টিভির বিজ্ঞাপনেই সীমিত থাকিল।

প্রচারেরও কিছু মূল্য অবশ্যই আছে। বিশেষত ভারতের সমাজে যেখানে সাধারণ পরিচ্ছন্নতা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসচেতনতাটুকুরও তুমুল অভাব, মানুষ নিজের ঘর পরিষ্কার করিতে যে দেশে জানলা দিয়া যাবতীয় আবর্জনা রাস্তায় নিক্ষেপ করাই সহজতম পথ বলিয়া বিবেচনা করে, সেখানে বিদ্যালয়ের বালকবালিকাদের মুখে পরিচ্ছন্নতার প্রচার পৌঁছাইয়া দেওয়াও যথেষ্ট দরকারি। কিন্তু, তাহার পর? আর কিছু না হউক, কলিকাতা শহরে সম্প্রতি যেমন দেখা গিয়াছে, সেই ভাবে দেশের অন্যান্য ছোট-বড় শহরেও কি অন্তত রাস্তাঘাটের পাশে খোলা ভ্যাটগুলির স্থানান্তরণ করা যাইত না? খোলা নর্দমার সংস্কার করা যাইত না? স্বচ্ছ ভারতের বৎসরপূর্তির দিনে রাজধানী দিল্লি যে ভাবে মশকবাহিত ডেঙ্গি সংক্রমণের আতঙ্কে কম্পমান, অভিযানটির সাফল্যমাত্রার সূচক হিসাবে তাহাই যথেষ্ট।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement