সম্পাদকীয় ২

ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন

পাকিস্তানের পঞ্জাবে যাহা ঘটিল, আপাত ভাবে তাহা আর একটি সন্ত্রাসের দৃষ্টান্ত মাত্র। কিন্তু আতসকাচ ফেলিলে ঘটনাটির মধ্যে দুই রকমের বিশিষ্টতা ধরা পড়ে। প্রথমত, সরাসরি মন্ত্রীকেই লক্ষ্য বানাইয়া নিকেশ করিয়া দেওয়ার ঘটনা সুলভ নহে।

Advertisement
শেষ আপডেট: ১৯ অগস্ট ২০১৫ ০০:২১
Share:

পাকিস্তানের পঞ্জাবে যাহা ঘটিল, আপাত ভাবে তাহা আর একটি সন্ত্রাসের দৃষ্টান্ত মাত্র। কিন্তু আতসকাচ ফেলিলে ঘটনাটির মধ্যে দুই রকমের বিশিষ্টতা ধরা পড়ে। প্রথমত, সরাসরি মন্ত্রীকেই লক্ষ্য বানাইয়া নিকেশ করিয়া দেওয়ার ঘটনা সুলভ নহে। অনুমান করা যায়, পঞ্জাব প্রদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সন্ত্রাসবিরোধিতার অন্যতম প্রধান নেতা বলিয়াই তাঁহার উপর আক্রমণ বর্ষিত হইল। দ্বিতীয়ত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুজা খানজাদা যখন ইসলামাবাদের কিছু দূরে অ্যাটক-এ জিরগা বা স্থানীয় জনজাতীয় কাউন্সিলের সহিত বৈঠক করিতেছিলেন, তখনই আত্মঘাতী আক্রমণে তাঁহার প্রাণনাশ ঘটে। অর্থাৎ জঙ্গি হানাদাররা বার্তা দিতে চাহে যে, এই সব কাউন্সিল যেন নিজেদের কাজকর্মে রক্ষণশীল ইসলামি নেতৃত্বের পথই অনুসরণ করে, অন্যথা বিপদ। দুই দিক দিয়াই স্পষ্ট হয় যে জঙ্গিদের প্রকৃত টার্গেট পাকিস্তানি রাষ্ট্র। লস্কর-ই-জংভি নামে যে জঙ্গি সংগঠন এই হামলার দায় স্বীকার করিয়াছে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাহার উগ্রপন্থীদের গত কয়েক বৎসরে ঠিক একই ধরনের আঘাত হানিতে দেখা গিয়াছে। সাধারণ মানুষকে বাজি রাখিয়া আগাইতে দেখা গিয়াছে। স্পষ্টতই সুজা খানজাদা সহ প্রায় জনা-পনেরো মানুষকে হত্যা করিয়া তালিবান-আদর্শে স্নাত এই সংগঠন ইঙ্গিত দিতেছে যে, পাক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম আরও রক্তাক্ত হইয়া উঠিতে পারে।

Advertisement

অথচ লস্কর-ই-জংভি হিমশৈলের চূড়ামাত্র। এ রকম আরও অসংখ্য ছোটখাটো জঙ্গি গোষ্ঠী পাকিস্তানে তৎপর রহিয়াছে একই রকম উদ্দেশ্য লইয়া। ভারতের ক্ষেত্রে যাহাদের নাম অধিক শোনা যায়, সেই লস্কর-এ-তইবা কিংবা জামাত-ই-মুজাহিদিন, দুটিরই উৎস এবং ভিত্তি পাকিস্তানের পঞ্জাব প্রদেশ, এবং দুটিই সীমান্তের পূর্বদিকে হানা শানাইবার সহিত পশ্চিমে নিজেদের দেশের অভ্যন্তরেও সমান কর্মতৎপর। এ ছাড়াও আছে দাওয়াত-এ-ইসলামি, যাহাদের একাধিক জঙ্গি হানার মধ্যে এই প্রসঙ্গে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য —২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে এই গোষ্ঠীর সদস্য মালিক মুহম্মদ কাদরি কর্তৃক পাক গভর্নর সলমন তাসিরের হত্যা। সেই হত্যার মধ্যেও রাষ্ট্রকে শিক্ষা দিবার লক্ষ্যটিই প্রধান ছিল। এবং সে ক্ষেত্রেও মনে করা হইয়াছিল, ইসলামি ধর্মবিরোধিতার আইন তুলিয়া দিবার মতো অনাচারের জন্য রাষ্ট্রের উচিত শিক্ষা প্রাপ্য।

স্পষ্টতই, আধুনিক রাষ্ট্র হিসাবে গণতন্ত্রের পথে যদি পাকিস্তান অগ্রসর হইতে চাহে, তাহাকে এই দাম চুকাইয়া যাইতে হবে। চড়া দাম। সে দেশে রাষ্ট্র এবং সরকার এখন ধর্মীয় রক্ষণশীল ও তাহাদের সমর্থনে পুষ্ট ও তুষ্ট রাজনৈতিক শিবিরগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করিতেছে। এই লড়াই হইতে পলাইবার উপায় নাই। নিজ হাতে যে ভয়ানক উগ্রপন্থার জন্ম সে দিয়াছে, নিজের হাতে লালনপালন করিয়াছে, তাহারই উদ্যত অস্ত্রের সামনে সে এখন অসহায়, ক্ষতবিক্ষত। ভারতে পাকিস্তানি জঙ্গিদের হানা দেখিয়া যাঁহারা দিবারাত্রি পাক সরকারকে বয়কট করিয়া উচিত শিক্ষা দিবার কথা বলেন, তাঁহারা এই ‘অন্য’ প্রেক্ষিতটি মনে রাখিলে ভাল করিবেন। ঘরে বাহিরে সন্ত্রাসই একাধারে পাকিস্তানের দোসর এবং তাহার চরম শত্রু। ইহাই সে দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তব। এই সন্ত্রাসকে নির্মূল না করা ছাড়া পাকিস্তানের সামনে আজ কোনও রাস্তা খোলা নাই। চোখের মায়াঞ্জনটি মুছিয়া যত দ্রুত এই বাস্তবের সহিত বোঝাপড়ায় আসা যায়, ততই মঙ্গল।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement