সম্পাদকীয় ১

ভিন্ন লড়াই

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে আপত্তিটি করিয়াছেন, তাহার যাথার্থ্য প্রশ্নাতীত। কেন্দ্র যদি রাজ্য সরকারকে এড়াইয়া সরাসরি জেলাশাসকদের মাধ্যমে কাজ করাইয়া লইতে মনস্থ করে, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিলক্ষণ আপত্তি করিবেন।

Advertisement
শেষ আপডেট: ২৬ ডিসেম্বর ২০১৬ ০০:০০
Share:

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে আপত্তিটি করিয়াছেন, তাহার যাথার্থ্য প্রশ্নাতীত। কেন্দ্র যদি রাজ্য সরকারকে এড়াইয়া সরাসরি জেলাশাসকদের মাধ্যমে কাজ করাইয়া লইতে মনস্থ করে, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিলক্ষণ আপত্তি করিবেন। জেলাশাসকরা রাজ্য সরকারের অধীন। তাঁহারা যে শুধু রাজ্য সরকারের কাজই করেন, তেমন নহে— হইবার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণও নাই। কেন্দ্রীয় সরকার জেলাশাসক, অথবা অন্য কোনও আমলার সহিত আলোচনা করিবার প্রয়োজন বোধ করিতে পারে। তাঁহাদের কোনও বিষয়ে সচেতন করিয়া তুলিবার জন্যও যোগাযোগ জরুরি হইতে পারে। কিন্তু, তাহার রাজ্য সরকারকে এড়াইয়া নহে। রাজ্যের অনুমতিসাপেক্ষে তো বটেই, কাজটি রাজ্যের মাধ্যমে করিলেই তাহা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি যথার্থ সম্মানের হয়। কথাটি কোথাও খোদাই করা নাই। সৌজন্যের ক্ষেত্রে লিখিত বাধ্যবাধকতার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু, এ ক্ষেত্রে প্রশ্নটি শুধু সৌজন্যের নহে। প্রশ্ন ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের। কোথাও লেখা নাই বলিয়াই যদি কেন্দ্রীয় সরকার তাহার এক্তিয়ারের সীমাটিকে না মানিতে আরম্ভ করে, তবে তাহার দীর্ঘমেয়াদি ফল দেশের পক্ষে মঙ্গলের নহে। অতি ক্ষমতাশীল কেন্দ্র আর অসন্তুষ্ট রাজ্য, কোনওটিই দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের উপকার করিবে না। অতএব, নীতি আয়োগের অধিকর্তা জেলাশাসকদের সহিত সরাসরি আলোচনায় বসিতে চাওয়ায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে আপত্তি করিয়াছেন, তাহাকে প্রাপ্য গুরুত্ব দেওয়াই বিধেয়।

Advertisement

তাঁহার আপত্তিটি যতখানি গুরুত্বপূর্ণ, তাহা প্রকাশের ভঙ্গিটি সেই তুলনায় অবিবেচনার প্রকাশ। জেলাশাসকদের তিনি নীতি আয়োগের ভিডিয়ো কনফারেন্স বয়কট করিতে আদেশ দিয়াছেন। ফলে, পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই বৈঠক হইল। সম্প্রতি রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপাচার্যরাও মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের ভিডিয়ো কনফারেন্স বয়কট করিয়াছিলেন। বয়কট শুধু ডিমনিটাইজেশন-পরবর্তী ঘটনা নহে— নীতি আয়োগের বৈঠকে গরহাজির থাকাই পশ্চিমবঙ্গের দস্তুর। ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে বয়কটের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু, স্থান-কাল-পাত্রভেদের কথাটিও স্মরণে রাখা বিধেয়। মুখ্যমন্ত্রীর নিকট বন্‌ধ যেমন সম্পূর্ণ অ-গ্রহণযোগ্য, আদর্শগত ভাবে বয়কটও ঠিক তেমন অ-গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত— উভয়ই চরম পদক্ষেপ, যখন গণতান্ত্রিক আলোচনার আর কোনও অবকাশ থাকে না, একমাত্র তখনই সেই পথে হাঁটা চলে। বয়কটের সিদ্ধান্তটি গণতন্ত্রের পরিপন্থী। গণতন্ত্র সংলাপ দাবি করে, বয়কটের দাবি সংলাপহীনতা। কাজেই, মুখ্যমন্ত্রী ভাবিয়া দেখিতে পারেন, অন্য কোনও পন্থায় তাঁহার অসন্তোষ প্রকাশ করা সম্ভব কি না। রাজনীতি সম্ভাব্যতার শিল্প। অতএব, তিনিও নূতনতর পথের সন্ধান পাইবেন।

যুক্তরাষ্ট্রীয়তার দাবির পক্ষেও বয়কটের রাজনীতিটি ক্ষতিকারক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যথার্থই দাবি করিতেছেন যে কেন্দ্র রাজ্যগুলিকে তাহাদের প্রাপ্য গুরুত্ব দিক। যুক্তরাষ্ট্রীয়তার পক্ষে রাজ্যের গুরুত্ব যেমন জরুরি, কেন্দ্রের উপস্থিতিও তেমনই। অর্থাৎ, কাঠামোটি সংজ্ঞাগত ভাবেই সহযোগিতার, আদানপ্রদানের। সেই পরিসরটিকে রক্ষা করা যুক্তরাষ্ট্রীয়তার সুস্বাস্থ্যের আবশ্যিক শর্ত। বয়কটের পথে সেই শর্ত পূরণ হইবার নহে। মুখ্যমন্ত্রী বরং প্রতি সুযোগে পরিসরটিতে নিজের দাবি পেশ করুন। অন্যান্য রাজ্যকেও প্রতিবাদের শরিক করিয়া লউন। কাঠামো হইতে নিজেকে, নিজের রাজ্যকে, বিচ্যুত করিয়া নহে, কাঠামোটিতে যুক্তরাষ্ট্রীয়তার প্রাণপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই তিনি লড়াই জিতিতে পারেন। বয়কটের পথে নহে, গণতন্ত্রের পথে।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement