আজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাঁহার দেশকে একটি শ্বেতহস্তী উপহার দিবেন। ইস্কো নামক সেই সাদা হাতির দাম পড়িবে প্রায় সতেরো হাজার কোটি টাকা। প্রাচীন সরকারি ইস্পাত কারখানাটির আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণের প্রকল্পটি নয় বছর আগে চালু করিয়াছিলেন মনমোহন সিংহ, তখন বিনিয়োগের অঙ্ক ছিল দশ হাজার কোটি টাকার কিছু কম। পুরনো হাতি খরচে বাড়ে, এক দশকে এই প্রকল্পের খরচ বাড়িয়াছে প্রায় সত্তর শতাংশ। নরেন্দ্র মোদী আসিবেন, ইস্কোর নবজন্ম ঘোষণা করিবেন এবং করতালি আকর্ষণ করিবেন। অর্ধশতাব্দীর দূরত্ব হইতে শ্রীযুক্ত মোদীর এক পূর্বসূরি উচ্চাঙ্গের হাসি হাসিবেন। তাঁহার নাম জওহরলাল নেহরু। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে ভারতের শিল্পায়নের ‘কম্যান্ডিং হাইটস’ অর্থাত্ মহানির্দেশকের উচ্চাসনে বসাইবার যে মন্ত্র তিনি পড়াইয়া গিয়াছিলেন, ইস্কোর এই নবজাগরণে পৌরোহিত্য করিয়া বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জানাইয়া দিবেন, সেই মন্ত্রই সমানে চলিতেছে। এই ভাবেই বুঝি তিনি নেহরু যুগের অবসান ঘটাইবেন!
অথচ দুই দশক আগে আর এক প্রধানমন্ত্রী অন্য রকম ভাবিয়াছিলেন। ভাবিতে পারিয়াছিলেন। ১৯৯৪ সালে নরসিংহ রাও মান্ধাতা আমলের ইস্কো হইতে সরকারকে সরাইয়া লইবার জন্য বিলগ্নিকরণে উদ্যোগী হইয়াছিলেন। কিন্তু প্রথমে শ্রমিক সংগঠন এবং পরে তাঁহার আপন দল সহ বিবিধ রাজনৈতিক দলের প্রবল বাধায় তিনি দ্রুত পশ্চাদপসরণ করেন, ‘মধ্যপন্থা’ নামক আপস শুরু হয়। লক্ষণীয়, অটলবিহারী বাজপেয়ীর এনডিএ সরকারও ইস্কোর বিলগ্নিকরণের চেষ্টা করিয়াছিল, কিন্তু প্রধানত কংগ্রেসের বাধায় নিরস্ত হয়। বাজপেয়ীর নেতৃত্বেই বিলগ্নিকরণের মাধ্যমে অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা সংকোচনের উদ্যোগে একটি যথার্থ নীতিগত সংস্কারের পথে কিছুটা অগ্রসর হওয়া গিয়াছিল, সেই প্রথম, সেই শেষ। গত এক বছরে মোদী বুঝাইয়া দিয়াছেন, মার্গারেট থ্যাচার দূরস্থান, তিনি অটলবিহারীও নহেন। অতএব সরকারি কোষাগারের বিপুল বদান্যতায় ইস্কোর পুনরুত্থানে তিনি পরম আহ্লাদিত। রাষ্ট্রবাদীর পরিচিত আহ্লাদ।
রাষ্ট্রবাদের ঠুলিটি চোখ হইতে খুলিলেই সহজ সত্যটি উন্মোচিত হয়: ইস্কোর পুনর্জন্ম নয়, অনেক আগেই প্রয়োজন ছিল তাহার স্বাভাবিক মৃত্যুর। কালক্রমে ইস্পাতের বাজার এবং প্রযুক্তি আমূল বদলাইয়া গিয়াছে, সেই বাজারে প্রতিযোগিতার সামর্থ্য ইস্কো বহুকাল আগেই হারাইয়াছে, জোর করিয়া ‘সেল’-এর অঙ্গীভূত করিয়া তাহাকে বাঁচাইয়া রাখার সিদ্ধান্তটি অর্থনীতির যুক্তির সম্পূর্ণ প্রতিকূল ছিল। বিপুল সরকারি অর্থ ঢালিয়া তাহাকে নূতন করিয়া চালাইবার উদ্যোগটি দ্বিগুণ অযৌক্তিক। বস্তুত, এই বিনিয়োগ কতটা লাভজনক, সেই প্রশ্ন আজ গৌণ। ২০১৫ সালে দাঁড়াইয়া মুখ্য প্রশ্ন একটিই: সরকার কেন ইস্পাতের কারখানা চালাইবে? কোনও প্রাচীন কারখানার যদি কোনও ভবিষ্যত্ থাকে, তাহা একমাত্র প্রতিযোগিতার বাজারেই যাচাই করা চলে, এবং সে জন্য সর্বাগ্রে তাহার মালিকানা ও পরিচালনা হইতে সরকারের সরিয়া দাঁড়ানো দরকার। ইহাই সংস্কারের মৌলিক শর্ত। কিন্তু ভারতীয় নীতিকাররা এই শর্ত পালনে নারাজ, কারণ তাহাতে সংগঠিত ক্ষুদ্রস্বার্থে আঘাত লাগে। ইস্কোর ক্ষেত্রেও ঠিক তাহাই হইয়াছে। তাহার সম্পর্কে কঠোর যুক্তিসম্মত সিদ্ধান্ত লইলে প্রকল্পের শ্রমিক-কর্মীদের সমস্যা হইত। অতএব, শেষ বিচারে, সেই নিতান্ত সীমিত গোষ্ঠীস্বার্থের পায়ে বৃহত্তর উন্নয়নের স্বার্থকে বলি দেওয়া হইল। জনকল্যাণের নামে রাষ্ট্রায়ত্ত শ্বেতহস্তী পুষিবার সমাজতান্ত্রিক অপরাধ পুনরাবৃত্ত হইল। আজ বার্নপুরে মহাসমারোহে সেই বিভ্রান্তির জয়পতাকা উড়িবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও করতালি দিবেন। স্বভাবতই।