গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
দিন-রাত এক করে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন রাজস্থানের প্রদীপ মাহিচ। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছিল ২১ বছরের ওই তরুণের। প্রথম দু’বার সফল না হওয়ায় এই বছর তাঁর লড়াই ছিল মরণ-বাঁচন। আর সেখানেই প্রশ্নফাঁসের ঘটনা তাঁকে হতাশ করল। প্রদীপ বেছে নিলেন আত্মহননের পথ।
৩ মে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি আয়োজন করে নিট ইউজি-র। কিন্তু ১২ মে কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেন নতুন করে পরীক্ষা দিতে হবে। আগের পরীক্ষার বাতিল। প্রদীপের মতো আত্মহননের পথ বেছে নেন আকাঙ্ক্ষা নামে আর এক পরীক্ষার্থীও। শেষ চিঠিতে তিনি জানিয়ে যান, ফের পরীক্ষা দেওয়ার মতো সাহস তাঁর নেই।
তবে, শুধু ২০২৬-ই নয়, প্রশ্নফাঁস বিতর্কে ২০২৪-এও মুখ পুড়েছে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি-র (এনটিএ)। তার আগে ২০১৫-তে অল ইন্ডিয়া প্রি মেডিক্যাল টেস্ট-এ প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছিল। সবর্ভারতীয় স্তরের মেডিক্যাল প্রবেশিকা সে বার বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল।
একটি প্রশ্নপত্র সুরক্ষিত রাখা কি এতটাই কঠিন? প্রশ্ন তুলেছেন আত্মঘাতী পড়ুয়াদের বাবা মায়েরা। ঘটনার তদন্তে উঠে এসেছে রাজস্থান, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র এবং কেরল জুড়ে ডাক্তারি পড়ুয়া, দালাল, কোচিং অপারেটর এবং প্রশ্নপত্র সরবরাহের সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের হদিশও। ওই চক্রই সমাজমাধ্যমকে ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র হাতে হাতে পৌঁছে দিয়েছিল।
সর্বভারতীয় স্তরের পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস
২০১২-তে প্রথম রেলওয়ে রিক্রুটমেন্ট বোর্ড-এর পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠে। পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হয়েছিল। অভিযুক্তেরা ওই প্রশ্নপত্রের জন্য দু’লক্ষ থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত দর হেঁকেছিল। পরে সিবিআই এবং স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্সের তদন্তে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়।
২০১৪-এ ফের রেলের গ্রুপ ডি পরীক্ষাতেও একই ঘটনা ঘটে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে প্রশ্নপত্র বিক্রি করার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। পুলিশি তদন্তে জানা গিয়েছিল, রাজস্থান, হরিয়ানা, বিহার, উত্তরপ্রদেশ এবং এই রাজ্য থেকে একটি চক্র ছাপাখানা থেকে প্রশ্নপত্র জোগাড় করে তা হাতে হাতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে।
২০১৭ এসএসসি-র কম্বাইন্ড গ্র্যাজুয়েট লেভেল পরীক্ষা শুরু আগেই প্রশ্নপত্র এবং ‘আনসার কি’-র ছবি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর পর পরীক্ষা হলেও কারচুপি হয়েছিল বলে অভিযোগ। তদন্তের দায়িত্ব নেয় সিবিআই। জানা যায়, নিয়ম বহির্ভূত ভাবে পরীক্ষার্থীদের কম্পিউটারে ঢুকে উত্তর লেখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরে সেই তথ্য মুছে ফেলে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টাও চলেছিল। শীর্ষ আদালতের নির্দেশে সেই পরীক্ষার ফল বাতিল করা হয়। নতুন করে পরীক্ষা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সিবিএসই-কে।
তার এক বছর পরই সিবিএসই-র দশম এবং দ্বাদশের পরীক্ষায় একটি করে বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল। দশমের গণিত এবং দ্বাদশের অর্থনীতির প্রশ্নপত্র হোয়াটসঅ্যাপ-এ ফাঁস করা হয়েছিল। ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছিল দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ওই দু’টি পরীক্ষা নতুন করে নেওয়া হয়েছিল।
রাজ্যস্তরের পরীক্ষায় দুর্নীতি
এ দেশে নজিরবিহীন ঘটনা হিসাবে মধ্যপ্রদেশের ব্যবসায়িক পরীক্ষা মণ্ডল বা ব্যপম কেলেঙ্কারির কথা সর্বজনবিদিত। ওই ঘটনায় আমলা, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীদের হাতযশে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, নামী প্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রবেশিকা পরীক্ষায় দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল ব্যাপমে। ১৯৯০ থেকে চলা ওই চক্রের কুকীর্তির কথা ফাঁস হয় ২০১৩-তে। ওই কেলেঙ্কারির তদন্ত চলাকালীন প্রশ্নফাঁস, ভুয়ো পরীক্ষার্থীর সাহায্যে উত্তর লেখা কিংবা ওএমআর শিট কারচুপির মতো ঘটনার কথা জানা গিয়েছিল।
২০০২ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত মোট ৪৫টি পরীক্ষাতে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। রেল, রাজ্যস্তরের পাবলিক সার্ভিস কমিশন, শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু দ্বাদশের পরীক্ষা— সবেতেই প্রশ্ন বেমালুম ফাঁস হয়েছে। কোথাও জাতীয় স্তরে বাতিল করা হয়েছে পরীক্ষা, আবার কোথাও নতুন করে পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছে।
বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রদেশ ছাড়াও রাজস্থান,বিহার, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, বিহার, মহারাষ্ট্র, অসম, তেলঙ্গানা, ওড়িশা-তে এই ধরনের ঘটনা সব থেকে বেশি ঘটেছে। ওই সব রাজ্যে শিক্ষক, সরকারি কর্মী, আধিকারিক, পুলিশ, কনস্টেবল নিয়োগে পরীক্ষায় বার বার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।
দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার পর এই ধরনের ঘটনার জেরে মানসিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে পরীক্ষার্থীদের। কেউ চাপ সামলাতে না পেরে আত্মঘাতী হয়েছেন, কেউ আবার আস্থা হারিয়েছেন পরীক্ষা ব্যবস্থায়। পরীক্ষার্থীদের পরিশ্রমের কোন মূল্য কেন দেওয়া হয় না? সেই প্রশ্নের উত্তর জানা যায় না কোনও মতেই। সবই তোলা থাকে ইতিহাসের খাতায়।