পরিবারের সঙ্গে অদ্রিজা গণ। ছবি: সংগৃহীত।
জীবনের পরীক্ষায় বাজিমাতের পর স্কুলজীবনের শেষ পরীক্ষাতেও লক্ষ্যভেদ করলেন কর্কট-বিজয়িনী অদ্রিজা গণ। ষষ্ঠ শ্রেণির গণ্ডি পেরোতে না পেরোতেই শরীরে বাসা বেঁধেছিল ক্যানসার। একের পর এক ৮২টি কেমোর ধাক্কা সামলে মারণরোগের থাবা থেকে মুক্তির লড়াই করেছিলেন টানা চার বছর ধরে।
সেই মেয়েই উচ্চ মাধ্যমিকের মেধাতালিকায় নাম তুললেন প্রথম দশে। প্রথম পর্বের পরীক্ষাতেও মেধাতালিকায় নাম ছিল অদ্রিজার। তৃতীয় সেমেস্টারে ছিলেন নবম। এ বার শতাংশের হারে এগোলেও স্থানাঙ্ক পিছিয়েছে সামান্য। উচ্চ মাধ্যমিকে দশম স্থান পেয়েছেন তিনি। এই তালিকায় অদ্রিজার সঙ্গেই নাম রয়েছে আরও ১২ জনের। প্রাপ্ত নম্বর ৪৮৭।
অদ্রিজা উচ্চ মাধ্যমিকে পড়েছেন কলা বিভাগে— ভূগোল, অর্থনীতি, কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন এবং মনোবিদ্যা ছিল পছন্দের তালিকায়। রামকৃষ্ণ সারদা মিশন সিস্টার নিবেদিতা গার্লস স্কুল থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা দিয়েছেন। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পরিবারের সঙ্গে স্কুলও পাশে থেকেছে। শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ভাবেও যুদ্ধে জিততে হয়েছে অদ্রিজাকে।
তিনি জানেন মানসিক লড়াই আদতে সবচেয়ে কঠিন। তাই অন্যদের পাশে দাঁড়াতে চান তিনি। অদ্রিজা নিজে পড়াশোনা করতে চান ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি নিয়ে। তাঁর ইচ্ছে বেথুন কলেজ থেকে স্নাতক পড়ার। তবে ভবিষ্যতে প্রয়োজনে বিদেশ পাড়ি দিতে হতে পারে, জানেন কৃতী। মানুষের আচরণের বৈচিত্র তাঁর আগ্রহের বিষয়।
ষষ্ঠ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার শেষ হওয়ার পরই টি-সেল লিম্ফোমা ধরা পড়েছিল উত্তর ২৪ পরগনার নিমতার বাসিন্দা অদ্রিজার। তড়িঘড়ি শুরু হয় চিকিৎসা। অদ্রিজার শারীরিক অবস্থার কথা জানতে পেরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তার ঠাকুমা। এক দিকে মেয়ে, অন্য দিকে মা— দিশাহারা হয়ে পড়েন অদ্রিজার বাবা জয়মঙ্গল গণ। তিনি নিজে টাকি হাউস গভর্নমেন্ট স্পনসর্ড মাল্টিপারপাস বয়েজ় স্কুলের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক। সে সময় হাল ধরেন অদ্রিজার মা জ্যোতি গণ। বেলঘরিয়া বয়েজ় স্কুলের শিক্ষিকা জ্যোতি একাই লড়াই শুরু করেন মেয়েকে নিয়ে। মেয়েকে মুম্বই নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করিয়ে আনেন তিনি একাই। এ লড়াইয়ে পাশে থেকেছেন মা ও মেয়ের স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও। লাগাতার কেমো, স্কুলের মাতাজি, শিক্ষিকাদের সাহচর্যে, নিয়মিত থেরাপির সাহায্যে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। ২০২১-এ পুরোপুরি রোগমুক্তি ঘটে অদ্রিজার। এখনও প্রতি বছর মুম্বইয়ের হাসপাতালে গিয়ে সমস্ত পরীক্ষানিরীক্ষা করিয়ে আসতে হয় মেয়েকে।