— প্রতীকী চিত্র।
২০২৫ থেকেই কেন্দ্রের তরফে ভোজ্য তেলে রাশ টানার বার্তা দেওয়া হচ্ছিল। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ফের সেই বার্তা দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স্থূলতা রোধ করতে নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসে ভোজ্যতেল ব্যবহারে রাশ টানতে হবে। আর তার পরই রাজ্যের জেলায় জেলায় পৌঁছেছে এক নির্দেশিকা, সেখানে জানানো হয়েছে, মিড-ডে মিল রান্নায় ভোজ্যতেলের ব্যবহার কমাতে হবে।
এ খবর পেয়েই নড়ে বসেছে স্কুলগুলি। অধিকাংশ স্কুলের তরফে জানানো হচ্ছে, নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত মিড-ডে মিল প্রকল্প। এর উপর কম তেলে রান্না করা আদৌ সম্ভব কি না তা বোঝা যাচ্ছে না। শুধু তাই নয়, কত পড়ুয়ার জন্য কতটা তেল ব্যবহার করা হবে, তার কোনও স্পষ্ট উল্লেখ নেই বলেও দাবি।
বিকাশ ভবন সূত্রের খবর, রান্নার গ্যাসের সঙ্কট এখনও পুরোপুরি কাটেনি। এখন স্কুলগুলিতে গ্রীষ্মাবকাশ চলেছে। মিড-ডে মিল বন্ধ। ফলে সমস্যা চোখে পড়ছে না। কিন্তু স্কুল খোলার পর কী হবে, তা নিয়ে যেন এখনই স্কুল কর্তৃপক্ষ সচেতন হন, তা মনে করিয়ে দিতেই এই নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে।
গত মার্চের শেষ থেকেই রাজ্য জুড়ে জ্বালানি সঙ্কটে ভুগেছে মিড-ডে মিল। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে রান্নার গ্যাসের সঙ্কট তৈরি হয়েছিল। সে সময় স্কুল কর্তৃপক্ষ হিমশিম খেয়েছেন জ্বালানি জোগাড় করতে। কোথাও কাঠের জ্বালানি খুঁজে আনতে হয়েছে, রাতারাতি তৈরি হয়েছে মাটির উনুন। আবার কোথাও পডু়য়াদের দেওয়া হয়েছে ডাল সিদ্ধ, কোথাও কেক-বিস্কুট-আপেল।
মে মাসের প্রথম সপ্তাহে হায়দরাবাদের এক সভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জানান, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে দেশবাসীর কিছু বিষয় মেনে চলা উচিত। তার মধ্যে যেমন ছিল ঘরে বসে কাজ করা, গণপরিবহণ ব্যবহার করার মতো নিদান, যাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কম করা যায়। তেমনই তিনি রান্নার গ্যাস নিয়ে সতর্ক হওয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন। স্থূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রান্নার তেল কম ব্যবহারের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন।
কিন্তু বিভিন্ন স্কুলের তরফে অভিযোগ উঠছে, এ ভাবে মিড-ডে মিল চালানো সম্ভবই নয়। দমদমের একটি স্কুলের প্রধানশিক্ষক জানান, তাঁর স্কুলে পড়ুয়াদের সংখ্যার নিরিখে প্রতিদিন প্রায় ২ লিটার ভোজ্যতেল খরচ হয়। তিনি বলেন, “রান্নার গ্যাস সাশ্রয় করতে গিয়ে আমরা খাবার পাত থেকে ডাল বাদ দিয়েছি। কারণ সিদ্ধ হতে সময় লাগে। এখন শুধু ভাত-সব্জি দেওয়া হয়। ফলে রান্নায় তেল তো লাগবেই। এর থেকে কম করে সব্জি রান্না হবে কী করে?”
বিকাশ ভবনের এক আধিকারিক অবশ্য বলেন, “অতিরিক্ত তেল পড়ুয়াদের শরীরের জন্য মোটেই ভাল নয়। কম বয়সীদের মধ্যে স্থূলতার সমস্যা বাড়ছে। তাই তেলের ব্যবহার কমাতে বলা হয়েছে।” তিনি দাবি করেন, এ সবের পাশাপাশি রান্নার গ্যাসের সঙ্কট একেবারে মিটে যায়নি। তাই সে বিষয়েও নজর রাখতে বলা হয়েছে।
দমদমের অন্য একটি স্কুলের প্রধানশিক্ষক তুলে ধরেন জ্বালানি সঙ্কটের অন্য এক চিত্র। তাঁর দাবি, যে মানের চাল দেওয়া হয় মিড-ডে মিলের জন্য, তা রান্না করতে অতিরিক্ত জ্বালানির প্রয়োজন হয়। কারণ সিদ্ধ হতে অনেক সময় নেয়। তিনি বলেন, “অনেক ক্ষণ জলে ভিজিয়ে রাখার পরও ওই মোটা চাল সিদ্ধ হতে চায় না। ফলে জ্বালানি সাশ্রয় করতে গেলে ভাল মানের চাল পাঠাতে হবে সরকারকে। এ ভাবে সব দিকে সাশ্রয় সম্ভব নয়।”
উত্তর ২৪ পরগনার একটি স্কুলের প্রধানশিক্ষক বলেন, ‘‘রান্নায় তেলের ব্যবহার কমাতে বলা হয়েছে। কিন্তু কতজন পড়ুয়ার জন্য কত লিটার তেল ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে কোনও স্পষ্ট উল্লেখ নেই। আসলে এ ভাবে তো রান্না হয় না। তেলের ব্যবহার কমানো প্রয়োজন ঠিকই, কিন্তু এ ভাবে নির্দেশ পাঠালে কর্তৃপক্ষ সমস্যায় পড়েন।”
সূত্রের খবর, তেলের পরিমাপ কতটা হবে তা নির্ধারণ করতে স্কুলশিক্ষা দফতরের তরফে স্বাস্থ্য দফতরের পরামর্শ চাওয়া হয়েছিল গত নভেম্বরে। তবে এখনও রূপরেখা নির্ধারণ করা যায়নি।
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, ‘‘মিড-ডে মিলের বরাদ্দ বৃদ্ধি বিষয়ে আমরা অনেক দিন ধরেই দাবি জানাচ্ছি। তা না করে ব্যায় সঙ্কোচের চেষ্টা করলে ফল উল্টো হবে। শিশুদের পুষ্টির সঙ্গে কোনও আপোস না করাই ভাল।’’
অ্যাডভান্সড সোসাইটি ফর হেডমাস্টার্স অ্যান্ড হেডমিস্ট্রেসেস সংগঠনের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক চন্দন মাইতি বলেন, ‘‘রান্নার তেল তবুও কম করার চেষ্টা করা যেতে পারে, কিন্তু গ্যাসের খরচ কমানো তো সম্ভব নয়। তা হলে কাঠের জ্বালানির উপরে ভরসা করতে হয়। কিন্তু তা হলে তো পরিবেশ দূষণ বাড়বে! ফলে যা ব্যবস্থা করার তা সরকারকেই করতে হবে।’’