প্রতীকী চিত্র।
নাম বিভ্রাট কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। চার বছরের স্নাতক কোর্সে শংসাপত্র দেওয়া হবে কোন শিরোনামে, স্থির করে উঠতে পারছেন না কর্তৃপক্ষ। তৃতীয় বছরে পাশ করে যাওয়া পড়ুয়াদের কোর্সের নাম কী হবে, তা স্থির করতে হবে নতুন করে।
জাতীয় ও রাজ্য শিক্ষানীতিকে মান্যতা দিয়ে ২০২৩ থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক স্তরে শুরু হয়েছিল ‘মাল্টিডিসিপ্লিনারি ডিগ্রি কোর্স’। বলা হয়, কারিকুলাম অ্যান্ড ক্রেডিট ফ্রেমওয়র্ক (সিসিএফ) ২০২২ অনুযায়ী তিন বছর স্নাতক পড়ার পর যাঁরা পড়াশোনা ছেড়ে দেবেন, তাঁদের মাল্টিডিসিপ্লিনারি ডিগ্রি কোর্স-এর শংসাপত্র দেওয়া হবে। চতুর্থ বর্ষে যাঁরা পড়াশোনা করার সুযোগ পাবেন, তাঁরা পড়বেন অনার্স অ্যান্ড অনার্স ইউথ রিসার্চ কোর্স।
এই পদ্ধতি চালু হওয়ার পর ২০২৬-এ প্রথম সমস্যার সম্মুখীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ, এই পদ্ধতির আওতায় এ বছরই প্রথম কোনও পড়ুয়া তৃতীয় বর্ষ উত্তীর্ণ হতে চলেছেন। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরেই— ‘মাল্টিডিসিপ্লিনারি ডিগ্রি কোর্স’ নামে শংসাপত্র দেওয়া হলে পড়ুয়ারা ভবিষ্যতে কোনও সমস্যার সম্মুখীন হবেন না তো?
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরের খবর, সারা দেশে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন নামে চিহ্নিত করা হয়নি স্নাতক কোর্সকে। এমন কোনও নির্দেশিকা নেই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর তরফেও। এমনকি এই নামের স্বীকৃতিও দেয়নি ইউজিসি। ফলে, এই নাম বিভ্রাটে আখেরে সমস্যা পড়তেই পারেন পড়ুয়ারা।
তাই, নতুন নামকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ ঘোষ বলেন, “জাতীয় শিক্ষানীতিতে মালটিডিসিপ্লিনারি ডিগ্রি কোর্স বলে কোনও নামের স্বীকৃতি নেই। রাজ্য বা দেশের অন্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয় এই ধরনের নাম ব্যবহার করেনি। সে ক্ষেত্রে আমাদের পড়ুয়ারা চাকরি বা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারে। তাই এই নাম পরিবর্তন করার কথা ভাবা হচ্ছে।” গত বৃহস্পতিবার সিন্ডিকেটে বিষয়টি উত্থাপন করেন উপাচার্যই। জানান, দ্রুত নতুন নাম ঠিক করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও জাতীয় শিক্ষানীতি মেনে দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। এ জন্য বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষদের নিয়ে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ অনুযায়ী ডিগ্রি কোর্সকে বেশ কিছু পর্যায় বিভক্ত করা হয়েছে। সেখানে প্রত্যেক বছর পড়ুয়ারা ভর্তি হতে পারবেন, প্রতি বছরই ইচ্ছা হলে পড়া ছেড়ে দিতে পারবেন। একে ‘মাল্টিপল এন্ট্রি-এগ্জ়িট’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী, চার বছরের স্নাতক স্তরে ভর্তি হলেও এক বছরের মধ্যে পড়া ছেড়ে দিতে পারেন কোনও পড়ুয়া। তাঁকে সার্টিফিকেট কোর্সের শংসাপত্র দেওয়া হব। দ্বিতীয় বছরে পড়া ছাড়লে দেওয়া হবে ডিপ্লোমা ডিগ্রি। চতুর্থ বছরে যাঁরা পড়াশোনা শেষ করবেন তাঁরা অনার্স এবং অনার্স ইউথ রিসার্চ-এর শংসাপত্র পাবেন।
কিন্তু তৃতীয় বছরে যাঁরা পড়া ছাড়বেন, তাঁরা অনার্সের প্রায় সমতুল পড়াশোনা করলেও অনার্স-এর শংসাপত্র পাবেন না। জাতীয় শিক্ষানীতিতে একে ‘থ্রি ইয়ার বিএ/বিএসসি ডিগ্রি কোর্স’ হিসাবেই চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে অনার্সের উল্লেখ থাকবে না।
কিন্তু ২০২৩-এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই কোর্সটিকেই ‘মাল্টি ডিসিপ্লিনারি ডিগ্রি কোর্স’ হিসাবে চিহ্নিত করে ফেলেছিল। সেই অনুযায়ী, পাস কোর্সের মতো, একাধিক বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন স্নাতক স্তরের পড়ুয়ারা। চলতি বছরই তাঁরা চূড়ান্ত পরীক্ষায় বসবেন। পাশ করলে মিলবে শংসাপত্র।
এ প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার দেবজ্যোতি কোনার বলেন, “স্বশাসিত যে কোনও বিশ্ববিদ্যালয় যে কোনও নামে কোর্স করাতে পারে। সেখানে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু সেই নাম ইউজিসির স্বীকৃত হতে হবে।” দেবজ্যোতির দাবি, স্বীকৃতিহীন কোনও কোর্স করলে, ভবিষ্যতে পড়ুয়াদের উচ্চশিক্ষা বা চাকরি ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
অন্য দিকে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শঙ্করকুমার নাথ বলেন, “আমরা ইউজিসি স্বীকৃত ‘থার্ড ইয়ার ডিগ্রি বিএ/বিএসসি কোর্স’ হিসাবেই চিহ্নিত করছি। তবে এই বর্ষের পড়ুয়ারা চতুর্থ বর্ষে ভর্তি হতে পারবেন না। বরং তাঁরা দু’বছরের স্নাতকোত্তরে ভর্তি হতে পারেন।”
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নাম বিভ্রাট থেকে উঠে আসছে এক নতুন সমস্যার প্রসঙ্গে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, তৃতীয় বর্ষে যাঁরা পাশ করে যাচ্ছেন, তাঁরা কোনও ভাবেই অনার্স শংসাপত্র পাচ্ছেন না। বরং তাঁদের মান্যতা থাকবে অনেকটা পূর্বতন ‘পাস কোর্স’ উত্তীর্ণ স্নাতকের মতো। সে ক্ষেত্রে তাঁরা কোনও ভাবেই স্নাতকোত্তরের জন্য আবেদন করতে পারবেন না। এ দিকে চতুর্থ বর্ষে অনার্স অ্যান্ড অনার্স ইউথ রিসার্চ পড়ানো হবে কলেজগুলিতেই।
নিউ আলিপুরে কলেজের অধ্যক্ষ জয়দীপ ষড়ঙ্গী বলেন, “জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী যাঁরা তৃতীয় বর্ষে পাস করবে তাঁদের তাদের 'অনার্স গ্র্যাজুয়েট' বলা যাবে না। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রেখেছে সেটিও লেখা যাবে না। আশা করব এই সমস্যার সমাধান দ্রুত করবে এই কমিটি।”
সে ক্ষেত্রে কি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তি প্রক্রিয়া বন্ধ রাখবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি?
সংশয়ের অবকাশ রয়ে গিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বক্তব্যেই। এ দিকে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শঙ্করকুমার নাম বলছেন, “তৃতীয় বর্ষে যাঁরা স্নাতক উত্তীর্ণ হবেন, তাঁদের মেধার ভিত্তিতে দু’বছরের স্নাতকোত্তরে ভর্তি নেব আমরা।” অন্য দিকে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য বলছেন, “যাঁরা তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা ছাড়ছেন, তাঁরা তো অনার্স রাখতে পারছেন না। ফলে স্নাতকোত্তরে পড়ার প্রশ্নই উঠছে না।”
যদিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও বলছেন, “এ বছরও স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তি নেওয়া হবে। যাঁরা তৃতীয় বর্ষে পাশ করবেন, তাঁরাই পড়বেন এই কোর্সে। আবার পরের বছর যাঁরা চতুর্থ বছর পাশ করবেন, তাঁরা এক বছরের স্নাতকোত্তর পড়বেন।”