গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
‘ওপারে যে বাংলাদেশ এপারেও সেই বাংলা’, লিখেছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তবু, ‘মাঝখানে নাক উঁচিয়ে আছে’ পাহারা। বাঙালির এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্ম দেশভাগের সত্যকে যাপন করে চলেছে। একই আকাশ, মাটি, নদীর বুক চিরে বসানো হয়েছে কাঁটাতার। সে যন্ত্রণার কাঁটা আজও বাঙালির বুকে বিঁধে রয়েছে।
দেশভাগের ইতিহাস প্রায় ৭৯ বছরের। ১৯৪৭-এর ২০ অগস্ট অখণ্ড বাংলার বিধানসভায় পাশ হয়েছিল বাংলা ভাগের বিল। সে দিনটিকেই ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসাবে পালন করা হবে বলে ঘোষণা করেছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এ বার সাড়ম্বরে উদ্যাপনের নির্দেশিকা জারি হয়েছে নবান্নের তরফে। স্কুল পড়ুয়াদের নিয়ে নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের ইতিহাস সচেতন করে তোলাই এর উদ্দেশ্য বলে জানানো হয়েছে।
২০২৩ থেকে রাজ্যের লোকভবন থেকে এই দিনটি পালন করা হচ্ছে। যদিও সে সময় এই দিনটি পালনের বিরোধিতা করেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিবর্তে তিনি ১ বৈশাখ, অর্থাৎ ১৫ এপ্রিল ‘বাংলা দিবস’ পালন করতে শুরু করেছিলেন। ২০২৬ বিধানসভা ভোটে বদলেছে ক্ষমতার সমীকরণ। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজেপি গঠন করেছে সরকার। তাই এ বার ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালিত হবে মহাসমারোহে। জানা গিয়েছে, ওই দিন কলকাতায় আসবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। পরের দিন, ২১ জুন আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের অনুষ্ঠানেও যোগ দেবেন তিনি।
সূত্রের খবর, সব জেলার সদর দফতরে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই দিবস উদ্যাপনের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। বুধবার এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, জেলাশাসককে চেয়ারপার্সন করে একটি কমিটি তৈরি করতে হবে। সেখানে পুলিশ সুপার, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের জেলা স্কুল পরিদর্শকেরা থাকবেন সদস্য হিসাবে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী এবং আলোচনাসভার মাধ্যমে রাজ্যের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং পরম্পরা তুলে ধরা হবে। পাশাপশি বাংলা ভাগের ইতিহাস সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতনতা করাও এই অনুষ্ঠানের উদ্যেশ্য বলে জানানো হয়েছে।
ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা প্রচার করতে পাঠাগার, সংগ্রহশালা বা সাংস্কৃতিক কোনও প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনের মাধ্যমেও এই দিবস পালন করা হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
যদিও এখনও জেলার স্কুলে স্কুলে প্রস্তুতি শুরু হয়নি। সব জেলা স্কুল পরিদর্শক এখনও নির্দেশিকা হাতে পাননি বলে দাবি করেছেন। বৃহস্পতিবার এক জেলা স্কুল পরিদর্শক জানান, তিনি বর্তমানে পিএমশ্রী পরিদর্শনের কাজে ব্যস্ত। তাই ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’-এর পরিকল্পনা করে উঠতে পারেননি। অন্য আর এক স্কুল পরিদর্শক দাবি করেন, তিনি এখনও ই-মেল পাননি।
যদিও দেশভাগ বিষয়টিকে খুবই সংবেদনশীল বলে মনে করেন শিক্ষকদের একাংশ। অনেকেই মনে করেন, এই দিনটি আনন্দের নয়। বহু মানুষের কাছে বঙ্গ বিভাজন শোকের। সে ক্ষেত্রে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালন করার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট সংযত থাকা দরকার বলে তাঁদের দাবি। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, “যে নির্দেশ এসেছে, তাতে সরকার ঠিক কী চাইছে তা স্পষ্ট নয়। ‘গৌরবজনক ইতিহাস’ বলতে ইতিহাসের ঠিক কোন অংশকে নির্দেশ করা হবে, তা বোঝা যাচ্ছে না। আসলে নবনির্বাচিত সরকার কিছু করে দেখাতে চাইছে। কিন্তু তাতে পড়ুয়াদের কি আখেরে কোনও লাভ হবে?”
মাধ্যমিক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির দক্ষিণ ২৪ পরগনার সম্পাদক অনিমেষ হালদার বলেন, “নবজাগরণ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের বীর বিপ্লবীরা যে সংস্কারমুক্ত, আধুনিক, শোষণমুক্ত সমাজের কথা বলে গিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন, তাকে এই কর্মসূচির মাধ্যমে তুলে ধরা প্রয়োজন।”
অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘের (বিদ্যালয় শাখা) রাজ্যে সাধারণ সম্পাদক বাপি প্রামাণিক বলেন, “এত দিন বঙ্গ বিভাজনের ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। আমরাও চাই মানুষ আসল ইতিহাস জানুক। সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।”