গণতন্ত্রের উৎসবে ভবানীপুর। ছবি: পিটিআই।
প্রথম দফার মতো দ্বিতীয় দফাতেও মোটের উপর নির্বিঘ্নেই মিটছে ভোট। বিকেল সাড়ে ৪টে পর্যন্ত ১৪২টি আসনের কোথাও কোনও বড় রকমের অশান্তির খবর মেলেনি। বিক্ষিপ্ত অশান্তি, গোলমাল অবশ্যই হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পুলিশের চেষ্টায় কিছু ক্ষণের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিকও হয়েছে। শেষ দফায় রাজ্য তথা দেশের নজর ছিল ভবানীপুর কেন্দ্রে। কারণ, যুযুধান দুই প্রার্থী। তৃণমূলনেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আসনে এ বার লড়াই করতে এসেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। গত বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর জেতা বিধানসভা নন্দীগ্রামে লড়াই করতে যান মমতা। ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডে শুভেন্দুর উদ্দেশে তৃণমূলের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান, ‘চোর-চোর’ কটাক্ষের পাল্টা ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনিতে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। কিছু ক্ষণের জন্য উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল ভোটের ভবানীপুর। লাঠিচার্জ করতে হয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে। তার পর আর বিশেষ গন্ডগোল দেখা যায়নি। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়েও তা-ই। আইএসএফ প্রার্থী তথা বিদায়ী বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকীকে দেখে বিক্ষোভ দেখান শাসকদলের কর্মীরা। তবে ওই পর্যন্ত। ভোটের সময় ভাঙড়ের ‘চেনা ছবি’ এ বার দেখা যায়নি। মোটের উপর বিকেল পর্যন্ত নির্বিঘ্নে ভোট হয়েছে ওই বিধানসভায়। হুগলির গোঘাটে কিছু ক্ষণের জন্য অশান্তি হয়েছিল। সেখানেও প্রশাসন, বাহিনীর চেষ্টায় পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গিয়েছে।
ফের গোলমাল বালিতে। মহিলাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠল পুলিশের বিরুদ্ধে।বালি লালাবাবু সায়র রোডে মহিলা তৃণমূল কর্মীদের অভিযোগ, তাঁদের সঙ্গে অভব্য আচরণ করেছে পুলিশ। গন্ডগোলের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান বালি কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী কৈলাশ মিশ্র।পুলিশের ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে তিনি সরব হন।
‘‘পরিবারকে পাশে নিয়ে নাগরিক হিসাবে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকারের প্রয়োগ করলাম। আপনার ভোট নিজে দিন।’’ ভোটদান করে সপরিবার ছবি দিয়ে সমাজমাধ্যমে পোস্ট মন্ত্রী তথা কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের। মন্ত্রীর বাড়িতে রাতে কেন্দ্রীয় বাহিনী তল্লাশি চালিয়েছিল বলে অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রী তথা ভবনীপুরের প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। মমতার বিধানসভার প্রার্থী ফিরহাদ।
সাতগাছিয়া বিধানসভায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর লাঠিতে এক শিশু জখম হয়েছে বলে অভিযোগ। এ নিয়ে উত্তেজনা ১১৬ নম্বর বুথে। শিশুর অভিভাবকদের অভিযোগ, অশান্তি থামাতে গিয়ে তাঁদের পরিবারের খুদে সদস্যকে আঘাত করেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। লাঠিচার্জের সময় জখম হয় সে। ওই নিয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের সঙ্গে তর্কাতর্কিতে জড়ান এলাকার বাসিন্দারা।
তৃণমূল প্রার্থী মিতা বাগের সমর্থনে অ্যাম্বুল্যান্সে চেপে ভোট দিয়ে গেলেন আরামবাগারে তৃণমূল সাংসদ মিতালি বাগ। সোমবার সাংসদের গাড়িতে ভাঙচুর চালানো নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। আরামবাগ মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসা চলছে তাঁর। বুধবার ১৩৯ নম্বর বুথে ভোট দিলেন আরামবাগের তৃণমূল সাংসদ। ভোট দিয়ে বেরিয়ে মিতালি বলেন, ‘‘বিজেপি বাংলার গণতন্ত্রকে হত্যার চেষ্টা করেছিল। আরামবাগে অভিষেকের জনসভায় যাওয়ার পথে আমাকে প্রাণে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল, গাড়িতে হামলা চলেছিল। আমি বেঁচে ফিরেছি। নির্বাচন কমিশন এ বার বলেছিল ভোট শান্তিতে হবে!’’
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তীর ৭৬ নম্বর বুথে ফের উত্তেজনা। পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের লক্ষ্য করে জয় বাংলা স্লোগান তৃণমূলের। ভোটারদেরকে হেনস্থা করার অভিযোগ করা হল কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে। স্থানীয় তৃণমূল নেতা রাজা গাজির বাড়িতে পুলিশি তল্লাশির প্রতিবাদে উত্তপ্ত হয় এলাকা। রাজার বাড়ি থেকে দুই যুবককে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। তাঁদের ছেড়ে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে তৃণমূল। অন্য দিকে, দক্ষিণ ২৪ পরগনারই বকুলতলায় তৃণমূলের শিবিরে ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।
বুথের সামনে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তার প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রার্থীর সামনে ‘আক্রান্ত’ হলেন বিজেপি কর্মীরা। অভিযোগ তৃণমূলের বিরুদ্ধে। ঘটনাস্থল নদিয়ার নবদ্বীপের বাবলারি এলাকা। ৩৩ নম্বর বুথে বিজেপি কর্মীদের মারধর করার অভিযোগ উঠল তৃণমূলের বিরুদ্ধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দু’জনকে আটক করেছে পুলিশ।
ভোট দিয়ে সমাজমাধ্যমে নিজস্বী পোস্ট করলেন দমদম উত্তরের সিপিএম প্রার্থী দীপ্সিতা ধর। ফেসবুকে লিখলেন, ‘‘ভোট দিন বাঁচতে, তারা হাতুড়ি কাস্তে।’’
‘‘আজ ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটদান।’’ ভোটদান করে বেরিয়ে ফেসবুক পোস্ট মহম্মদ সেলিমের।
হুগলির চুঁচুড়া পুরসভার ২৭, ২৮ এবং ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের পর ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে ফরওয়ার্ড ব্লক, বিজেপি এবং তৃণমূলের ক্যাম্প ভাঙার অভিযোগ কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে। ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের ২৫৫ ও ২৫৯ নম্বর বুথে ক্যাম্প অফিসের চেয়ার-টেবিল ভাঙার অভিযোগ উঠেছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে দলীয় পতাকা এবং ভোটার তালিকা ফেলে দেওয়ার অভিযোগ তিনটি দলেরই। তৃণমূল অভিযোগ করে, সতর্ক করেনি কেন্দ্রীয় বাহিনী। আচমকা তাদের শিবির ভেঙে দিয়ে গিয়েছে। তৃণমূল বলছে, এত বছরের ভোটে এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল। নির্বাচন কমিশনের বিধি মেনে নির্দিষ্ট দূরত্বেই শিবির করার পরেও কেন সেটা ভাঙা হল, প্রশ্ন তুলেছে তারা।
গত বিধানসভা ভোটে বুথমুখী হয়েছিলেন, তাঁর বাঁ হাতের আঙুল ধরে ছিল ছোট্ট তমন্না। সেই ভরসাটুকুই ছিল সাবিনা ইয়াসমিনের পৃথিবী। উপনির্বাচনে হিংসা অকস্মাৎ কেড়ে নিয়েছে মেয়েকে। মা আজ কালীগঞ্জের সিপিএম প্রার্থী। ভোট দিয়ে বেরিয়ে ভোটের কালি মাখা আঙুল তুলেই গলা ধরে এল সাবিনার। তিনি বলেন, ‘‘আগের বার মেয়ের হাত ধরে ভোট দিতে গিয়েছিলাম। আজ ও নেই। শুধু ওর স্মৃতিটুকু সম্বল করে লড়াইয়ে নেমেছি।’’ ২০২৪ সালের ২৩ জুন কখনও ভুলতে পারবেন না তমন্নার মা। উপনির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বিজয় উৎসবের উল্লাস কেড়ে নিয়েছিল ছোট্ট মেয়ের প্রাণ। বিমান বসু যে মহিলাকে ‘শহিদ-জননী’ বলেছেন, আর মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায় যাঁকে বলেছেন বোনের মতো, সেই সাবিনা জানান, স্মৃতিমেদুর হলেও তিনি লক্ষ্যচ্যুত নন। জয়ের লক্ষ্যে লড়াই করছেন।
—নিজস্ব চিত্র।
ভোট দিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে তর্কাতর্কিতে জড়িয়ে পড়লেন সোনারপুর দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী লাভলি মৈত্র। রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিদ্যাভূষণ বিদ্যাপীঠের ১৪৩ নম্বর বুথে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘প্রথম বার নিজেকে ভোট দিলাম।’’ তবে ভোট দিয়ে বেরিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, বহু ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। ফলে তারা ভোট দিতে পারেননি।পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাহিনী বিজেপির হয়ে কাজ করছে বলেও দাবি তোলেন তৃণমূল প্রার্থী। তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘‘আজকের পর বিজেপির আর কোনও জায়গা থাকবে না।’’
—নিজস্ব চিত্র।
জয় হিন্দ ভবনের সামনের রাস্তার দখল নিল কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পুলিশ। তৃণমূল এবং বিজেপির স্লোগান-যুদ্ধে উত্তেজনা ছড়ায়। সেখান থেকে শুভেন্দু বলেন, ‘‘ভবানীপুর ভদ্রলোকদের জায়গা। ছোটলোকদের স্থান নেই। যারা এগুলো করছে, ভাল করছে। আমার ভোট আরও বাড়বে।’’ অন্য দিকে, ভবানীপুরের তৃণমূল প্রার্থী তথা বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতার ভ্রাতৃবধূ তথা স্থানীয় কাউন্সিলর কাজরী বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, অশান্তিতে প্ররোচনা দিয়েছেন শুভেন্দুই। তিনি ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন। অন্য দিকে, পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনীর লাঠিচার্জে বেশ কয়েক জন জখম হয়েছেন।
মধ্য হাওড়ার বিধানসভা কেন্দ্রে নরসিংহ বোস লেন এলাকায় ধারালো অস্ত্র হাতে এক যুবককে ঘুরতে দেখা যায়। ভাইরাল হয় ভিডিয়ো (ওই ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম)। তৃণমূলের অভিযোগ, ওই যুবক এলাকার বাসিন্দাদের বিজেপিতে ভোট দিতে বলছিলেন। অস্ত্র হাতে ভোটারদের ভয় দেখাচ্ছিলেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় শিবপুর থানার পুলিশ। ওই যুবককে আটক করেছে তারা। উদ্ধার হয়েছে ধারালো অস্ত্রটিও। যুবকের পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে। তবে তৃণমূলের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে বিজেপি।
শুভেন্দু যখন পটুয়াখালি পাড়া থেকে নিজের গাড়ির দিকে আসছিলেন তখন কাজরীর মুখোমুখি হন। উত্তেজনার পারদ চড়ে। তৃণমূল এবং বিজেপির স্লোগান-যুদ্ধে উত্তপ্ত কালীঘাটের জয় হিন্দ ভবন চত্বর।
৭৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভ্রাতৃবধূ কাজরী বন্দ্যোপাধ্যায়। গন্ডগোলের সময় তাঁর নেতৃত্বে তৃণমূলের কর্মী-সমর্থক ‘জয় বাংলা’ বলতে এগিয়ে যান শুভেন্দুদের দিকে। অন্য দিক থেকে ভেসে আসে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টায় পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী।
এই গন্ডগোলের প্রাক্মুহূর্তে শুভেন্দু দাবি করেন, ভবানীপুরে যা ভোট পড়ছে, তাতে তিনি আত্মবিশ্বাসী। বিরোধী দলনেতার কথায়, ‘‘ভবানীপুরে ৮০ শতাংশ ভোট পড়তে পারে। তেমন ভোট পড়লে আমি জিতব। ৯০ শতাংশ ভোট পড়লে আমি বড় ব্যবধানে জিতব।’’
জয় হিন্দ ভবনের সামনে উত্তেজনা তুঙ্গে। কেন্দ্রীয় বাহিনী লাঠিচার্জ শুরু করে। বিক্ষোভকারীদের দিকে দৌড়ে যেতে দেখা যায় শুভেন্দুকে।
কালীঘাটে যেতেই শুভেন্দু অধিকারীকে ‘চোর-চোর’ স্লোগান দিতে থাকলেন তৃণমূল কর্মী-সমর্থকেরা। কনভয় আটকে যায়। কালীঘাট রোড এবং হরিশ মুখার্জি রোডের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে শুভেন্দু অভিযোগ করেন, তাঁর উপর বহিরাগতেরা আক্রমণ করছেন। তিনি ফোন করে সিআরপিএফকে আসতে বলেন। পাল্টা তৃণমূল কাউন্সিলর তথা মমতার ভ্রাতৃবধূ কাজরী বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন মিথ্যা কথা বলছেন শুভেন্দু। তিনি প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন ভোটারদের। এর মধ্যে বাহিনী পৌঁছোয়। শুরু হয় লাঠিচার্জ।
গন্ডগোলের আগে তৃণমূলের বিরুদ্ধে শুভেন্দু অভিযোগ করছেন।
সকাল থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে কলকাতায়। তবে ভোটদানে বিরতি নেই। ভবানীপুর বিধানসভা এলাকার বুথে বুথে ঘুরেছেন বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। ছাতা মাথায় দিয়ে ঘোরেন রাস্তায়। তিনি দুপুরে চলে যান মিত্র ইনস্টিটিউশনে। তাঁর কথায়, ‘‘এই বুথেও আমি জিতব।’’