— প্রতীকী চিত্র।
সবুজ মাঠের মাঝ বরাবর কাঁটাতার। চাষজমির সঙ্গে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলতে খেলতে এগিয়ে গিয়েছে। এক মানুষ সমান উঁচু কাঁটাতারের বেড়া কোথাও আছে, কোথাও দু’দেশের সীমানা-চিহ্ন বলতে মাথা উঁচিয়ে থাকা সাদা রঙের একটি থাম (পিলার)। মালদহের বৈষ্ণবনগরের শুকদেবপুরে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কড়া নজরে থাকা কাঁটাতারহীন ফাঁকা অংশের দিকে তাকিয়ে অশীতিপর বৃদ্ধ গলা চড়ালেন। আঙুল উঁচিয়ে বলতে শুরু করলেন, ‘‘বেড়া না থাকায় এ পার-ও পারের কারবারের ঝক্কি কম পোহাতে হয়নি! দিনকাল বদলেছে। তবে সব বন্ধ হয়েছে, তেমন নিশ্চয়তা কে দেবে?’’
বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা বৈষ্ণবনগরের মতো জেলার কাঁটাতারবিহীন এমন অংশ ঘিরে চোরাচালান, দুষ্কৃতী-দৌরাত্ম্যের মতো অভিযোগ ঘুরেফিরে আসে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে অনুপ্রবেশের অভিযোগ। বিজেপি অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গকে হাতিয়ার করেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। রাজ্যের শাসকদল আবার সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় বাহিনী বিএসএফের ভূমিকার দিকে আঙুল তুলছে। অনুপ্রবেশ নিয়ে চর্চায় কার্যত ঢাকা পড়ে গিয়েছে এলাকার বাস্তব সমস্যাগুলি। চাঁচল, হরিশ্চন্দ্রপুর, গাজল, বৈষ্ণবনগর বিধানসভা এলাকার বাসিন্দাদের মুখে অনুন্নয়ন, বেহাল চিকিৎসা ব্যবস্থা, গঙ্গার ভাঙন থেকে শুরু করে বেকারত্ব, পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা ফিরলেও, তা রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের প্রচারে হালে বিশেষ পানি পাচ্ছে না।
২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গের বিজেপি-হাওয়া থমকে গিয়েছিল মালদহে। জেলার ১২টির মধ্যে আটটি আসনই গিয়েছিল তৃণমূলের ঝুলিতে। চারটি বিধানসভা কেন্দ্রে জেতে বিজেপি। মেরুকরণও খানিক স্পষ্ট হয়েছিল। নিজেদের এক সময়ের ‘গড়’ মালদহে খাতাই খুলতে পারেনি কংগ্রেস। কংগ্রেসের সঙ্গে জোটে বামেদের আসন ছিল শূন্য।
২০২৪-এর লোকসভা ভোটে অবশ্য পরিস্থিতি বদলায়। জেলার দু’টি লোকসভা আসনের মধ্যে উত্তরে বিজেপি জেতে। দক্ষিণে কংগ্রেস। তবে এ বার কংগ্রেসের শিবিরে ফিরেছেন রাজ্যসভার সাংসদ মৌসম বেনজির নুর। প্রার্থী নিয়ে দলের অন্দরের কোন্দল অবশ্য জেলা কংগ্রেসকে নিশ্চিন্ত হতে দিচ্ছে না। জেলা কংগ্রেসের নেতা ভূপেন্দ্রনাথ হালদার যদিও বলছেন, ‘‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় বহু নাম বাদ গিয়েছে। ফলে, জেলার একাধিক আসনে ব্যবধান হয়তো কমবে। কিন্তু আমাদের জয় কেউ আটকাতে পারবে না।’’
প্রার্থী নিয়ে চোরা স্রোত রয়েছে তৃণমূলের অন্দরেও। জেলার একাধিক কেন্দ্রের বিদায়ী বিধায়কদের এ বার টিকিট দেয়নি শাসকদল। তবে বৈষ্ণবনগর বিধানসভা কেন্দ্রে বিদায়ী বিধায়ক চন্দনা সরকারকে এ বারেও প্রার্থী করা হয়েছে। চন্দনা গত পাঁচ বছরে ‘সব করে দেওয়ার’ দাবি নিয়েই এলাকায় ঘুরছেন। যদিও তাঁর বিধানসভা এলাকায় ঘুরলে দাবির সঙ্গে ছবি মিলছে না। জাতীয় সড়ক থেকে গলিতে নামলেই কাঁচা বাড়ি আর নখ-দাঁত বার করা রাস্তা ঘিরে ধরছে। অভিযোগ রয়েছে স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়েও।
বীরনগর-১ পঞ্চায়েতে গঙ্গার ভাঙন আর বন্যা নিয়ন্ত্রণে বিধায়কের সদিচ্ছা নিয়ে প্রচার করছেন বিজেপি প্রার্থী রাজু কর্মকার। কিন্তু তার চেয়ে বেশি উচ্চগ্রামে রয়েছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে বেআইনি অনুপ্রবেশকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ। সমস্যা মেনে নিয়েও কেন্দ্রের দিকে আঙুল তুলে প্রচার চালাচ্ছেন চন্দনা। বলছেন, ‘‘গঙ্গার ভাঙন, সীমান্ত রক্ষা কেন্দ্রের বিষয়। আমাদের যেটুকু করার, তার সবই প্রায় করে দিয়েছি।’’
মালদহ শহর থেকে ৫০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরের তিন কেন্দ্র গাজল, হরিশ্চন্দ্রপুর এবং চাঁচল। বিশেষ নিবিড় সংশোধনে গ্রামীণ এলাকার এই বিধানসভা কেন্দ্রগুলি থেকে ব্যাপক হারে নাম বাদ পড়া যেমন বিজেপিকে অস্বস্তিতে ফেলছে, তেমনই তৃণমূলকে চাপে রাখছে গাজল এবং চাঁচলে পুরসভা না হওয়া।
চাঁচল কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী করেছে প্রাক্তন পুলিশকর্তা প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কংগ্রেসের প্রার্থী আসিফ মেহবুব। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকেও তৃণমূলের চাঁচলকে পুরসভা করতে না পারাই প্রচারে হাতিয়ার করেছে কংগ্রেস। বিরোধী প্রচারে আসছে কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ।
ঝাড়খণ্ড সীমানা ঘেঁষা হরিশ্চন্দ্রপুরের হাটখোলায় চায়ের দোকানে বসা গৌতম দাস বললেন, ‘‘পাশের বিধানসভা কেন্দ্র চাঁচলে একটি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল হয়েছে। কিন্তু সে হাসপাতালে গেলেই রেফার করে দেয়। রেফার-রোগে আক্রান্ত। বড় কিছু হলে ৮০ কিলোমিটার দূরে মালদহ মেডিক্যাল কলেজই ভরসা। গাড়ি ভাড়া দিতেই চিকিৎসার টাকা ফুরিয়ে যায়।’’
২০২১ সালে হরিশ্চন্দ্রপুর ছিল তৃণমূলের দখলে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার সম্ভাবনা আঁচ করে গত বার জয়ী প্রাক্তন মন্ত্রী তজমুল হোসেনকে প্রার্থী করেনি তৃণমূল। তজমুল বলছেন, ‘‘দল যা ঠিক মনে করেছে, তা-ই করেছে। এর বেশি এ নিয়ে বলার কিছু নেই।’’ তৃণমূলের এ বারের প্রার্থী মতিবুর রহমান বিলাসবহুল গাড়ি চেপে গ্রামের রাস্তায় ঘুরে প্রচার করে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ‘গরিবের হাসপাতাল’ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তবে দলেরই একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির হয়ে হরিশ্চন্দ্রপুরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যাওয়া মতিবুরকে তৃণমূলের ‘আদি’ গোষ্ঠী এ বার প্রার্থী হিসাবে কতটা মানছেন, তা না আঁচানো পর্যন্ত বিশ্বাস করা যাচ্ছে না।
ওই এলাকায় বিজেপির প্রার্থী, প্রাক্তন সেনাকর্মী রতন দাস অনুন্নয়নের বদলে প্রচারে অনুপ্রবেশের সমস্যা প্রচারেই বেশি বিশ্বাসী। সিপিএম প্রার্থী শেখ খলিল বলেন, ‘‘অনুপ্রবেশের থেকে অনুন্নয়ন গুরুত্বে অনেক বড়।’’
এসআইআর-পর্বে মালদহে নাম বাদ পড়েছে বিস্তর। বিজেপি সেখানে বলছে, তৃণমূল মানুষকে খেপিয়ে প্রতিবাদ করতে বাধ্য করছে। গাজল বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী চিন্ময় দেববর্মণ বলছেন, ‘‘স্বাধীনতার পর থেকে মালদহে অনুপ্রবেশ ঘটে চলেছে। রাজ্য সরকার ও স্থানীয় নেতারা এই অনুপ্রবেশকারীদের এ দেশে রেখে ভোট-ব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করেছেন বছরের পর বছর। জমি-জটে সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়ার কাজও আটকে দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতায় এলে অনুপ্রবেশ রুখতে যা যা পদক্ষেপ করার করব।’’
তা হলে অনুন্নয়ন প্রসঙ্গের কী হবে? বিজেপির জেলা নেতা শ্যামচাঁদ ঘোষ বলছেন, ‘‘আমরা বলছি তো। কিন্তু আগে অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গ।’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে