রক্তিম শুভেচ্ছা। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকের খাসতালুক নারায়ণগড়ে সভায় লাল গোলাপে অভ্যর্থনা মমতাকে। — সৌমেশ্বর মণ্ডল।
ঝাড়গ্রাম শহরে সব্জি বেচেন এক মহিলা। গত সোমবার, জঙ্গলমহলে ভোটের দিন একটি বুথে সিপিএমের পোলিং এজেন্ট ছিলেন তাঁর ছেলে। অভিযোগ, ভোট মিটতেই তৃণমূলের ছেলেরা শাসিয়ে গিয়েছে, এই বেয়াদপির জন্য তাঁর ছেলেকে ‘শাস্তি’ পেতে হবে। কান ধরে ওঠ-বোস, সঙ্গে আর্থিক জরিমানা।
কবে বিচারসভা বসবে সেই আশঙ্কায় কাঁটা হয়ে আছেন ওই মহিলা। ভয়ে পুলিশে জাননি। তাঁর কথায়, “তাহলে ব্যবসাপাতি বন্ধ করে এলাকা ছাড়া হতে হবে।” ঝাড়গ্রাম শহরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের এক সিপিএম সমর্থকেরও অভিযোগ, “বাড়ি এসে শাসক দলের লোকেরা হুমকি দিয়ে গিয়েছে, এলাকার বুথে তৃণমূলের ভোট কম হলে আমাদের কপালে দুঃখ আছে।”
রাজ্যের প্রথম দফা ভোটের পরে জঙ্গলমহলের সর্বত্রই কার্যত এমন ছবি। বিরোধী সমর্থকদের ধমকানো হচ্ছে বলে অভিযোগ। নানা ভাবে হেনস্থাও করা হচ্ছে। ভোটের দিন তৃণমূলের ক্যাম্প থেকে বিলি করা মুড়ির প্যাকেট না নেওয়ায় ঝাড়গ্রামের ডালকাটি গ্রামের লোধাপাড়ার বাসিন্দাদের তো জল পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। গোপীবল্লভপুর বিধানসভার অন্তর্গত ওই এলাকার একমাত্র নলকূপটি শিকল দিয়ে তালাবন্ধ করে রাখার অভিযোগ উঠেছিল তৃণমূলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। টানা দু’দিন নির্জলা থাকার পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সেই শিকল খুলেছে। তবে ঝাড়গ্রাম বিধানসভার মানিকপাড়া অঞ্চলের কালাঝরিয়া গ্রামে লোধা-শবর পরিবারের বাস। এই গ্রামে জলপ্রকল্পের সাব মার্সিবল পাম্পটি কয়েক মাস আগে চুরি গিয়েছে। বাসিন্দারা সিপিএম সমর্থক হওয়ায় নতুন করে পাম্প বসানো হয়নি। ফলে গত কয়েক মাস ধরে জল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এ বারও ভোটের দিন তৃণমূলের লোকেরা শাসিয়ে বলেছিলেন, ভোট তৃণমূলকে দিলে তবেই জল মিলবে। প্রবল গরমে এলাকায় পাতকুয়ো শুকিয়ে গিয়ে পানীয় জল অমিল। অভিযোগ, ভোটপর্ব মেটার পরে এখন তৃণমূলের লোকেরা শাসানি দিয়ে বলছেন, ‘ভোট যখন জোটের প্রার্থীকে দিয়েছিস, তখন জল ওরাই দেবে। পাম্প আর বসবে না।’ কালাঝরিয়ার বাসিন্দারা বাধ্য হয়ে এখন খালের জল ব্যবহার করছেন।
শাসক দলের এই অসহিষ্ণু আচরণে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে বিরোধী শিবিরে। প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগে এ ভাবে শাসক দলের লোকজন কেন আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছেন। ভোটের ফল বেরোলে এরপর কী হবে? কে, কাকে ভোট দিয়েছেন, সেটা সুর্দিষ্ট ভাবে কখনই জানা সম্ভব নয়। কিন্তু বিনপুর বিধানসভার হাড়দা এলাকার একটি বুথে তৃণমূল কত ভোট পাবে সেটা কাগজে লিখে এলাকার দেওয়ালে সাঁটিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ সব দেখে শুনে ত্রস্ত হয়ে পড়ছেন বাসিন্দারা। এই যেমন ঝাড়গ্রাম বিধানসভার সাপধরা এলাকার এক বৃদ্ধ দম্পত্তি দিনমজুরি করে সংসার চালান। ভোটের প্রচারে এসে শাসক দলের কর্মীরা জানিয়েছিলেন, জোড়াফুলে ছাপ না দিলে দু’টাকা কিলো দরে চাল পাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। ওই বৃদ্ধাও তখন পাল্টা আক্ষেপ করে শাসক দলের কর্মীদের জানিয়েছিলেন, ভাঙা কুঁড়ে ঘরে থেকে রোদ-বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচানো যায় না। তৃণমূলকে ভোট দিয়েও পাঁচ বছরে সরকারি প্রকল্পে একটা বাড়ি পাননি তিনি। অথচ যাঁদের বাড়ি আছে, তাঁরাই বাড়ি তৈরির টাকা পেয়েছেন। ভোটের পরে এখন ওই বৃদ্ধাকে শাসানো হচ্ছে। ওই বৃদ্ধার কথায়, “তৃণমূলের লোকেরা বলছে আমি নাকি এবার বিরোধী জোটকে ভোট দিয়েছি। তাই আমার কুঁড়ে ঘরে ভাঙচুর করা হবে বলে শাসানো হচ্ছে। ভাঙলে ভাঙবে। কার কাছে আর নালিশ
জানাতে যাব।”
ইতিমধ্যে গোপীবল্লভপুর বিধানসভার তভাবনি ও আমদাপালে সিপিএম সমর্থকদের মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ। নয়াগ্রাম বিধানসভার খড়িকামাথানি অঞ্চলের একটি গ্রামে তৃণমূলের হুমকির জেরে বিজেপি সমর্থক এক পান-গুমটির মালিক তাঁর দোকানটি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ।
সিপিএমের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য ডহরেশ্বর সেন বলেন, “তৃণমূল বুঝতে পারছে মানুষ আর ওদের সঙ্গে নেই। সেই কারণেই ওরা বিভিন্ন এলাকায় সীমাহীন সন্ত্রাস শুরু করেছে।” ঝাড়গ্রাম জেলা কংগ্রেসের নেতা তাপস মাহাতো বলেন, “সাধারণ মানুষ তৃণমূলের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তৃণমূলের পায়ের তলায় মাটি সরছে। ফলে ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছে শাসক দল।”
তৃণমূলের ঝাড়গ্রাম জেলা সভাপতি চূড়ামণি মাহাতো বলেন, “সব মিথ্যা অভিযোগ। তৃণমূলকে কালিমালিপ্ত করার জন্য কংগ্রেস-সিপিএম-বিজেপি আর সংবাদমাধ্যমের একাংশ মিলে ধারাবাহিক অপপ্রচারে নেমেছে। ভোটের ফল বেরনোর পরে তখন
কী করবেন?”
বিরোধীদের এমন সব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঝাড়গ্রামের এসপি সুখেন্দু হীরা বলেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”