BJP’s Candidate List

বিজেপির একমাত্র জয়ী ‘বিশিষ্ট মুখ’ টিকিটই পেলেন না নিজের আসনে! প্রস্থানের পথে অশোক, ‘সম্মানজনক পুনর্বাসনের’ খোঁজ

২০২১ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারেনি। প্রার্থী তালিকার ‘বিশিষ্ট মুখেরা’ জিততেও পারেননি। একমাত্র অশোক লাহিড়ী-ই জিতেছিলেন। দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট আসন থেকে। কিন্তু পাঁচ বছর পর তিনিই সর্বাগ্রে ব্রাত্য হয়ে গেলেন।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৬ মার্চ ২০২৬ ২৩:৪৩
Share:

(বাঁ দিকে) নরেন্দ্র মোদী, অশোক লাহিড়ী (মাঝে) এবং অমিত শাহ (ডান দিকে)। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

পাঁচ বছর আগে তিনি বিজেপির কাছে সম্ভবত ‘ধর্মাশোক’ ছিলেন। এখন কি ‘চণ্ডাশোক’ হয়ে গিয়েছেন? তা-ও আবার কোনও প্রকট অথবা যুক্তিগ্রাহ্য কারণ ছাড়াই? প্রশ্নটা ঘোরেফেরা করছে বিজেপির অন্দরমহলেই।

Advertisement

বিজেপির প্রার্থী তালিকা তখনও প্রকাশিত হয়নি। ঘণ্টাদুয়েক বাদেই যে ১৪৪টি আসনের জন্য তালিকা ঘোষিত হতে চলেছে, অশোক লাহিড়ী তখনও তা জানেন না। প্রকাশিতব্য তালিকায় তাঁর আসনে যে অন্য কারও নাম ঢুকে পড়েছে, প্রবীণ অর্থনীতিবিদ সে কথা নিশ্চিত জানতেন কি না, বলা কঠিন। তবে তাঁর নাম সরানোর জন্য ‘কলকাঠি’ নাড়াচাড়া যে চলছে, সে আভাস এবং তথ্য তাঁর কাছে ছিল। তা নিয়ে কি তিনি উদ্বিগ্ন বা ক্ষুণ্ণ ছিলেন? সোমবার বেলা আড়াইটে নাগাদ বিধাননগরের বিজেপি দফতরে যখন সাংবাদিক বৈঠক করতে এলেন অশোক, তখন মুখেচোখে উদ্বেগ বা ক্ষোভের লেশমাত্র নেই। স্বভাবসিদ্ধ সুস্থির ভঙ্গিতেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তীক্ষ্ণ কটাক্ষে বিঁধলেন। রাজ্য সরকারের আর্থিক কাজ-কারবারকে গুরুতর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করালেন। তবে কাজ মেটার পরে বিজেপি দফতরে আর বেশি ক্ষণ কাটালেন না। সম্ভবত দিল্লি রওনা হওয়ার প্রস্তুতিও শুরু করে দিলেন।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাংশের ধারণা হয়েছিল যে, পশ্চিমবঙ্গে তাঁরা ক্ষমতায় আসতে চলেছেন। তাই মন্ত্রিসভা গঠনের কথা মাথায় রেখে ঘুঁটি তথা প্রার্থী সাজাতে শুরু করেছিলেন। শুধু অশোকের মতো অর্থনীতিবিদ নন, গোবর্ধন দাসের মতো বিজ্ঞানী, স্বপন দাশগুপ্ত বা অনির্বাণ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো সুশীল মুখ, অম্বুজাক্ষ মহান্তির মতো শিক্ষাবিদদের রাখা হয়েছিল প্রার্থী তালিকায়। মন্ত্রিসভায় প্রত্যেকের জন্যই গুরুদায়িত্ব ভেবে রাখা হয়েছিল। বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারেনি। আর প্রার্থী তালিকার এই ‘বিশিষ্ট মুখেরা’ জিততেও পারেননি। একমাত্র অশোকই জিতেছিলেন। দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট আসন থেকে। কিন্তু পাঁচ বছর পর তিনিই সর্বাগ্রে ব্রাত্য হয়ে গেলেন বিজেপির প্রার্থী তালিকায়। বিজেপির প্রথম তালিকাতেই অশোকের আসন বালুরঘাটের প্রার্থীর নাম ঘোষিত হল। বিদায়ী বিধায়কের বদলে প্রার্থী করা হল স্থানীয় এক আইনজীবীকে।

Advertisement

অশোকের টিকিট না-পাওয়া রাজ্যের রাজনৈতিক শিবিরে বিস্ময় তো তৈরি করেছেই, বিজেপির অন্দরেও অনেকে অবাক হয়েছেন। বালুরঘাট থেকে অশোককে সরানোর চেষ্টা যে চলছে, সে বিষয়ে বিজেপিতে প্রায় সকলেই অবগত ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দিল্লির হস্তক্ষেপে সমস্যা মিটে যাবে বলে অনেকে আশা করেছিলেন। প্রার্থী তালিকা নিয়ে সপ্তাহখানেক আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাসভবনে বিজেপির বৈঠক হয়ে যাওয়ার পর থেকে অশোকের গুণগ্রাহীদের সে আশা অস্তমিত হতে শুরু করে। বাস্তবেও তেমনই ঘটল। তবে পরিস্থিতি এই দিকেই গড়াবে আঁচ করে অর্থনীতিবিদ অশোকের জন্য দিল্লিতে কোনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা খুঁজে বার করার বিষয়ে তদ্বিরও শুরু হয়ে গিয়েছিল কয়েক দিন আগে থেকেই। আপাতত বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তেমন কোনও সরকারি কাজেই অশোকের ‘সম্মানজনক পুনর্বাসন’-এর চেষ্টায়।

কখনও ভারত সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসাবে, কখনও পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের সদস্য হিসাবে কাজ করা অশোক দিল্লি ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে এলেও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ‘বিশেষ সুসম্পর্ক’ বহাল থেকেছে। গত ১৪ মার্চ ব্রিগেড সমাবেশে ভাষণ শেষ করে মঞ্চ থেকে নামার আগে যে ক’জনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদী চোখে পড়ার মতো করে কথা বলেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অশোক। যা সেই ‘বিশেষ সুসম্পর্ক’-তত্ত্বেই সিলমোহর দেয়। তবু অশোক এ বার বালুরঘাটে টিকিট পেলেন না। বিধায়ক হিসাবে কোনও দুর্নীতির অভিযোগ অশোকের বিরুদ্ধে কখনও ওঠেনি। এলাকা উন্নয়ন তহবিল খরচ করতে না-পারা সংক্রান্ত কোনও আলোচনা তাঁকে ঘিরে কখনও শোনা যায়নি। বিধানসভায় কোনও অর্থ বিল নিয়ে আলোচনা থাকলে অশোক ছিলেন বিজেপি পরিষদীয় দলের প্রধান ভরসা। কারণ অর্থনীতিতে অশোকের সমান প্রজ্ঞা পশ্চিমবঙ্গের বিদায়ী বিধানসভায় আর কারও রয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। পরবর্তী বিধানসভাতেও তেমন কারও আসার সম্ভাবনা কমই। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে সরকার গড়তে পারলে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য মুখ কে কে? সে আলোচনাতেও ‘অশোক লাহিড়ী’ নামটা বার বার অনায়াসে উঠে আসে। তবু বিজেপি অশোককে প্রার্থী তালিকায় রাখতে পারল না। রাজ্য নেতাদের কারও কারও অনীহা ছিল তো বটেই। ভূপেন্দ্র যাদব বা সুনীল বনসলদের মতো কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকরাও সে অনীহাকে বদলে দেওয়ার মতো কোনও পরিস্থিতি তৈরি করতে পারলেন না বা চাইলেন না।

বালুরঘাটে অশোক কেন টিকিট পেলেন না, তা নিয়ে বিজেপির অন্দরে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। বালুরঘাটের সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের সঙ্গে অশোকের সম্পর্কের সমীকরণ তাঁর টিকিটপ্রাপ্তির পথে বাধা হল কি না, তা নিয়েই জল্পনা বেশি। কিন্তু বিজেপির দিল্লি সূত্র জানাচ্ছে, রাজ্য বিজেপির তিন প্রধান মুখের অন্যতম হওয়ার সুবাদে সুকান্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ অর্থনীতিবিদ হিসাবে অশোকেরও যথেষ্ট কদর দিল্লির কাছে। সুতরাং ‘সুকান্তের আপত্তি’ অশোকের জন্য বাধা হয়ে ওঠার কথা ছিল না। বিজেপি সূত্রের খবর, বেসরকারি সংস্থাকে দিয়ে বিজেপি যে তিন দফা সমীক্ষা চালিয়েছে, তাতে বালুরঘাটে অশোকের নাম অগ্রগণ্য হয়ে ওঠেনি। স্থানীয় সাংগঠনিক পদাধিকারীদের কাছ থেকে যে মতামত নেওয়া হয়েছিল, তাতে অশোক আরও পিছিয়ে পড়েন। কারণ বালুরঘাট তথা দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় বিজেপির সাংগঠনিক পদাধিকারীদের সিংহভাগই সুকান্তের পছন্দের। অশোক তাঁদের খুব একটা পছন্দ করতেন বলে কখনও শোনা যায়নি। আর যাঁদের মাধ্যমে অশোক নিজের কাজ সামলাতেন, তাঁরা সাংগঠনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন না। ফলে সাংগঠনিক সমীক্ষায় অশোকের হয়ে সওয়াল করার লোকজন বালুরঘাটে তেমন খুঁজে পাওয়া যায়নি।

অশোকের টিকিট না-পাওয়া বিজেপির এই প্রার্থী বাছাই পদ্ধতির যৌক্তিকতা নিয়েই কিয়দংশে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। জনমত সমীক্ষা এবং সাংগঠনিক সমীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থীদের নাম তুলে আনার পদ্ধতি এমনিতে ‘গণতান্ত্রিক’ বলেই অধিকাংশের মত। কিন্তু প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সমীক্ষাই মাপকাঠি হয়ে উঠলে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া নিতান্তই ‘যান্ত্রিক’ হয়ে পড়ে কি না, তা নিয়েও দলের অন্দরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিজেপির জন্য পশ্চিমবঙ্গ ‘কঠিন ঠাঁই’ জেনেও পাঁচ বছর আগে দিল্লি ছেড়ে রাজ্যে চলে আসতে রাজি হয়েছিলেন অশোক। ক্ষমতা বা প্রভাব-প্রতিপত্তির জন্য সক্রিয় রাজনীতিতে আসার প্রয়োজন তাঁর ছিল না। কারণ পেশার সূত্রেই ক্ষমতার সর্বোচ্চ অলিন্দে তাঁর অবাধ গতিবিধি ছিল। রাজধানীর সেই ‘পাওয়ার করিডর’ ছেড়ে প্রান্তিক পশ্চিমবঙ্গের ততোধিক প্রান্তিক বালুরঘাটে যেতে রাজি হওয়া অশোকের ‘বদান্যতা’র পরিচায়ক বলেও এক প্রাক্তন সাংসদের মত। তা সত্ত্বেও এ বার তাঁকে টিকিট না-দেওয়ার সিদ্ধান্ত সুশীল সমাজে ভুল বার্তা দেবে বলে বিজেপিতেই কেউ কেউ মনে করছেন। এক প্রাক্তন সাংসদের কথায়, ‘‘ভাল মানুষ, কৃতী মানুষ বা ভদ্রলোকেরা আজকাল রাজনীতিতে আসতে চান না বলে আমরা তাঁদের দোষারোপ করি। কিন্তু অশোক লাহিড়ীর সঙ্গে যা ঘটল, তা দেখিয়ে দিল কৃতীরা বা ভদ্রলোকেরা কেন রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চান।’’ অশোককে যে ভাবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে, তা প্রবীণ অর্থনীতিবিদের প্রাপ্য ছিল না বলেই ওই বিজেপি নেতার মত।

অশোক নিজে এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোথাও ক্ষোভ বা অভিমান ব্যক্ত করেননি। তিনি পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে দিল্লি ফিরে যাচ্ছেন, এমন মন্তব্যও প্রকাশ্যে এখনও করেননি। তবে বিজেপি সূত্রের খবর, দলের একাংশই অশোকের ‘সম্মানজনক পুনর্বাসন’-এর জন্য সক্রিয় হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে অথবা নীতি আয়োগে তাঁকে নিযুক্ত করার বিষয়ে সুপারিশ পৌঁছেছে। তা নিয়ে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সাড়া এখনও পর্যন্ত ইতিবাচক বলেই খবর। কারণ সে ক্ষেত্রে অশোকের ‘সম্মানজনক প্রস্থান’-এর ছবি তৈরি করা যাবে। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাজে অশোক পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে দিল্লি ফিরলেন, এমন তত্ত্ব খাড়া করা যাবে।

বিজেপির অন্য একটি সূত্রের দাবি, অশোককে কলকাতা বা শহরতলির কোনও আসনে টিকিট দেওয়ার কথাও ভাবতে শুরু করেছেন নেতৃত্ব। কিন্তু বালুরঘাটে টিকিট না-পেলে তিনি আর ভোটে লড়তে রাজি নন বলে অশোক নিজের ঘনিষ্ঠ বৃত্তকে ইতিমধ্যেই জানিয়ে রেখেছেন বলে খবর। তাই অনুরোধ বা উপরোধে মতবদল না-হলে বিজেপির পরবর্তী তালিকাতেও অশোকের নাম থাকার সম্ভাবনা কমই।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement