(বাঁ দিক থেকে) জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়, দেবদীপ পুরোহিত এবং স্বপন দাশগুপ্ত। ছবি: আনন্দবাজার ডট কম।
দুই সাংবাদিক পর পর দুই বিধানসভা ভোটে লড়েছিলেন পদ্মের প্রার্থী হয়ে। প্রথম বার পরাজিত হয়েছিলেন দু’জনেই। দ্বিতীয় বারের লড়াইয়ে বিজয়ী দু’জনেই। এই প্রথম বার দক্ষিণ কলকাতার রাসবিহারী এবং বীরভূমের সিউড়িতে পদ্ম ফোটালেন প্রাক্তন সাংবাদিক স্বপন দাশগুপ্ত এবং জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। অন্য দিকে, প্রথম বার ভোটের ময়দানে নেমে পরাজিত হলেন তৃণমূলের সাংবাদিক প্রার্থী দেবদীপ পুরোহিত।
জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়
ছাত্রাবস্থা থেকেই দক্ষিণপন্থী রাজনীতিতে ঝোঁক। ছোটবেলা থেকেই আরএসএস করতেন। বিদ্যাসাগর কলেজে পড়াশোনার সময় ছাত্রভোটে লড়েছেন। জিতেওছেন। বিজ্ঞানে স্নাতক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতোকত্তর এবং মার্কিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফেলোশিপ পেয়ে বিদেশ থেকে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার পাঠ নিয়েছেন জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। এই নিয়ে দ্বিতীয় বার ভোট-ময়দানে নেমে জয়ের স্বাদ পেলেন জগন্নাথ। কেন্দ্র সেই সিউড়ি।
সঙ্ঘ পরিবারের মতামত ও খবরের জন্য পরিচিত সাপ্তাহিক দৈনিক ‘স্বস্তিকা’-য় সাংবাদিকতার শুরু জগন্নাথের। তার পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে চাকরি করেছেন। তবে তাঁর কথায়, ‘‘২৫ বছরের সাংবাদিকতা ছেড়ে ভোটের রাজনীতিতে আসব কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ৭-৮ ঘণ্টার মধ্যে।’’ চাকরি ছেড়ে শুধুই রাজনীতি করার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত তাঁর পরিবার সমর্থন করেছে। বস্তুত, জগন্নাথের পরিবারের প্রায় সকলে বিজেপির সক্রিয় সমর্থক। বাবাও বিজেপির নেতা ছিলেন। ২০২১ সালেও সিউড়ি থেকে জগন্নাথকে প্রার্থী করেছিল বিজেপি। কিন্তু তৃণমূলের বিকাশ রায়চৌধুরীর কাছে হেরে যান তিনি। তবু আবার জগন্নাথকে সিউড়ি থেকেই প্রার্থী করেছিল পদ্মশিবির। কেন? তাঁর কথায়, ‘‘সিউড়ির সঙ্গে আমার সংযোগ, সম্পর্ক কখনও ফিকে হয়নি, হবেও না।’’
সিউড়ি বিধানসভা কেন্দ্র বরাবরই সিপিএম এবং কংগ্রেসের লড়াই দেখেছে। তবে ২০১১ সাল থেকে ওই আসন ধরে রেখেছিল তৃণমূল। এ বার তারা সেখানে উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়কে প্রার্থী করেছিল। বিজেপির জগন্নাথের কাছে ২৮ হাজার ৬৮৬ ভোটে পরাজিত হলেন তিনি।
দেবদীপ পুরোহিত
রাজনীতিতে নবীন এবং ভোট-রাজনীতিতে একেবারেই আনকোরা দেবদীপ পুরোহিত। উত্তর ২৪ পরগনার খড়দহ কেন্দ্রের প্রার্থী তিনি। ইতিহাস বলছে, বাম আমল থেকেই খড়দহে মূলত বহিরাগতেরা বিধায়ক হয়েছেন। ব্যতিক্রম সিপিএমের সাধনকুমার চক্রবর্তী। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বিধায়ক ছিলেন ওই ভূমিপুত্র। পরে বাম আমলের অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত এবং পরিবর্তনের রাজ্যে তৃণমূলের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র ছিলেন খড়দহের বহিরাগত বিধায়ক। ২০২১ সালে অবশ্য শাসকদল প্রার্থী করেছিল পুরপ্রধান কাজল সিংহকে। নির্বাচনে জিতলেও ফল ঘোষণার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। উপনির্বাচনে প্রার্থী হন আদ্যোপান্ত দক্ষিণ কলকাতার নেতা বলে পরিচিত শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়।
দেবদীপ আদতে রাজস্থানের মাড়োয়ারি। কিন্তু মনেপ্রাণে বাঙালি। তাঁর ঠাকুরদা ব্যবসার কাজে পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি জমিয়েছিলেন। প্রথমে তাঁরা থাকতেন বীরভূমে। বাবার পড়াশোনা পাঠভবনে। কর্মসূত্রে তিনি খড়দহে চলে আসেন। সেই থেকে খড়দহ দেবদীপ এবং তাঁর পরিবারের ঠিকানা। রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাক্তনী দেবদীপ নিজে নিরামিষাশী। কিন্তু আমিষ ভক্ষণ নিয়ে তাঁর সংস্কার নেই। সাংবাদিকতা ছেড়ে রাজনীতিতে আসা হঠাৎই। তবে বিজেপি-বিরোধী দেবদীপ মনে করেন পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির জন্য বিজেপির রাজনীতি ‘ভয়ঙ্কর’। তাঁর বিশ্বাস, পদ্মশিবিরকে প্রতিহত করতে পারেন একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দল।
খড়দহে দেবদীপের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিজেপির কল্যাণ চক্রবর্তী এবং সিপিএমের দেবজ্যোতি দাস। শেষমেশ জয়ী হল বিজেপি। পদ্মপ্রার্থী কল্যাণের কাছে ২৪৪৮৬ ভোটে পরাজিত হলেন তৃণমূলের পুরোহিত।
তৃণমূলের খড়দহের প্রার্থী দেবদীপ অর্থনীতির ছাত্র। তৃণমূল চতুর্থ বার সরকার গড়লে মমতার মন্ত্রিসভায় তিনি অর্থমন্ত্রী হবেন কি না, সেই আলোচনা শুরু হয়েছিল তাঁকে প্রার্থী করার পর থেকেই। কিন্তু পর পর তিন বার তৃণমূলের জেতা আসন থেকে পরাজিত হলেন দেবদীপ। রাজ্য জুড়ে গেরুয়া ঝড়ের আবহে খড়দহ থেকে জিতলেন বিজেপির কল্যাণ চক্রবর্তী। তিনি ভোট পেয়েছেন ৯৭৭৫২।
স্বপন দাশগুপ্ত
আবার এক বার ভোট-ময়দানে নেমেছিলেন বিজেপির ‘তাত্ত্বিক নেতা’ স্বপন দাশগুপ্ত। কলকাতার তাঁর বাড়ি মহানির্বাণ রোডে। দিল্লিতে ঠিকানা চিত্তরঞ্জন পার্ক। গত বার বিজেপির টিকিটে ভোটে লড়েছিলেন তারকেশ্বরে। হেরে গিয়েছিলেন। প্রাক্তন সাংবাদিক স্বপন জনসেবা ও সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ২০১৫ সালে পদ্মভূষণ সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন। ২০২১ সালে রাজ্যসভার এই সাংসদকে তারকেশ্বর থেকে প্রার্থী করেছিল বিজেপি। এ বার দক্ষিণ কলকাতার রাসবিহারী কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করা হয়েছিল তাঁকে। ভোটের কয়েক দিন আগে যে কেন্দ্রের বিদায়ী বিধায়ক তথা তৃণমূল প্রার্থী দেবাশিস কুমারের বাড়িতে ইডি হানা এবং আয়কর তল্লাশি নিয়ে শোরগোল হয় রাজ্য রাজনীতিতে। দেবাশিস অবশ্য জানিয়েছিলেন, কেন্দ্রীয় সংস্থার এই ‘আক্রমণ’ তাঁর জয়ের ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দেবে। তবে ফলে তার ছাপ দেখা যায়নি। প্রথম বার বিধায়ক হচ্ছেন বিজেপির রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ স্বপন। এই প্রথম বার বিজেপি-ও জয় পেল রাসবিহারী কেন্দ্রে। স্বপন জিতলেন ২০৮৬৫ ভোটে। তিনি ভোট পেয়েছেন ৭৪১২৩টি।