— ফাইল চিত্র।
যে জেলায় রাজবংশী জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি, সেখানে এ বার আসন বাড়বে। জোর দিয়ে দাবি করেছিল তৃণমূল। বিজেপি প্রত্যাশিত ভাবেই সে দাবি নস্যাৎ করেছিল। সোমবার ভোট গণনা শুরু হওয়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই স্পষ্ট গেল, কোচবিহার জেলায় তৃণমূলের আশা-আকাঙ্ক্ষার অন্তর্জলী যাত্রা শুরু হয়ে গিয়েছে। আর ভোটগণনা শেষ হতে হতে বোঝা গেল, শুধু কোচবিহারে নয়, উত্তরবঙ্গে রাজবংশীবহুল ৩০ বিধানসভা আসনের একটিতেও জিততে পারছে না তৃণমূল। পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় তফসিলি সম্প্রদায় আক্ষরিক অর্থেই শূন্যে নামিয়ে দিল তৃণমূলকে। প্রত্যেকটি আসনে জয়ী হল বিজেপি।
কোচবিহার জেলাতেই রাজবংশী জনঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। তবে উত্তরবঙ্গের কমবেশি ৩০টি আসনে রাজবংশী ভোট নির্ণায়ক হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে। কোচবিহারের ন’টি বিধানসভা আসনের সব ক’টিই সেই তালিকায় রয়েছে। রয়েছে জলপাইগুড়ির ছ’টি, আলিপুরদুয়ারের তিনটি, দার্জিলিং জেলার তরাই অঞ্চলের দু’টি আসন। এ ছাড়া উত্তর দিনাজপুরের পাঁচটি। দক্ষিণ দিনাজপুরের তিনটি এবং মালদহে দু’টি আসনেও রাজবংশী ভোটের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রথম বার এই সব এলাকায় পদ্মফুলের জয়জয়কার দেখা গিয়েছিল। সে দাপট ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কিছুটা খর্ব হলেও রাজবংশী এলাকায় তৃণমূলের চেয়ে বিজেপি সে বারও এগিয়েই ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কোচবিহারে তৃণমূল পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসে। জেলার অধিকাংশ আসনে বিজেপি-কে তৃণমূল পিছনে ফেলে দেয়। জলপাইগুড়ির রাজবংশী বলয়ে দু’দলের প্রাপ্তি ছিল প্রায় সমান। তবে আলিপুরদুয়ার, দার্জিলিং, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদহের রাজবংশীবহুল আসনগুলিতে সে বারেও বিজেপি নিজেদের দাপট বহাল রেখেছিল। উপরি পাওনা হয় উত্তর দিনাজপুর। রায়গঞ্জ, কালিয়াগঞ্জের পাশাপাশি কর্ণদিঘি, হেমতাবাদের মতো রাজবংশী অধ্যুষিত আসনেও তৃণমূলের চেয়ে বিজেপি এগিয়ে যায়।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব রাজবংশী প্রধান এলাকার জন্য ‘বিশেষ যত্নশীল’ হয়ে ওঠেন। কারণ, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হওয়া তিনটি বড় নির্বাচনে ওই এলাকায় দলের ভোটপ্রাপ্তির ধাঁচ দেখে বিজেপির নেতৃত্বের ধারণা হয়েছিল, আরও একটু ‘যত্নশীল’ হলে গোটা রাজবংশী সমাজকে পাশে পাওয়া যেতে পারে। রাজবংশী প্রধান এমন কোনও আসনই প্রায় ওই সাত জেলায় নেই, যেখানে বিজেপি একবারও জেতেনি বা তৃণমূলের চেয়ে এগিয়ে থাকেনি। ‘যত্নশীল’ হওয়ার কৌশল এবং অঙ্গই ছিল অনন্ত মহারাজের উপরে পূর্ণাঙ্গ ভরসা না-রাখার নীতি।
২০১৯ এবং ২০২১ সালে বিজেপি রাজবংশী ভোটের জন্য মূলত অনন্তের উপরেই ভরসা রেখেছিল। তাতে দলকে পুরোপুরি নিরাশ হতে হয়নি। তবে অনন্তের প্রভাবে রাজবংশী সমাজ একচেটিয়া ভাবে বিজেপির পাশে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, তেমনও হয়নি। বরং ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে কোচবিহার লোকসভা আসন বিজেপির হাতছাড়া হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক হেরে যান। অনন্তও মাঝেমধ্যেই বেসুরে বাজতে শুরু করেন। বিজেপির টিকিটে রাজ্যসভায় যাওয়া অনন্ত কখনও প্রকাশ্যে দলের তথা কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করতে থাকেন। কখনও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাদরে নিজের বাড়িতে অভ্যর্থনা জানান। কখনও মমতার ডাকে রাজ্য সরকারের অনুষ্ঠানেও হাজির হয়ে যান। রাজ্য সরকার অনন্তকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মান দেয়। বিজেপি নেতৃত্বের টনক নড়েছিল তখনই। উত্তরবঙ্গে দলের জনভিত্তি ধরে রাখার জন্য অনন্তের উপরে নির্ভরশীল না-হয়ে সমান্তরাল বন্দোবস্ত যে খুঁজে বার করতে হবে, তা তাঁরা বুঝে যান। সে লক্ষ্যে নিঃশব্দে কাজ শুরু করেন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচন প্রভারী ভূপেন্দ্র যাদব। বিজেপি সূত্রের দাবি, ‘প্রয়োজনমতো’ অমিত শাহও সে প্রয়াসে সহায়তা জোগাতে থাকেন।
বিজেপির এই কৌশল শুরুতে ততটা বোঝা যায়নি। ভোটের কয়েক মাস আগে থেকে শুধু এটুকু আভাস পাওয়া যাচ্ছিল যে, অনন্ত মহারাজের উপরে দিল্লির ‘চাপ’ বেড়েছে। অনন্ত বেফাঁস কথাবার্তা বলায় রাশ টেনেছেন। দলের কর্মসূচিতে ‘বাধ্য ছাত্র’ সুলভ ভঙ্গিতে হাজিরা দেওয়া শুরু করেছেন। গত ২৪ মার্চ বিজেপির মঞ্চে ‘গ্রেটার কোচবিহার পিপল্স অ্যাসোসিয়েশন’ (জিসিপিএ) নেতা বংশীবদন বর্মণ হাজির হতেই স্পষ্ট হয়ে যায়, রাজবংশী প্রধান এলাকায় অনন্ত-নির্ভরতা কাটিয়ে নীরবে ‘ঘর গুছিয়েছে’ বিজেপি। বংশীবদন বিজেপিতে যোগ দেননি। তবে শমীক ভট্টাচার্য এবং শুভেন্দু অধিকারীর পাশে বসে সাংবাদিক বৈঠক করে ঘোষণা করেছিলেন, এ বারের ভোটে তিনি বিজেপি-কে সমর্থন করছেন। সেই কর্মসূচিতেই প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক তথা রাজবংশী নেতা অর্ঘ্য রায়প্রধান এবং বংশীবদনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিরিজাশঙ্কর রায় বিজেপিতে যোগদান করেন।
কোচবিহার শহর, গোঁসানিমারি, দিনহাটা-সহ জেলার বড় অংশেই রাজবংশী সমাজের মধ্যে অনন্তের প্রভাব বেশি। কিন্তু ভেটাগুড়ি, বক্সিরহাট-সহ জেলার অন্য একটি অংশে আবার বংশীবদনের প্রভাব বেশি। কোচবিহারের বাইরে ডুয়ার্স এবং তরাইয়ে যে রাজবংশীদের বাস, তাঁদের মধ্যে বংশীবদন অধিকতর প্রভাবশালী। জলপাইগুড়ির মালবাজার, ক্রান্তি বা আলিপুরদুয়ারের ফালাকাটা, কুমারগ্রাম ইত্যাদি এলাকায় এক সময়ে কেএলও (কামতাপুর লিবারেশন অর্গানাইজ়েশন) জঙ্গিদের দাপট বেড়েছিল। ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষিত হওয়া সংগঠনটির বিরুদ্ধে পরে সামরিক ও আধাসামরিক অভিযান শুরু হওয়ায় কেএলও অচিরেই উবে যায়। কিন্তু আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়ি জেলায় বসবাসকারী রাজবংশী সমাজের যে অংশ কেএলও-র প্রতি সে সময়ে সহানুভূতিশীল ছিল, তাঁদের মধ্যে বংশীবদনের গ্রহণযোগ্যতা অনন্তের চেয়ে বেশি।
রাজবংশী সমাজের এই দুই প্রভাবশালী মুখকেই একসঙ্গে নিজেদের শিবিরে শামিল করতে পেরে বিজেপি নেতৃত্ব স্বস্তিতে ছিলেন। অনন্ত ও বংশীকে প্রায় এক মঞ্চে এনে ফেলতে পারা সাত জেলার গোটা তিরিশেক আসনে বিজেপি-কে সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে দেবে বলে নেতৃত্ব মনে করছিলেন। কিন্তু উত্তরবঙ্গের জন্য তৃণমূলের সক্রিয়তাও কম ছিল না। মুখ্যমন্ত্রী মমতা নিজে দফায় দফায় উত্তরবঙ্গ সফর শুরু করেছিলেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কোচবিহারের রাজবংশী বলয়ে যখন বিজেপি-কে ধরাশায়ী করা গিয়েছে, তখন জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ারেও তেমনটা ঘটানো সম্ভব বলে তৃণমূল বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল।
ভোটের ফল বলছে, তৃণমূলের ‘বিশ্বাস’-এর কোনও ভিত্তি ছিল না। উল্টো দিকে অনন্ত এবং বংশীকে একই বন্ধনীর মধ্যে নিয়ে আসা ছিল বিজেপির বিরাট কৌশলগত সাফল্য। রাজবংশী এলাকার ফলাফল বুঝিয়ে দিল, মুখ্যমন্ত্রীর বার বার উত্তরবঙ্গ সফরে কোনও লাভ হয়নি তৃণমূলের। মমতার কথায় কেউ আস্থা রাখেননি। বরং নিজেদের সমাজের দুই নেতার উপরে বেশি আস্থা রেখেছিলেন রাজবংশীরা। নেতারা যে দলের দিকে ঝুঁকেছেন, ৩০টি বিধানসভা আসনে সেই দলই একচেটিয়া আধিপত্য দেখিয়েছে।