মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।
বিধানসভা ভোটের মুখে প্রচারে বাধা দিতেই অভিযান করছে কেন্দ্রীয় সংস্থা। প্রার্থীকে ‘নজরবন্দি’ করা হচ্ছে। বিদায়ী বিধায়ক তথা প্রার্থী দেবাশিস কুমার-সহ তৃণমূলের কয়েক জন নেতার বাড়িতে আয়কর দফতরের হানার দিনে জনসভায় এমনটাই জানালেন দলের নেত্রী তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান, কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির সঙ্গে তাঁর কোনও ‘শত্রুতা’ নেই। ‘একটি দলের জন্য কাজ না করে’ দেশের জন্য কাজ করার অনুরোধ জানান তিনি।
শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টা নাগাদ দেবাশিসের মনোহরপুকুরের বাড়ি ও কার্যালয়ে যান আয়কর বিভাগের কর্তারা। সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা। একযোগে রাসবিহারীর প্রার্থীর দু’টি ঠিকানায় তল্লাশি শুরু হয়। বেলার দিকে তৃণমূল প্রার্থীর শ্বশুরবাড়িতেও তল্লাশি চলে। স্বাভাবিক ভাবে প্রচার বন্ধ রেখে বাড়িতেই ছিলেন দেবাশিস। দমদমের সেন্ট্রাল জেল ময়দান থেকে মমতা বলেন, ‘‘প্রচার আটকানোর জন্য ঘরে নজরবন্দি করে রাখা হচ্ছে। দেবাশিস রাসবিহারীর বিধায়ক। ওঁর মেয়ের সঙ্গে উত্তম কুমারের নাতির বিয়ে হয়েছে। তাঁর বাড়ি, তাঁর অফিসেও হানা দিয়েছে! ব্যক্তিগত কিছু থাকলে ভোটের পরে করতে পারত!’’ তিনি এখানেই থামেননি। মমতা আরও বলেন, ‘‘প্রার্থী প্রচার করবেন কখন? এখন আটকে রাখা মানে তাঁর একটা গোটা দিন নষ্ট। ইডি, সিবিআই, আইটি সবাই তল্লাশি চালাচ্ছে।’’ তার পরেই তিনি কটাক্ষ করেন বিজেপি-কে। মমতা বলেন, ‘‘বিজেপির সরাসরি লড়াইয়ের হিম্মত নেই? ভোটে লড়া তো সাংবিধানিক অধিকার। আটকে রেখে তার অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। আমি আইনি পদক্ষেপ করব যতটা সম্ভব।’’
এর আগে দেবাশিসকে তলব করেছিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। তৃণমূলনেত্রী আশঙ্কা প্রকাশ করে জানান, কাউন্সিলরদের বাড়িতেও কেন্দ্রীয় সংস্থা অভিযান চালাতে পারে। দমদমের সভায় তিনি বলেন, ‘‘কাউন্সিলরেরা সাবধান। যে কোনও সময় হানা দিতে পারে।’’ তার পরেই তিনি বার্তা দিয়ে বলেন, ‘‘মাথা নত করবেন না। লড়ে যেতে হবে।’’ এর আগে বিভিন্ন জনসভায় মমতা জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে ভোটে জেতার কাজে ব্যবহার করছে বিজেপি। দমদমের জনসভায় তিনি সেই কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকেও নিরপেক্ষ থাকার অনুরোধ করেন। মমতা বলেন, ‘‘সব এজেন্সিকে আমার অনুরোধ, একতরফা ভাবে একটা দলের জন্য কাজ করবেন না। দেশের জন্য কাজ করুন। আপনাদের সঙ্গে আমার কোনও শত্রুতা নেই।’’
শুক্রবার কোচবিহারের জনসভাতেও বিধায়ক দেবাশিসের বাড়িতে আয়কর হানা নিয়ে মুখ খুলেছেন মমতা। তিনি বলেন, “আজ কালো টাকার হুন্ডি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বসে আছে (বিজেপি)। আর তৃণমূল কংগ্রেসের পার্টি অফিসে হানা দিচ্ছেন। প্রার্থীর বাড়িতে গিয়ে হানা দিচ্ছেন। আমার প্লেনে হানা দিচ্ছেন। আমার নিরাপত্তাকর্মীদের উপর হানা দিচ্ছেন। নির্লজ্জ বেহায়া একটা রাজনৈতিক দল। সামনাসামনি লড়াই করতে পারে না। ভীতু। কাপুরুষ। ওদের বিসর্জন দিন।” মমতা সুর চড়িয়ে প্রশ্ন তোলেন, ‘‘ক’টা বিজেপির (নেতার) বাড়ি তল্লাশি হয়েছে আমি জানতে চাই।’’
নিজের ভাষণে বার বার বিজেপি-কে কটাক্ষ করেছেন মমতা। তাঁর কথায়, “ওরা যে অবস্থায় গিয়েছে, ওরা পার্টি অফিসও চেক করতে পারে। মানে শেষ মরণকামড়। ওই মরণকামড়ের বিষটা ভেঙে দিতে হবে। ওদের কোনও মূল্য নেই। ভোটের পরে জ়িরো।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘এখন সব দেখাচ্ছে। ভোটের আগে ইডি-টিডি, সিবিআই-টিবিআই করে। তার পরে আজ পর্যন্ত কোনও মামলার ফয়সলা করতে পারে না। নির্লজ্জ।’’ এর পরেই তিনি স্বকীয় ভঙ্গিতে আশ্বস্ত করেছেন দলীয় নেতা-কর্মীদের। মমতার কথায়, ‘‘ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। আমি যদি ভয় না পাই, আপনারা কেন ভয় পাবেন!”
শুক্রবার মমতার ‘ঘনিষ্ঠ’ তথা ভবানীপুরের তৃণমূল প্রার্থীর প্রস্তাবক মিরাজ শাহের বাড়িতেও অভিযান চালায় আয়কর দফতর। মমতা মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় সর্বধর্ম সমন্বয়ের বার্তা দিতে চার ধর্মের চার ব্যক্তিকে প্রস্তাবক করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম মিরাজ। তাঁর বাড়ি ছাড়াও কলকাতার বেশ কয়েকটি জায়গায় আয়কর হানার খবর আসে। তার মধ্যে রয়েছে সল্টলেক, মিডলটন স্ট্রিটের মতো এলাকা। কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় ওই সব জায়গায় তল্লাশি চলে। কালীঘাটের এক তৃণমূল নেতার বাড়িতে দীর্ঘক্ষণ ধরে তল্লাশি চালায় আয়কর দফতর। শুক্রবার সকালে কালীঘাটের গ্রিক চার্চের কাছে কুমার সাহার বাড়িতে হানা দেন আয়কর আধিকারিকেরা।