—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
তখন কোভিডের দ্বিতীয় তরঙ্গের আতঙ্কে কাঁপছে গোটা দেশ। এ রাজ্যে তারই মধ্যে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল ২০২১ সালে। যদিও কোভিড হোক বা কেন্দ্রীয় বাহিনী— কোনও ভয়ই দমিয়ে রাখতে পারেনি উত্তর হাওড়া কেন্দ্রের দুষ্কৃতীদের। অভিযোগ, ভোটের দিন মুহুর্মুহু বোমার শব্দে কেঁপে উঠেছিল ওই এলাকা। সেখানকার বহুতল আবাসনগুলির বাসিন্দারা যাতে ভোট দিতে যেতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতেই তৈরি করা হয়েছিল ওই আতঙ্কের পরিবেশ। শুধু তা-ই নয়, আরও অভিযোগ, একাধিক বহুতল আবাসনের প্রধান ফটকে তালা দিয়ে, লিফ্টের তার কেটে দিয়ে, অথবা সরাসরি বহুতলে চড়াও হয়ে ভোটারদের হুমকি দিয়ে তাঁদের ভোট দিতে যাওয়া আটকেছিল দুষ্কৃতীরা। তাদের কথা না শুনলে জলের লাইন কেটে দেওয়ারও হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
গত বারের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে এ বছর এলাকার বাসিন্দাদের অনেকেই ভেবেছিলেন, নির্বাচন কমিশন আবাসনের ভিতরেই বুথ তৈরি করবে, যাতে সেখানকার ভোটারেরা নির্ভয়ে ও নিরাপদে ভোট দিতে পারেন। অথচ, কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, এ বারের নির্বাচনে শুধু বালি ও মধ্য হাওড়া বিধানসভা কেন্দ্রের মোট পাঁচটি বহুতল আবাসনে বুথ তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। অতি স্পর্শকাতর উত্তর হাওড়ার কোনও আবাসন সেই তালিকায় নেই। কমিশনের এই সিদ্ধান্তের কথা জানার পরেই প্রতিবাদে সরব হয়েছে বিরোধী দলগুলি। আতঙ্কিত ওই সমস্ত বহুতলের বাসিন্দারাও। বিজেপি ও সিপিএমের তরফে জেলার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক তথা হাওড়ার জেলাশাসককে চিঠি দিয়ে দাবি করা হয়েছে, অবিলম্বে উত্তর হাওড়া কেন্দ্রের বহুতল আবাসনগুলিতে বুথ তৈরি করা হোক। সেখানে অনেক ভোটার আছেন।
এ বারের নির্বাচনে মধ্য হাওড়ার দু’টি এবং বালির তিনটি বহুতলে বুথ করার কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক। ওই দু’টি কেন্দ্রের মতো উত্তর হাওড়ার বহুতলগুলিতেও মূলত অবাঙালি সম্প্রদায়ের বসবাস। হাওড়া পুরসভা সূত্রের খবর, উত্তর হাওড়ায় গত ১৫ বছরে অন্তত ২০-২৫টি বহুতল (আটতলার বেশি) আবাসন তৈরি হয়েছে। বাম জমানায় তৈরি হওয়া বহুতলের সংখ্যা যোগ করলে সংখ্যাটা তার দ্বিগুণ। ওই সব বহুতল রয়েছে সালকিয়ার ম্যাকেঞ্জি লেন, কিংস রোড, শ্যামলাল লোহিয়া লেন, রোজ়মেরি লেন, সালকিয়া স্কুল রোড, ডবসন রোড-সহ আশপাশের কিছু রাস্তায়। একটি বহুতলের বাসিন্দা অলোক রাঠি বললেন, ‘‘এখানে গোলমালের জন্য আতঙ্কে আবাসনের বাসিন্দারা ভোট দিতে যেতেই পারেন না। আবাসনের মধ্যে বুথ হলে সবাই শান্তিতে ভোট দিতে পারতেন।’’
গত বার গন্ডগোল হওয়া সত্ত্বেও এ বছর উত্তর হাওড়ার কোনও আবাসনের ভিতরে বুথ করা হল না কেন? জেলার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক তথা জেলাশাসক পি দীপাপ প্রিয়ার জবাব, ‘‘উত্তর হাওড়ার কোনও বহুতলে তিনশোর বেশি ভোটার না থাকায় বুথ করা হয়নি। ভোটারের সংখ্যা বাড়লে পরবর্তী নির্বাচনে ভাবা হবে।’’ যদিওসালকিয়া স্কুল রোডের একটি আবাসনের আবাসিক কমিটির সম্পাদক অরবিন্দ গুপ্ত বললেন, ‘‘আমি যে আবাসনে থাকি,সেখানেই ভোটার আছেন ৬০০ জন। এ ছাড়া, এই অঞ্চলে এমন অনেক বহুতল আছে, যেখানে এর থেকেও বেশি ভোটার থাকেন। জেলাশাসক ঠিক বলছেন না।’’
উত্তর হাওড়ার বিজেপি প্রার্থী উমেশ রাই বলছেন, ‘‘জেলা নির্বাচনী আধিকারিক প্রথম থেকেই দ্বিচারিতা ও পক্ষপাতিত্ব করছেন। আমরা বার বার বলেছিলাম, উত্তর হাওড়ায় এমন অনেক বহুতল আছে, যেখানে তিনশোর বেশি ভোটার আছেন। ভোটের দিন বোমা মেরে, ভয় দেখিয়ে ভোটদানে বাধা দেওয়া হয়। তৃণমূলের জেলা সভাপতি তথা এই কেন্দ্রের প্রার্থী গৌতম চৌধুরীর ভয়েই কি আবাসনের ভিতরে বুথ করা হল না?’’ উমেশ জানান, এই বিষয়টি নিয়ে তিনি নির্বাচন কমিশনকে ফের চিঠি দিচ্ছেন।
উত্তর হাওড়ার সালকিয়ার বাসিন্দা এবং ওই কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থী গৌতম রায়ও বললেন, ‘‘অবশ্যই এখানকার বহুতলগুলিতে বুথ করা দরকার। গোলমাল হলে মানুষ ভোট দিতে বেরোতে পারবেন না। আমরাও ফের দাবি জানাব।’’
বিরোধীরা উত্তর হাওড়ার বহুতল আবাসনগুলিতে বুথের দাবি জানালেও তৃণমূল প্রার্থী গৌতম চৌধুরী অবশ্য বললেন, ‘‘এখানকার কোনও বহুতল আবাসনে বুথ না হলেও নির্বাচনে বিশেষ সমস্যা হবে না। আসলে বহুতলগুলির কোনওটিতে তিনশোর বেশি ভোটার নেই বলেই নির্বাচন কমিশন বুথ করেনি।’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে