তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।
মমতা বলেন, “হলদিয়া উন্নতি করছে। আমরা দেখব, যাতে হলদিয়া শিল্পের এক নম্বর কেন্দ্র হয়।” মমতা আরও বলেন, “লালগড়ের সভাটায় আমি যেতে পারিনি। হেমন্ত সোরেনকে যেতে দেওয়া হয়নি। তাঁর হেলিকপ্টার আটকে দিয়েছিল, যাতে যেতে না পারেন। আমি এই সভা থেকে লালগড়বাসীকে বলছি, ভোটে জিতে আমি প্রথম লালগড়ে যাব। আপনাদের কথা দিচ্ছি।”
মমতা বলেন, “আমরা অন্য পার্টির মতো নই। আমরা ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে লড়াই করে বেঁচে থাকি। তাই মনে রাখবেন, বিনা যুদ্ধে এক ইঞ্চি জমিও আপনাদের ছাড়ব না। লড়াই হবে। খেলা হবে। খেলার নাম দুরন্ত খেলা। এই খেলায় পগারপার করে দেব বিজেপি-কে।”
তৃণমূলনেত্রী বলেন, “আমরাও চারদিকে লোক রাখব। যারা ভাবছেন ছাপ্পা করবেন, এক পক্ষ করবেন— আপনাদের যদি ৫০টা ক্যামেরা থাকে, চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা আমাদের ক্যামেরা। সব লক্ষ রাখব।”
মমতা বলেন, “আপনারা যদি আমার নেতৃত্বে সরকার চান, কে প্রার্থী ভুলে যান। সব কেন্দ্রে আমি প্রার্থী। ২৯৪টি কেন্দ্রে।” এর পরে মমতা আরও বলেন, “আমোদী-প্রমোদীবাবু বলছেন ২৯৪ কেন্দ্রে তিনি প্রার্থী। আপনি তো পশ্চিমবঙ্গের ভোটারই নন, কী ভাবে হবে! তা হলে আপনাকে আগে প্রধামন্ত্রিত্ব ছাড়তে হবে। খালি মিথ্যা কথা বলেন।”
মমতা বলেন, “বিজেপির হাতে পশ্চিমবঙ্গকে বিক্রি করার জন্য কেউ একটি ভোটও বিজেপি-কে দেবেন না। যাঁরা বিজেপির হয়ে দালালি করছেন, তাঁদের তৃণমূলকে সমর্থন করার জন্য বলছি না। সংযত থাকুন। শুধু এক পক্ষ থাকবেন না, নিরপেক্ষ থাকুন।” মমতা আরও বলেন, “যদি মনে করেন পশ্চিমবঙ্গে এ বার বিজেপি জিতবে— ছাই জিতবে। পশ্চিমবঙ্গে আসছে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার। আমি এক মাস ধরে সারা পশ্চিমবঙ্গ ঘুরেছি। আমি মানুষের চোখের ভাষা বুঝে নিয়েছি।”
তৃণমূলনেত্রী বলেন, “যে পরিযায়ী শ্রমিকেরা আসতে চাইছেন, (তাঁদের কাছে) গীতা নিয়ে শপথ করে বলছে— বলো বিজেপি-কে ভোট দেব, তবে ট্রেনের টিকিট দেব। যেন ট্রেনটা পৈতৃক সম্পত্তি, জনগণের নয়। আরে যাদের শপথ করিয়েছে, তারা আর এক বার এসে নাক-কান মুলে শপথ করে ভোট দিয়ে যাবে তৃণমূলকে। এটা মাথায় রাখবেন। ওরা বিপদে পড়লে আমরা থাকি। আমরা ডেডবডিগুলো নিয়ে আসি। একটা পয়সাও সাহায্য দেয় না।”
মমতা বলেন, “নন্দীগ্রামে যখন গুলি চলেছিল, কেউ আসতে সাহস পায়নি। আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢুকেছিলাম। আজও হলদি নদীর জলে নন্দীগ্রামের ১০ জন নিখোঁজকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।” মমতা আরও বলেন, “নন্দীগ্রামের ঘটনা সব জানত। বাপ-ব্যাটা কেউ কিন্তু ৭-১০ দিন বেরোয়নি। আমি একা রাস্তায় ছিলাম। আমাকে যখন কোলাঘাটে পেট্রল বোমা মারছিল, ওরা বেরোয়নি। সব কথা নিশ্চয়ই হলদিয়ার, নন্দীগ্রামের মানুষের মনে আছে।”
মমতা বলেন, “আমি মনে করি প্রশাসন নিরপেক্ষ কাজ করবে। কারও প্রলোভন নিয়ে, কারও কাছ থেকে টাকা নিয়ে এক পক্ষ কাজ করবেন না দয়া করে। অন্য বার ছেড়ে দিলেও এ বার ছাড়ব না। আমরা সকলের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর রাখছি। ভয় নেই, গায়ে হাত দেব না। ভয় নেই, অন্য কিছু করব না। আইন আইনের পথে চলবে।”
মমতা বলেন, “ঝাড়ু রেখে দেবেন। এখানকার পুলিশ এখন আমার সঙ্গে নেই। ভোটকেন্দ্রে সেন্ট্রাল ফোর্স বা পুলিশ যদি আপনার পথ আটকায়, আপনি রাস্তা পরিষ্কার করতে করতে চলে যাবেন।”
মমতা বলেন, “আমি তো গাড়িতে লাল আলো, নীল আলো লাগাই না। পোঁ পোঁ বাজাই না। কারণ, আমি সাধারণ মানুষের মতো থাকতে চাই। তোমাদের এত অহঙ্কার, এক ভাই সাংসদ। তুমি বিধায়ক। আর এক ভাই বিধায়ক। পুরো পরিবারটাকে ঢেলে দিয়েছ। আমাদের পরিবারের এমএলএ ইলেকশনে আমি ছাড়া কেউ দাঁড়ায়নি। অভিষেককে রোজ গালাগালি দেয়। অভিষেককে লড়তে পারো না, আর আমাকে লড়বে! আগামী দিনে মেদিনীপুরের দায়িত্ব নিয়ে অভিষেকই কাজ করবে। আমি বলে গেলাম। আমি তো থাকবই।”
মমতা বলেন, “নন্দীগ্রামে আমার কর্মীও খুন করেছে।” এর পরে তিনি আরও বলেন, “আমি এদের আজ নয়। দীর্ঘদিন ধরে চিনি। আগে কংগ্রেস করত। তার আগে তিন-চার বার করে হেরেছে। আমি অনেক দিয়েছি এই পরিবারকে। আর পারব না দিতে। এখনও বিজেপির সাহায্যে দুধে ভাতে আছে। হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বিনিয়োগ করে রেখেছে। কত টাকা ঠিক নেই। সব চেয়ে বড় গদ্দার, দুর্নীতিবাজ, স্বৈরাচারী, অত্যাচারী, ভোটকাটারি এই বিজেপি সরকার।”
মমতা বলেন, “পুলিশকে আমি কোনওদিন দেখিনি যে তারা বিজেপির পক্ষ হয়ে কাজ করে। এক পক্ষ হয়ে কাজ করছে। আমাদের সব অফিসারকে বদলে দিয়েছে। নিজের লোক নিয়ে এসেছে। নিজের লোক খুঁজতে খুঁজতে, উকুন বাছতে বাছতে তোমার মাথাটা খালি হয়ে যাবে। এর পর ন্যাড়া হতে হবে।”
মমতা বলেন, “এমনি জিততে পারবে না। নন্দীগ্রামের মানুষ তোমাদের আগের বার ভোট দেয়নি। এখনও কোর্টে মামলা বিচারাধীন আছে। মনে রেখো, অনেক ভাঙা মেশিন আছে। আমি মুখে ঝামা ঘষে দিতে পারতাম। কিন্তু ভবানীপুর থেকে ইলেক্টেড হওয়ার জন্য আমি আর প্রেশার দিইনি। এ বারেরও লোডশেডিং করে দেবে, ছাপ্পা ভোট করে দেবে। নন্দীগ্রামেই ৪০ জনকে নোটিস পাঠিয়েছে এনআইএ। কেন বাবা? এই ছ’বছর কি তুমি কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমোচ্ছিলে! আজ বলছ, এক হাজার তৃণমূল কর্মীকে গ্রেফতার করতে হবে। আগে বিজেপি-কে গ্রেফতার করুন। যারা খুন করেছে, ডাকাতি করেছে, নিজের সিকিউরিটিকে হত্যা করেছে।”
মমতা বলেন, “বৃহস্পতিবারে লক্ষ্মীবারে ভোট হচ্ছে। লক্ষ্মীর ভান্ডার আজীবন উপহার পাবেন আমার মা-বোনেরা। আর বিজেপি নাটক আর জুমলা ভোটের পরেই পালিয়ে যাবে। এরা ইলেকশনের সময়ে আসে। দোকান আগে থেকে সাজিয়ে গুজিয়ে, আগে থেকে মাইক লাগিয়ে, নিজেরা ঝালমুড়ি বানিয়ে… ওনার কাছে ১০ টাকা থাকে? আমার কাছে তো ১০ টাকার নোট নেই। ১০টাকা নিয়ে এসেছে পকেটে করে, রাজনীতি করবে বলে।”
মমতা বলেন, “শয়তান লোকগুলো বলে কাজ হয়নি, কাজ হয়নি। তাই এটা বলতে হচ্ছে। রাজ্য সরকার ছ’টি শিল্প-অর্থনৈতিক করিডর তৈরি করছে। তার মধ্যে ডানকুনি-হলদিয়া দেওয়া হয়েছে। ২ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান হবে। বন্দর হয়ে গেলে অনেক লোকের কর্মসংস্থান হবে। হলদিয়ায় খেলনা তৈরির কারখানাও করে দিয়েছি আমরা। হলদিয়া মহকুমা হাসপাতালে এসএনসিইউ, এইডিইউ, ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকানও করা হয়েছে। নন্দীগ্রামে সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল করে দেওয়া হয়েছে। কাঁথিতে (হাসপাতালে) ২০০ শয্যার জায়গায় ৩০০ শয্যা করে দেওয়া হয়েছে। দিঘাতেও অনেক মানুষ আসছে। আস্তে আস্তে ওটাকেও আমরা একটা বড় হাসপাতাল তৈরি করব।”
মমতা বলেন, “হলদিয়ায় আমরা ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছি। ১ লক্ষ ২০ হাজারের বেশি মানুষ চাকরি করেন। ৩৩৪ একরের উপরে হলদিয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক তৈরি করা হয়েছে। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনকে জমি দিয়েছি। ২,৭৯০ কোটি টাকা তারা বিনিয়োগ করেছে। জগদীশপুর-হলদিয়া-বোকারো-ধামরা পাইপলাইনের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। ৪,১২৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। হলদিয়ায় ভোজ্য তেল শোধনাগার তৈরি করেছে ইমামি গ্রুপ। ভারতের বৃহত্তম তেলের ইউনিট।”
মমতা বলেন, “এই জেলাকে আমি সম্মান জানাই। এটা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলা, যিনি আমাদের মা বলতে শিখিয়েছেন। স্বরবর্ণ, ব্যাঞ্জনবর্ণ শিখিয়েছেন। তাঁর বাড়িটাও আমরা সুন্দর ভাবে করে দিয়েছি। মাতঙ্গিনী হাজরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। তাঁর নামটাও উল্টো বলছে বিজেপির নেতারা। তিনি যখন লড়াই করেছিলেন, ইংরেজরা গুলি চালিয়েছিল। তিনি গুলির সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, পিছাবনি। তাই এখানে একটা পিছাবনি ব্রিজ আছে। সেটাও আমরা ভাল করে করে দিয়েছি।”
বিজেপি-কে বিঁধে মমতা বলেন, “তৃণমূলের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিচ্ছ। তোমাদের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে আমি চার্জশিট দিচ্ছি। কত টাকা হলদিয়া থেকে যায়, এটার একটা তদন্ত হোক। তৃণমূলের লোকেরা শুধু গ্রেফতার হবে? আগের বারও নন্দীগ্রামে এ ভাবে লুট করেছ! রাতের বেলায় জেতার পরেও লোডশেডিং করে ইভিএম মেশিন লুট করেছ। কাউন্টিং লুট করেছ। যাদের বসিয়েছিলে, তাদের আমি চিনি। কেউ যদি আপনাদের সঙ্গে দুষ্টুমি করে, তাদের নাম-ঠিকানা, ফোন নম্বর আর ছবি তুলে রাখবেন।”
মমতা বলেন, “শিল্প এবং কৃষি আমার দুই ভাই বোন।” তিনি আরও বলেন, “আপনাদের গর্ব হওয়া উচিত, নন্দীগ্রামে আমি প্রাইভেটে জাহাজ কারখানা তৈরি করে দিচ্ছি। হলদিয়াতে তাজপুর পোর্ট হচ্ছে। নয়াচকে নতুন ইকো টুরিজ়ম হচ্ছে। দিঘার সমুদ্রের পার সুন্দর করে বাঁধিয়ে দিয়েছি। জগন্নাথ ধাম করে দিয়েছি। যেখানে এক বছরে ১ কোটি ৩০ লক্ষ লোক গিয়েছেন।”
মমতা বলেন, “সুতাহাটা আমাদের আগেও বিধায়ক দিয়েছে। কিন্তু এখন দুর্ভাগ্য, একটা পার্টি এই মেদিনীপুর জেলায় নিজেদের লোকেদের সব ডেপুট করেছে। তারা সব এক পক্ষ হয়ে কাজ করছে। বিজেপি পক্ষ হয়ে কাজ করছে। এই জেলায় গদ্দার লিস্ট করে দিয়েছে, কাকে কাকে অ্যারেস্ট করতে হবে। আরে ভোটের পরে তুমি নিজেকে সামলাও। অনেক কেলেঙ্কারি করেছ। হলদিয়া থেকে কত ট্রাক যায়? সেই ট্রাকের কাটমানি কে খায়? যত কোম্পানি আছে, তাদের থেকে মাসে মাসে টাকা কে তোলে? সব এক জনই তোলে। সেই টাকা অর্ধেক নিজে নেয়। বাদবাকিটা দেয় বাইরের নেতাকে। আমি সবটাই জানি।”