— প্রতীকী চিত্র।
ভাঙাচোরা রাস্তা। বেহাল নিকাশি। পানীয় জলের সঙ্কট। হাসপাতাল নেই। উড়ালপুলের কাজ একচুলও এগোয়নি। গত পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে এমনই নেই-রাজ্যে সোনারপুর দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র। বলছেন এলাকার বাসিন্দারাই। তবে কি এই ক্ষোভের প্রভাব ফলাফলেপড়তে পারে, তা নিয়ে বিধানসভা কেন্দ্রের অন্দরে চাপা উত্তেজনা তো রয়েছেই।
এলাকা ঘুরতে গিয়ে পা আটকে গেল এই বিধানসভা কেন্দ্রের পোলঘাট পঞ্চায়েত এলাকার চাঁদপুরে। ঘড়িতে তখন বেলা ১২টা। একটি টিউবওয়েল ঘিরে খালি প্লাস্টিকের বোতল, গামলা-বালতি হাতে মহিলা, পুরুষ, কচিকাঁচার ভিড়। বার বার হ্যান্ডলে চাপ দিলে অল্প জল পড়ছে। ফলে দীর্ঘ প্রতীক্ষায় বাড়ছে অসহিষ্ণুতা।
এই বিধানসভা এলাকার অধীনে রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার ১৮টি ওয়ার্ড ও ছ’টি পঞ্চায়েত। যার অন্যতম এই পোলঘাট। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, গ্রীষ্মের শুরুতে টিউবওয়েল থেকে অল্প জল মেলে। তাপমাত্রা যত বাড়ে, ভূপৃষ্ঠের জলস্তর নেমে উবে যায় টিউবওয়েলের জল। একটি টিউবওয়েলে নির্ভরশীল ৫০-৬০টি পরিবার। পাইপলাইনের জল কখন আসবে, জানা নেই। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, ‘‘বছরভর দু’ধরনের জল যন্ত্রণায় ভুগতে হয়। গ্রীষ্মে পানীয় জলের সঙ্কট আর বর্ষায় বেহাল নিকাশির কারণে বৃষ্টির জমা জল। অধিকাংশ জায়গায় মাস চারেক সেই জল জমে থাকে।
এ হেন পোলঘাট থেকে গত লোকসভা নির্বাচনে চার হাজার ভোটে জিতেছিল শাসকদল তৃণমূল। তবে, বাকি অধিকাংশ ওয়ার্ড এবং পঞ্চায়েতে তারা পিছিয়ে ছিল। গোটা লোকসভা কেন্দ্র থেকে ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জিতেছিল শাসকদল। যার মধ্যে চার হাজার ভোট এসেছিল পোলঘাট পঞ্চায়েত থেকেই। অভিযোগ, তবুও এখানকার নাগরিকেরা পরিষেবা থেকে বঞ্চিত!
এ বার সোনারপুর দক্ষিণে দ্বিমুখী লড়াইয়ে শামিল শাসকদলের বিদায়ী বিধায়ক তথা প্রার্থী অরুন্ধতী মৈত্র (লাভলি) এবং বিজেপির প্রার্থী রাজ্যসভার প্রাক্তন সদস্য রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। লড়াইয়ের ময়দানে আছেন নির্দল প্রার্থী ও শাসকদলের প্রাক্তন ছাত্রনেত্রী রাজন্যা হালদার, কংগ্রেস প্রার্থী সুব্রতা দত্ত এবং সিপিআই প্রার্থী পারমিতা দাশগুপ্ত।
মহিলা সংরক্ষিত এই কেন্দ্রের এলাকা ঘুরলে কানে আসে বাসিন্দাদের অভিযোগ। তাঁরা জানাচ্ছেন, বড় রাস্তার পাশাপাশি অলিগলির রাস্তাও ভাঙা। বছরখানেক ধরে চলছে কেন্দ্রীয় সরকারের অম্রুত জল প্রকল্পের কাজ। তার পাইপলাইন বসাতে রাস্তা কাটা হয়েছে। অধিকাংশ রাস্তা যান চলাচল এবং হাঁটার পক্ষে বিপজ্জনক। মাসের পর মাস পেরোলেও সেই রাস্তা মেরামত হয়নি। পানীয় জল ও নিকাশি নিয়ে তো ক্ষোভ আছেই।
এই বিধানসভা এলাকায় একমাত্র স্বাস্থ্যকেন্দ্র সোনারপুর গ্রামীণ হাসপাতাল। অভিযোগ, সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। প্রাথমিক চিকিৎসাটুকুই শুধু মেলে। বড় কিছু হলে কলকাতার সরকারি হাসপাতাল ও বারুইপুর সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে রেফার করা হয়। এই কেন্দ্রের আরও এক মাথাব্যথা সোনারপুর উড়ালপুল। স্থানীয়দের কথায়, উড়ালপুল সম্প্রসারণে পাঁচ বছর আগেই অর্থ বরাদ্দ হয়েছিল। কিন্তু কাজ একটুও এগোয়নি।
বিধানসভা এলাকার ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের আদি বাসিন্দা রূপা গঙ্গোপাধ্যায় এ বার বিজেপির প্রার্থী। তিনি বললেন, ‘‘প্রচারে গেলে পরিষেবা নিয়ে শুধুই অভিযোগ শুনছি। কোথাও নিকাশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কোথাও পানীয় জল নেই। সিন্ডিকেট আর কাটমানির খেলায় কেন্দ্রের উন্নয়ন প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ।’’ রূপা মনে করিয়ে দিলেন একটি ঘটনা, যা এখনও কলকাতা হাই কোর্টে বিচারাধীন। তাঁর অভিযোগ, শেষ পঞ্চায়েত নির্বাচনে গণনা কেন্দ্রে শাসকদল হামলা করেছিল। এমনকি বিরোধীদের শংসাপত্রও কেড়ে নিয়েছিল। আর সে সব হয়েছিল বিদায়ী বিধায়ক তথা শাসকদলের প্রার্থীর নেতৃত্বে।
যদিও বিজেপি প্রার্থীর এই অভিযোগকে আমল দিচ্ছেন না তৃণমূল প্রার্থী লাভলি। তিনি বলছেন, ‘‘এলাকায় উন্নয়ন করেছি। মানুষ জানেন। উনি আমার কাছে শ্রদ্ধেয়া। তাঁকে একটাই প্রশ্ন, বিজেপির প্রার্থী পাঁচ বছর তো রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। তাঁর তহবিল থেকে সোনারপুরের জন্য কী কী উন্নয়ন করেছেন?’’ সেই সঙ্গে লাভলির দাবি, সোনারপুর গ্রামীণ হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও নিয়োগ হয়েছে।
তবে শাসকদলের অন্দরে চোরা গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব যে রয়েছে, তা প্রার্থীর কথাতেই স্পষ্ট। প্রার্থী মনোনীত হওয়ার পরেও একাধিক পুরপ্রতিনিধিকে প্রচারে দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ। তেমনই এক জন ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধি তথা চেয়ারম্যান পারিষদ সোনালি রায়। দুপুরে বাড়িতে বসে টিভিতে খবর শুনছিলেন। প্রচারে নেই কেন? সোনালি বললেন, ‘‘অনেক বার নেতৃত্ব ও প্রার্থীকে ফোন করেছি। আমাকে প্রচারে নেওয়া হয়নি। নির্বাচনের কাজ করতেও দেওয়া হচ্ছে না।’’ লাভলির উত্তর, ‘‘কয়েক জন দলের বিরুদ্ধে অসহযোগিতা করছেন। নির্বাচনের পরে সব মুখ্যমন্ত্রীকে জানাব। তবে জয়ী হবই। শুধু সময়ের অপেক্ষা।’’
সোনারপুর স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় বাড়ি নির্দল প্রার্থী রাজন্যা হালদারের। তিনি বলেন, ‘‘আমিই একমাত্র প্রার্থী, যে সোনারপুরের মেয়ে। সোনারপুরের সব সমস্যা আমি বিধানসভায় তুলে ধরতে পারব। সে কথা জানাতেই ৩২১টা বুথে প্রচার শুরু করেছি।’’
কংগ্রেস প্রার্থী সুব্রতা দত্তের মতে, ‘‘মেরুকরণের রাজনীতিতে উন্নয়ন ধামাচাপা পড়ছে। গত পাঁচ বছরে উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ওপরিষেবা তলানিতে ঠেকেছে। প্রচারে বেরিয়ে সমস্ত কিছুই বোঝা যাচ্ছে।’’
সিপিআই প্রার্থী পারমিতা দাশগুপ্তের বক্তব্য, ‘‘কর্মসংস্থান নেই। অথচ এই কেন্দ্রে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তথ্যপ্রযুক্তি হাবের জন্য জমি অধিগ্রহণ করেছিলেন। ১৫ বছরেও তার অগ্রগতি হয়নি।’’
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে শাসকদলের জয়ের ব্যবধান ছিল প্রায় ২৭ হাজার। ২০২৪-এ লোকসভা ভোটের ফলে তা হয় ১০ হাজারের কাছাকাছি। এ বার ব্যবধান বাড়বে না কমবে, উত্তর জানা যাবে ৪ মে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে