চা হাতে চলছে আড্ডা।
দু’গালে ফ্যানা লাগানো। খুর চালানোর অপেক্ষায় নাপিত। চোখ বুজে খানিক কাঠের চেয়াটার উপর এলিয়ে পড়েছিলেন বছর বাইশের তরুণ। মাথার উপর পাখা ঘুরছে বটে, কিন্তু ব্লেড গোনা যায়। ঘরের উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ঘরের কোণার টিভিটা। খবরের চ্যানেল খোলা। তারস্বরে চেঁচিয়ে চলেছেন সঞ্চালক। ছেলের কান সে দিকেই।
ডাক পড়ার অপেক্ষায় বেঞ্চিটাতে বসেছিলেন আরও দু’জন। গভীর আলোচনায় মগ্ন। সম্ভবত করিমপুরের দিদিকে নিয়ে। সাত-পাঁচ না ভেবে হঠাৎই তরুণ টুপ করে মুখ থেকে খসিয়ে ফেলেছিলেন কথাটা— ‘‘দিদি এ বার যে ভাবে সাইকেল বিলিয়েছেন, তাতে...।’’
কথা শেষ হল না। খুর হাতে ঝাঁঝিয়ে উঠলেন নাপিত ভায়া। —‘‘রাখ তোর সাইকেল। কাজের মধ্যে তো শুধু সরকারি বাড়ি নীল-সাদা রং আর লক্ষ লক্ষ টাকা পকেটে পোরা। কে দেবে ওদের ভোট?’’
আর কথা বাড়াননি যুবক। খুর হাতে নাপিতের গর্জন দেখে চোখ বুজে ভরসাও করতে পারেননি। সেলুনে উপস্থিত বাকিরাও ও পথ মারালেন না। করিমপুর থেকে কালীঘাট— ভোটের গরমে সব রাস্তাই বিপজ্জনক।
চায়ের দোকান থেকে গ্রামের মাচা, সেলুনের বেঞ্চ থেকে বাজারে থলে হাতে, সর্বত্রই জোর আলোচনা। আঠারো থেকে আশি। এত দিনের সাম্রাজ্য ভেঙে তবে কি এ বার দিদি আসছেন এখানে? কেউ বলছেন, ‘‘এক দিদিকে তো পাঁচ বছর দেখলাম। আবার পরিবর্তন!’’ কেউ আবার বলছেন, ‘‘এ দিদি বিলেত ফেরত। করিমপুরকে একেবারে লন্ডন বানিয়ে দেবেন...।’’ কারও বক্তব্য, ‘‘না না, দেখলেন না, ভোটের প্রচারে কেমন পায়ে হেঁটে গ্রামকে গ্রাম চষে ফেললেন। বদল হলে ভালই হবে।’’ পরক্ষণে ঝাঁঝালো মন্তব্য, ‘‘থামুন তো মশাই!’’
ফার্মের মোড়ের বাবুয়ার চায়ের দোকান। সক্কাল সক্কাল দোকান খোলা থেকে দোকান বন্ধ, সেই রাত এগারোটা পর্যন্ত চলছে তর্কাতর্কি। কোন দল ক্ষমতায় আসবে, এলাকায় গদি বদল হবে কি না, কী হলে ভাল, কীসে খারাপ— তার চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে দিনরাত। কেউ কেউ আবার গলার স্বর ভারী করে বলছেন, ‘‘জোট ১৬০ প্লাস। এই বলে দিলাম।’’ উল্টো দিক থেকে ধেয়ে আসছে পাল্টা জবাব, ‘‘বাপু রাখো তোমার কথা। আর তো ক’টা দিন। ঢাকে কাঠি পড়ল বলে।’’
রোজকার মতো বৃহস্পতিবার সন্ধ্যাতেও বাবুয়ার চায়ের দোকানে এক বার ঢুঁ মারতে যান জোট সমর্থক আবির বিশ্বাস (নাম পরিবর্তিত)। দোকানে ঢুকেই বেঞ্চের উপর সশব্দে বসলেন। এক গাল হেসে জানালেন, প্রচুর পরিমাণ সবুজ আবির কিনে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল।
কথাটা পাতে পড়তে না পড়তেই ছিটকে এল প্রশ্নটা। (এক তৃণমূলের প্রশ্ন) —“তবে শেষ অবধি আমাদের দিকেই আসতে হল?”
তত ক্ষণে তিনি বুঝতে পেরেছেন কী বেফাঁস বলেছেন। ব্যাপারটার অন্য ব্যাখ্যা হয়ে গিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তড়িঘড়ি বলে উঠলেন, ‘‘না মানে... জোটের প্রার্থী সিপিএমের হোক না, আমরা কংগ্রেসের সবুজ আবির মাখবো।’’
আর ফল যদি উল্টো হয়? ‘‘তা হলে চড়া দামে তোদের কাছে বিক্রি করে দেব,’’ ফুট কাটলেন পাড়ারই এক ‘নির্দল’ দাদা।
উত্তেজনার পারদ চড়ল নিমেষে। ‘‘সমরদাই জিতবে। সিপিএমের চল্লিশ বছরের দুর্গ ভাঙার সাধ্য কারও নেই। করিমপুরের দিদি তো ছার, কালীঘাটের দিদিরও নেই।’’ কলার উঁচিয়ে আর এক জন বলে উঠলেন, ‘‘আর তো সাতটা দিন। বোঝা যাবে...।’’
এর মধ্যে তাল কাটল বাবুয়ার চিৎকারে। —‘‘খালি মুখে এই সব ভোট ভোট করে বক্তিমে ঝাড়লে আমার ব্যবসা চলবে না। এই স্পষ্ট বলছি, কে কে চা নেবে বলো? ’’